চরম অব্যবস্থাপনায় দেশের থানা ও আদালতের মালখানায় জব্দ মালপত্রের পাহাড় জমেছে। এ পর্যন্ত ১৪ লাখের বেশি আলামত ও মালপত্র জব্দ রয়েছে থানা ও আদালতের মালখানায়।
একটি রিট মামলায় গত ৮ জুলাই বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এই প্রতিবেদন দেখার পর হাইকোর্ট জব্দ আলামত সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার কার্যকর সমাধানের জন্য আইন সচিবকে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবকে প্রধান করে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে।
যে রিট মামলায় এই প্রতিবেদন : বিভিন্ন অপরাধ তদন্ত ও বিচারের স্বার্থে জব্দ করা আলামত, মালপত্র যথাযথভাব সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ করতে চার বছর আগে আইনসচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারকে আইনি নোটিশ দেন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ আইনজীবী। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ নোয়াব আলী, মো. মুজাহেদুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, জি এম মুজাহিদুর রহমান (মুন্না) ও ইমরুল কায়েস। নোটিশে সাড়া না পেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন তাঁরা।
কমিটি গঠনের পাশাপাশি ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১৬ক ও ৫১৭ ধারা এবং ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারের ২১০ ও ২১১ বিধি অনুসরণ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে জব্দ মালপত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে হস্তান্তর করার জন্য অধস্তন আদালতের বিচারকদের প্রতি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেংগলের ৩৭৯, ৫১৫ ও ৫২৬ বিধি অনুযায়ী পুলিশ সদর দপ্তরকে এ বিষয়ে নিয়মিত তথ্য দিতে দেশের সব থানার ওসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার আইনজীবী শিশির মনির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হাইকোর্টের লিখিত আদেশটি বের হয়নি। যে কারণে কমিটি গঠনের আদেশসহ আদালতের অন্য নির্দেশনাগুলো প্রতিপালিত হয়নি। আশা করছি, দু-এক দিনের মধ্যে লিখিত আদেশটি বের হবে।’
মালখানা কী? : মালখানা হচ্ছে আদালত, থানা বা শুল্ক বিভাগের এমন একটি সুরক্ষিত কক্ষ বা গুদাম, যেখানে মামলার জব্দ আলামত, বেআইনি মালপত্র, অস্ত্র কিংবা মূল্যবান নথিপত্র আইনগত প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়। সহজ কথায়, কোনো অপরাধের তদন্ত বা বিচারের স্বার্থে পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জব্দ মালপত্র যেখানে জমা রাখা হয়, সেই স্থানটিকে মালখানা বলে।
অর্ধেকের বেশি মালখানার বেহাল দশা : পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থানা ও আদালত মিলিয়ে দেশে মালখানা আছে ৯৬৭টি। এর মধ্যে থানায় মালখানা আছে ৭৪০টি, বাকি ২২৭টি আদালতে। থানার ৭৪০ মালখানার মধ্যে পর্যাপ্ত জায়গাসহ ব্যবহার উপযোগী মালখানা আছে ৩০১টি। পর্যাপ্ত জায়গা আছে, কিন্তু ব্যবহার উপযোগী নয়—এমন মালখানার সংখ্যা ৫২। আবার ব্যবহার উপযোগী কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা নেই, এমন মালখানা রয়েছে ৩১৪টি। এ ছাড়া ব্যবহার অনুপযোগী এবং পর্যাপ্ত জায়গাও নেই, এমন মালখানা আছে ৭৩টি। যেসব থানার আশপাশে সরকারি বা কোনো সংস্থার উন্মুক্ত জায়গা নেই, নিরুপায় হয়ে সেসব থানার সামনে, পেছনে, রাস্তায় বড় বড় আলামত, মালপত্র বা জব্দ সম্পত্তি রাখা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে আরো বলা হয়েছে, দেশের থানাগুলোতে থাকা ৭৪০টি মালখানার মোট জায়গার পরিমাণ প্রায় ছয় একর ১১ শতাংশ। জায়গা প্রয়োজন ১৫ একর ১৪ শতাংশ।
আদালতের ২২৭টি মালখানার মধ্যে পর্যাপ্ত জায়গাসহ ব্যবহার উপযোগী মালখানা আছে ৭১টি। পর্যাপ্ত জায়গা আছে কিন্তু ব্যবহার উপযোগী নয়, এমন মালখানা আছে ২২টি। আবার ব্যবহার উপযোগী কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা নেই, এমন মালখানার সংখ্যা ৮৫। এ ছাড়া ব্যবহার উপযোগী নয় এবং পর্যাপ্ত জায়গাও নেই, এমন মালখানা আছে ৪৯টি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৪২টি আদালত ভবনে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলেও বরাদ্দ না পাওয়ায় মানসম্মত মালখানা স্থাপন সম্ভব হয়নি। তবে পর্যাপ্ত জায়গা আছে, এমন ৩৮টি আদালত ভবন এলাকায় মালখানা স্থাপন করা সম্ভব। বর্তমানে আদালতের মালখানার জায়গার পরিমাণ পাঁচ একর ২৭ শতাংশ, প্রয়োজন প্রায় ১১ একর ৯২ শতাংশ জায়গার।
ডাম্পিংয়ের জন্য নেই পর্যাপ্ত জায়গা : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মাত্র ছয়টি থানায় ও চারটি আদালতে সুরক্ষা শেডযুক্ত ডাম্পিং সুবিধা আছে। সুরক্ষা শেড ছাড়া ডাম্পিং সুবিধা আছে আরো ৪৩টি থানা ও ৯টি আদালতে। এর বাইরে ৩১টি থানা ও তিনটি আদালতের আশপাশের খালি জায়গা বা রাস্তায় সুরক্ষা শেড তৈরি করে ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮১টি থানা ও ১৫টি আদালতের আশপাশ ও খালি জায়গায় সুরক্ষা শেড ছাড়া ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
জেলা ইউনিটগুলোতে বড় বড় আলামত বা মালপত্র রাখার মতো ডাম্পিং ইয়ার্ডের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ কোনো জায়গা নেই উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬৫৬টি থানায় ডাম্পিং ইয়ার্ডের জন্য প্রায় ১০২ একর এবং ৯১টি আদালতের জন্য প্রায় ১৮ একর জায়গার প্রয়োজন। ডাম্পিং ইয়ার্ড ও শেড নির্মাণের জন্য চাহিদা অনুযায়ী জায়গা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হলে জব্দ সম্পত্তি, মালপত্র ও আলামত নিরাপদে রাখা সম্ভব। প্রয়োজনীয় জায়গা ও অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিতে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে।
সাধারণ আলামত ১৪ লাখ, যানবাহন ৩৫ হাজার : হাইকোর্টে দাখিল করা পুলিশের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের থানা ও আদালতের মালখানায় ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৭টি জব্দ আলামত, সম্পত্তি বা মালপত্র সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়া রয়েছে আরো ৩৫ হাজার ৫৮৮টি জব্দ যানবাহন ও জলযান।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে থানায় এক হাজার ৯৬৪টি এবং আদালতে এক হাজার ৭৬৪টি যানবাহন জব্দ অবস্থায় পড়ে আছে। এ ছাড়া ৫ থেকে ১০ বছর ধরে পড়ে আছে আরো আট হাজার ৩৩৭টি যানবাহন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থানার মালখানায় ছয় হাজার ৮২০টি এবং আদালতের মালখানায় তিন লাখ ৬০ হাজার ৬৭০টি সাধারণ আলামত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পড়ে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকায় এসব মালপত্র যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
যে কারণে আলামতের স্তূপ : পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু মামলার বিচার শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট আদালতের রায়ের অনুলিপি সময়মতো মালখানা কর্মকর্তার কাছে পৌঁছায় না। ফলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আলামত ফেরত দেওয়া, নিলাম করা বা ধ্বংস করার কাজ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। এ ছাড়া বেশির ভাগ মালখানায় প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক ট্র্যাকিং সিস্টেম, ভেন্টিলেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ডেটা বেইস নেই।
প্রতিবেদনের শেষ অংশে বলা হয়েছে, ‘এ বিষয়ে প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রয়োজনীয় জায়গা বরাদ্দের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়, ভবন নির্মাণের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, চাহিদামতো অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত মালখানা স্থাপনের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগকে অনুরোধসহ প্রতিবেদন দাখিল করা হলো।’
পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটির সভাপতি ছিলেন পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক জামিল আহমদ (অডিট অ্যান্ড ইন্সপেকশন)।