দীর্ঘ ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (বীর-উত্তম) হত্যা মামলার অন্যতম মূলহোতা ছদ্মবেশী মেজর মোজাফফর হোসেন (অব.)। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা। পুলিশি কার্যক্রম শেষে কোর্ট মার্শাল সম্পন্নের জন্য মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয় থেকে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে এই দীর্ঘ সময়ে এই দুর্ধর্ষ খুনি কোথায় ছিলেন তা নিয়ে নানা প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মধ্যে।
মোজাফফরকে আটকের অভিযানে অংশ নেয়া গোয়েন্দা সদস্যরা বলছেন, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার পর মোজাফফর দেশে ফিরে এসে নিজের আসল পরিচয় সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন, যাতে কোনোভাবেই তাকে কেউ শনাক্ত করতে না পারেন। এই জন্য মোজাফফর তার পুরনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ অতীতের প্রায় সকল পরিচিতজনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। চেহারা, পোশাক, চলাফেরা, হাঁটার ধরন সব বদলে ফেলেন। একপর্যায়ে রাজনীতিবিমুখ একজন সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সকলের কাছে পরিচয় দিয়ে বনানীর ডিওএইচএসে শ্বশুরের বাসায় বসবাস শুরু করেন।
গোয়েন্দা সদস্যরা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার এই আসামির খোঁজ করছিলাম। আমাদের কাছে তার শারীরিক একটি বৈশিষ্ট্যের তথ্য ছিল যে- তার নাকের ঠিক নিচে একটি তিল বা আঁচিলসদৃশ কালো দাগ আছে। জন্মগত দাগ হওয়ায় এটা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আমরা অনুসন্ধানে সেই চিহ্নকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ধরে অভিযান চালাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে আমরা জানতে পারি মোজাফফরের মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম কোম্পানিতে চাকরি করেন। তার বাসাতে মোজাফফরের যাতায়াত আছে। এই সূত্র ধরেই আমরা কয়েক মাস ধরে মোজাফফরের মেয়ের কর্মস্থল ও চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য একটি বাসার অবস্থান শনাক্ত করি। এরপর ওই বাসায় গোপনে নজরদারি চালিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করি, সেখানে সত্যিই মোজাফফর বসবাস করছে কিনা।
এরই সূত্রধরে মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে বনানী ডিওএইচএসের ওই বাসায় নিজেদের টেলিকম প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয় দিয়ে আমাদের ডিবি পুলিশের একটি দল মোজাফফরের মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে চায় বলে দরজায় কড়া নাড়ে। ঠিক সে সময়েই বাসার ভেতর থেকে এক বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি বেরিয়ে এসে আমাদের কাছে জানতে চান- এত রাতে অফিসের লোকজন বাসায় কেন? কী প্রয়োজন? তখন পরিচয় জানতে আসা ওই বৃদ্ধ লোকের নাকের নিচের জন্মদাগ দেখে প্রথমেই আমরা ধারণা করি- তিনিই মোজাফফর।
এরপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য কথোপকথনের একপর্যায়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বলি- আপনি কে, আমরা তো আপনাকে চিনি না? আমরা তো আগেও এখানে এসেছি, আপনাকে তো দেখিনি? এমন প্রশ্নের জবাবে বৃদ্ধ লোকটি বেশ গুরুগম্ভীরভাবে আমাদেরকে বলেন- ‘আমি মোজাফফর, আমি ওর বাবা’। তখন আমরা নিশ্চিত হই- যাকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে খোঁজ করছি, এই সেই মোজাফফর আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর পরক্ষণই তাকে গ্রেপ্তার করি আমরা। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানিয়ে তাকে মিন্টু রোডে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, সে যেই বাসা থেকে আটক হয়েছে, সেই বাসাটি তার শ্বশুরের। আটকের সময়ে বাসাটিতে পরিবারের সবাই তার সঙ্গেই ছিল। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকলেও বর্তমানে মোজাফফর ডিওএইচএসে তার শ্বশুরের বাসাতেই পরিবারের সঙ্গে বসবাস করে আসছিলেন। আর যখন সে দেশের বাইরে ছিলেন তখনও নিয়মিত পরিবারের সদস্যদের কাছে যাতায়াত করতেন। দেখা করতেন। তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। তখন যেহেতু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার সেনা আইনে হয়েছিল এবং সেখানে বিচারাধীন মামলা থেকেই মোজাফফর পালিয়েছিলেন তাই তাকে আটকের পর আমরা প্রক্রিয়া অনুযায়ী সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে নথিপত্র অনুযায়ী, সেনা বিদ্রোহ নামে ১৯৮১ সালের ৩০শে মে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর নথিপত্র অনুসারে এই মোজাফফরই ওই ঘটনায় সম্পৃক্ত একমাত্র ব্যক্তি যিনি এখনো জীবিত আছেন। দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় তার কাছ থেকে কোনো তথ্য নেয়া সম্ভব হয়নি। যতদূর জানা গেছে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে (জেআরবি) প্রথম কমিশন পাওয়া তৎকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের এই সেনা কর্মকর্তা কিছুদিন দেশের অভ্যন্তরেই বিভিন্ন জায়গায় ভোল পাল্টে আত্মগোপনে ছিলেন। এরপর সুযোগ বুঝে ভারতের কলকাতায় চলে যান। সেখানে তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আশ্রয় নেন। তখন তিনি নিজেকে কখনো ‘বিপ্লব সরকার’ কখনো আবার ‘জয় ব্যানার্জি’ নামে পরিচয় দিতেন। কলকাতায় থাকাকালীনই মেজর মোজাফফর হোসেন (অব.) ভারতীয় পরিচয় নিয়ে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত পলাতক আরেক আসামি মেজর এস এম খালেদের সঙ্গে দেখা করতে থাইল্যান্ডে যান। কিছুদিন সেখানে অবস্থানের পর খালেদ মারা গেলে আবারো ভারতে ফিরে যান মোজাফফর। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি পুরোপুরি ভারতেই অবস্থান করেন।
এরপর তিনি আবারো সীমান্ত অতিক্রম করে দেশে ফিরে আসেন নিজের পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে দেখা করেন। সময় কাটান। একপর্যায়ে তিনি নতুন পরিচয় ধারণ করে পরিবারের সঙ্গেই নিয়মিত বসবাস শুরু করেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ২৯শে মে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দুইদিনের সফরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের পর ওইদিন মধ্যরাতে তিনি ঘুমাতে যান। পরদিন ৩০শে মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করে। ওই হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী এবং সরাসরি অংশ নেয়া তৎকালীন সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মোজাফফর একজন। অভিযোগ আছে- মোজাফফরই প্রথম জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান।