Image description
প্রতারণার জাল

কাজের ভিসা, বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স, নির্মাণ শ্রমিকের চাকরি আর উচ্চ বেতনের প্রতিশ্রুতি। সবকিছুই ছিল বৈধ বিদেশযাত্রার গল্প। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর কয়েকদিনের মধ্যেই সেই গল্প বদলে যায়। রুশ ভাষায় লেখা নথিতে স্বাক্ষর করিয়ে তাদের সামরিক চুক্তির আওতায় নেওয়া হয়। এরপর নির্মাণকাজের বদলে তাদের পাঠানো হয় সামরিক ক্যাম্পে, দেওয়া হয় যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। পরে একে একে পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগের ভিত্তিতে এমন ৩০ হতভাগ্য বাংলাদেশির তথ্য পেয়েছে কালবেলা। ভুক্তভোগী পরিবার, বিভিন্ন সূত্র এবং ব্র্যাকের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, এই ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ১০ জন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ছয়জন। যদিও সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা চার।

নিহত ১০ বাংলাদেশির পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে ব্র্যাক। সংস্থাটি বলেছে, নিহতদের পরিবারের আবেগ ও মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে এবং তাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই মুহূর্তে ওই তথ্য প্রকাশ না করাই সমীচীন।

রাশিয়ার ফ্রন্টলাইনে থাকা ৩০ বাংলাদেশির একজন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার সৌরভ মোল্লা। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, বিদেশে গিয়ে উপার্জন করলে অভাব দূর হবে। এখন সেই পরিবার প্রতিদিন অপেক্ষা করছে, সৌরভ জীবিত আছেন—এমন একটি খবরের জন্য।

‘আমরা ভেবেছিলাম ও নির্মাণশ্রমিকের কাজ করবে। কয়েক মাস কষ্ট করলেই সংসারের অবস্থা বদলে যাবে। এখন প্রতিটি ফোনকল আমাদের কাছে মৃত্যু সংবাদের অপেক্ষার মতো’— বলছিলেন সৌরভের ভগ্নিপতি তাসলিম সরদার। কয়েক মাস ধরে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ দূতাবাস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তার একটাই দাবি, ‘আমরা আর কোনো প্রতিশ্রুতি চাই না। যারা এখনো বেঁচে আছে, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।’

সৌরভের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, পাশের ইউনিয়নের বাসিন্দা রেজাউল ভূঁইয়া রাশিয়ায় নির্মাণশ্রমিকের কাজের জন্য সৌরভকে প্রস্তাব দেন। বলা হয়, মাসে এক লাখ টাকার বেশি বেতন, থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার সব ব্যয় কোম্পানি বহন করবে। আগে যাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশির ভালো অবস্থার কথাও জানানো হয়। সেই আশ্বাসে পরিবারটি প্রথমে রেজাউল ভূঁইয়াকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেয়। পরে ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্সি জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে দেওয়া হয় ৭ লাখ টাকা। সৌরভ নিজের সঙ্গে আরও ৫০ হাজার টাকা নিয়ে যান। বিমান ভাড়া, কাগজপত্র ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে পরিবারের ব্যয় দাঁড়ায় ৯ লাখ টাকার বেশি। এই অর্থের বড় অংশই ধারদেনা করে জোগাড় করা। আশা ছিল, কয়েক মাস কাজ করলেই ঋণ শোধ হয়ে যাবে।

গত ৭ মে সৌরভ মোল্লা, রনি শেখ ও পলাশ শেখ একই এজেন্সির মাধ্যমে ঢাকা ছাড়েন। বাহরাইনে ট্রানজিট শেষে ৯ মে তারা রাশিয়ায় পৌঁছান। পরিবারের দাবি, জুরিন নামে এক রুশ নারী বাংলাদেশে এসে তাদের প্রশিক্ষণ দেন এবং তিনিই দলটিকে রাশিয়ায় নিয়ে যান। পুরো প্রক্রিয়ায় এমনভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, পরিবারের কারও মনে সন্দেহের সুযোগই তৈরি হয়নি। রাশিয়ায় পৌঁছে প্রথম দুই দিন সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তৃতীয় দিন বলা হয়, নির্মাণকাজে যোগ দেওয়ার আগে কিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে। ভাষা না বোঝায় কেউই বুঝতে পারেননি, কী নথিতে স্বাক্ষর করছেন! পরিবারের অভিযোগ, রুশ ভাষায় লেখা ওই নথিতেই স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাদের সামরিক চুক্তির আওতায় নেওয়া হয়। পরদিন নির্মাণকাজে নেওয়ার কথা বলে তাদের একটি সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জানানো হয়, তারা এখন রাশিয়ার সেনাবাহিনীর অধীনে। তাদের দেশে ফেরার সুযোগ নেই।

ভুক্তভোগী ১২ পরিবারের সদস্যরা যা বলছেন: ভুক্তভোগী ১২ পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে কালবেলার। তাদের একজন পবিত্র চন্দ্রের বড় ভাই তপন চন্দ্র। তপন জানান, ২৯ মে সকাল ১০টায় পবিত্রর সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন সে জানিয়েছিল, যে কোম্পানিতে কাজ দেওয়ার কথা ছিল সেখানে নেওয়া হয়নি। তাদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে। পবিত্র তার ভাইকে বলেন, ‘আমাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ। আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।’ এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। আরেক ভুক্তভোগী আরিফ হোসেন। তার জ্যাঠাতো ভাই মাসুদ রানা কালবেলাকে বলেন, ‘আরিফের সঙ্গে পরিবারের সর্বশেষ কথা হয় ২৯ মে। সেদিন তিনি ফোন করে জানান, ১২ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

পরে একই দলে থাকা একজনের স্বজনের মাধ্যমে জানতে পারেন, ৩০ মে সংঘর্ষের পর ৩১ মে তাদের গ্রুপের পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আরিফের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর মেলেনি।’ একই পরিণতি সাব্বির হোসাইনের। তার বড় ভাই আবির হোসেন বলেন, ‘২০ থেকে ২২ জনের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কয়েকজন হাসপাতালে এবং কয়েকজনের সঙ্গে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা এখনো তাদের স্বজনদের জীবিত ফিরে আসার আশা করছেন।’ আবির জানান, সর্বশেষ ২৯ মে সাব্বিরের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২৪ জনকে সরাসরি যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয় দাবি সৌরভের ভগ্নিপতি তাসলিম সরদারের। শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কারণে চারজনকে সামরিক ক্যাম্পে রেখে বাঙ্কার তৈরির কাজে লাগানো হয়। সৌরভ মোল্লা তাদের একজন। বাকি দুজনের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পরিবারগুলোর কাছে নেই। সৌরভের সঙ্গে পরিবারের সর্বশেষ কথা হয় গত ১০ জুলাই।

তাসলিম সরদার বলেন, ‘রাশিয়ায় নেওয়ার পর তাদের সবার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে ক্যাম্পে থাকা কয়েকজন রুশ ও মিশরীয় নাগরিকের সহায়তায় সৌরভ অল্প সময়ের জন্য পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’ সেই ফোনালাপে সৌরভ জানান, তাকে তখনও সরাসরি ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়নি। তবে প্রতিদিন বাঙ্কার খোঁড়ার কাজ করতে হচ্ছে। চারদিকে গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা আর মৃত্যুভয়ের মধ্যেই কাটছে প্রতিটি ক্ষণ। পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তার একটাই অনুরোধ, ‘যদি কোনোভাবে আমাদের বের করে নিতে পারো, তাহলে চেষ্টা করো। আমরা এখানে আর বাঁচতে পারব না।’ এই ফোনালাপের পর থেকেই পরিবারের উৎকণ্ঠা আরও বাড়ে।

প্রথমদিকে পরিবারগুলোর বিশ্বাস ছিল, বাংলাদেশ সরকার ও মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের কূটনৈতিক উদ্যোগে তাদের স্বজনদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে না। কিন্তু সেই আশ্বাস বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পরিবারগুলোর দাবি, ২৬, ২৯ ও ৩১ মে কয়েক দফায় বাংলাদেশিদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। এরপর দীর্ঘ সময় তাদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

জুনের প্রথম সপ্তাহে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা চার বাংলাদেশি ভিডিও কলে স্বজনদের জানান, তাদের সঙ্গে থাকা আরও ১০ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। পরে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে পরিবারগুলোর ধারণা, নিহতের সংখ্যা ১০ জন এবং নিখোঁজ ছয়জন। রাশিয়ায় ফাঁদে পড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া রবিন মিয়ার ভাতিজা সানি বলেন, কোরবানির ঈদের পরদিন, ২৯ মে পরিবারের সঙ্গে রবিনের শেষ কথা হয়েছিল। এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

পরিবারের বিশ্বাস, তিনি এখনো বেঁচে আছেন, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে ইন্টারনেট ও ফোন না থাকায় যোগাযোগ করতে পারছেন না। তবে সহকর্মীদের দেওয়া দুটি ভিডিওতে কয়েকজনের নাম ধরে নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। যারা একই ক্যাম্প থেকে ফ্রন্টলাইনে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র চারজন ফিরে আসেন, বাকিদের আর খোঁজ মেলেনি। আরেক ভুক্তভোগী মফিজের চাচাতো ভাই বাছেদ মিয়া বলেন, শেষবার ২৯ মে মফিজের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখন তিনি পরিবারের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ওয়াসিম আকরামের বড় ভাই মো. ইয়াসিন বলেন, আমার ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল ২৯ মে, ঈদের পরের দিন। সেদিন পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন করে জানায়, প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া হবে। এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। জীবিত বা হাসপাতালে থাকা কয়েকজনের মাধ্যমে কিছু মৃত্যুর খবর শুনেছি, তবে কারা মারা গেছেন তা নিশ্চিত নই। তাই ভাই বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেটাও বলতে পারছি না। সরকারও এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো কার্যকর সহযোগিতা বা অগ্রগতির তথ্য দেয়নি। আরিফ হোসাইন পাটোয়ারীর ভগ্নিপতি মো. আব্দুল কাদের বলেন, ৩০ জনের মধ্যে আরিফের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ হয়েছিল ২৬ মে।

এরপর কয়েকজনের সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে যোগাযোগ হলেও আরিফের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। তারা থানায় মামলা করার আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তারা সচিবদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। সেখান থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং রাশিয়ায় একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নিখোঁজদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মো. আমিনুর ইসলামের বড় ভাই মো. কামরুল হাসান বলেন, আমিনুরের সঙ্গে পরিবারের সর্বশেষ কথা হয় ২৯ মে। সেদিন সে জানায়, প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা সহায়তা পাননি বলে জানান কামরুল হাসান। পরিবারের দাবি, সরকারি হিসাবে চারজনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। দ্রুত আমিনুরসহ নিখোঁজ বাংলাদেশিদের সন্ধান বের করে তাদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান আমিনুরের বড় ভাই কামরুল। পালাতে চাইলে চলে গুলি: পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (১০ জুলাই) সৌরভ মোল্লা ও কামাল হোসেন জীবন বাঁচাতে সামরিক ক্যাম্প থেকে পালানোর চেষ্টা করেন। পালানোর সময় তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় এবং ড্রোন দিয়েও হামলা করা হয়। তবু তারা প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে একটি চেকপোস্ট এড়িয়ে স্থানীয় একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে বাড়ির এক নারী চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই রুশ বাহিনীর সদস্যরা সেখানে পৌঁছে দুজনকে আটক করেন। প্রথমে তাদের একটি থানায় নিয়ে মারধর করা হয়। পরে আবার একই সামরিক ক্যাম্পে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে সৌরভকে আবারও বাঙ্কার তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তাসলিম সরদার বলেন, ‘প্রতিদিন নতুন নতুন দুঃসংবাদ শুনছি। আমরা শুধু চাই, যারা এখনো বেঁচে আছেন; তাদের যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর স্বজনরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বাংলাদেশ দূতাবাস ও মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। ১৭ মে চারটি পরিবারের ১১ সদস্য ঢাকার জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের কার্যালয়ে যান। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের মালিক মিজানুর রহমান দেখা না করেই অফিস ত্যাগ করেন। পরে পুলিশ গিয়ে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ২৪ মে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন স্বজনরা। পরে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকের সময় মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও ফোনে কথা হয়। রাশিয়া থেকে ব্র্যাকে ফোন: যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসার পর সৌরভ মোল্লা ও কামাল হোসেন একটি দোকান থেকে ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের লিয়াজোঁ অফিসার এম রায়হান কবির কালবেলাকে বলেন, ‘ব্র্যাক দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ায় প্রতারণার মাধ্যমে মানব পাচারের শিকার হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশি অভিবাসীদের কেস ম্যানেজমেন্ট, পরিবার, সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা দুই ভুক্তভোগীও সরাসরি ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’ তিনি বলেন, ‘এটি একটি ব্যতিক্রমী মানবিক সংকট। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা বৈধভাবে কাজের উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় গেলেও পরে মানব পাচারের শিকার হয়ে জোরপূর্বক যুদ্ধে যুক্ত হন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেবল আনুষ্ঠানিক আবেদন গ্রহণ নয়; বরং দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ, দূতাবাসের সক্রিয় সম্পৃক্ততা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ প্রয়োজন। উদ্ধার নিশ্চিত করা সবসময় সম্ভব না হলেও জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রের দ্রুত ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক র্যাপিড কনস্যুলার ক্রাইসিস রেসপন্স মেকানিজম গড়ে তোলার সময় এসেছে।’

দেশে ফেরত আনতে স্বজনের চেষ্টা: সৌরভ মোল্লা ও কামাল হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে গত ৬ জুলাই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেন তাদের স্বজনরা। আবেদনে বলা হয়, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর সৌরভ মোল্লা এবং ঢাকার মিরপুরের কামাল হোসেন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। মানবিক বিবেচনায় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘দুই বাংলাদেশি নাগরিকের জীবন রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমরা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ চাই।’ মন্ত্রণালয়ের নথিতে আবেদনটি ৬ জুলাই গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রাপ্তিস্বীকারের সিল রয়েছে। দূতাবাসের তদন্তে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসংগতি: গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ৩০ বাংলাদেশি কর্মী রাশিয়ায় যান। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়। মন্ত্রী জানান, ১৫ জুন সরকার মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত চার বাংলাদেশির মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন সৌরভ মোল্লা ও কামাল হোসেন। মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের তদন্তে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একাধিক অসংগতির তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তে দেখা যায়, জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড রাশিয়ার ‘প্রো টেকনোলজিস লিমিটেড লায়াবিলিটি’ নামের প্রতিষ্ঠানে কর্মী পাঠালেও নিয়োগ-সংক্রান্ত কাগজপত্র দূতাবাস সত্যায়ন করেনি। এর আগে ‘আরএস ইন্টারন্যাশনাল’ একই প্রতিষ্ঠানে ৭০ কর্মী পাঠানোর আবেদন করলে কাগজপত্রে অসংগতি পাওয়ায় দূতাবাস আবেদনটি ফেরত পাঠায় এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম স্থগিত রাখে। পরে এজেন্সি ও রুশ কোম্পানি মৌখিকভাবে দাবি করে, কর্মীদের যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; ওরেনবুর্গের একটি ড্রোন কারখানায় কাজ দেওয়া হবে। বিষয়টি যাচাই করতে দূতাবাস কারখানা পরিদর্শনের উদ্যোগ নিলেও সেটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় রুশ নিরাপত্তা সংস্থার অনুমতি মেলেনি। ‘আন্তর্জাতিক আইনে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বৈধতা নেই’: মিথ্যা তথ্য ও আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার বিষয়ে কথা হয় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের সঙ্গে। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বা সামরিক কাজে ব্যবহার করার ঘটনা নতুন নয়। এটি শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ও নয়, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে এমন নজির রয়েছে। বৈধ শ্রম অভিবাসনের আড়ালে মানুষকে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচার চক্রের অংশ, যা একটি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। আন্তর্জাতিক আইনে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো বৈধতা নেই। তবে বাস্তবে যুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশে ‘মার্সেনারি’ বা ভাড়াটে যোদ্ধা ব্যবহারের ঘটনা দেখা যায়। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’ ‘যুদ্ধপ্রবণ দেশে যাওয়ার জন্য তারা কীভাবে সরকারি ক্লিয়ারেন্স পেলেন’: অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ‘দেশের কর্মসংস্থানের সংকট ও মানুষের সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্রসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যুদ্ধপ্রবণ দেশে যাওয়ার জন্য তারা কীভাবে সরকারি ক্লিয়ারেন্স পেলেন। যথাযথ যাচাই-বাছাই হলে এটি সম্ভব হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’ যা বললেন প্রবাসী কল্যাণ সচিব: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ বলেন, রাশিয়ায় যাওয়া ৩০ বাংলাদেশি কর্মী কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সরকার বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। একই সঙ্গে মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রুশ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী কর্মীরা সামরিক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে সরকার এখন পর্যন্ত তাদের কারও মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত তথ্য পায়নি। আহতদের খোঁজ নেওয়া এবং নিখোঁজদের উদ্ধারে দূতাবাস রেড ক্রসসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। সচিব আরও বলেন, রাশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। তাই এ বাজার ও দুই দেশের সম্পর্ক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।