হাম প্রার্দুভাব মোকাবিলায় দেশে চলতি বছরের ৫ এপ্রিলে শুরু হওয়া শিশুদের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন ২০ মে শেষ হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ দাবি করছিল, টিকাদানের এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। গেল ৫ মাসে হামের থাবায় মৃত্যু হয়েছে ৭৭৯ শিশুর। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টিকার বাইরে থাকা শিশুরাই এখন আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এবং যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে না তারা মারা যাচ্ছে। বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম উপসর্গ ও নিশ্চিত হামসহ মোট ৭৭৯ জনের মৃত্যু হলো। একই সময়ে নিশ্চিত হাম ও হাম উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৭১ শিশু। এখন পর্যন্ত উপসর্গ থাকা সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩৮। আর নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ১০৪।
সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় রুটিন টিকা কার্যক্রমে শিশুর ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ১৫ মাস বয়সে। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে দেশব্যাপী হাম প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের হাম-রুবেলার টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করে। সরকারি
হিসাবে সাড়ে ৩ মাস আগে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ১০৩ শতাংশ টিকা দেওয়া হলেও আক্রান্ত ও মৃত্যু থামছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণ ও মৃত্যু প্রতিরোধে বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন চালানো হলেও যথাযথ মাইক্রোপ্ল্যানিং না হওয়ায় তেমন কাজে আসেনি ওই কর্মসূচি। ফলে হামে মৃত্যুর ছোবল থেকে এখনো শিশুদের রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হেলথে প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড ইমিউনিটি গ্যাপস : হেলথ-সিস্টেম কনস্ট্রেইন্টস অ্যান্ড মিজলস মর্টালিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল টিকার অভাবই নয়, দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর দুর্বলতাও হামে মৃত্যুর জন্য সমভাবে দায়ী। হামে প্রাণ হারানো ৩৪ জন শিশুর চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের ৭১ শতাংশেরই শেষ মুহূর্তে জীবন রক্ষাকারী আইসিইউ সুবিধা মেলেনি। যথাযথ চিকিৎসার খোঁজে ৮২ শতাংশ শিশুকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, আইসিইউ সংকট, জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসার অভাব, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে বারবার স্থানান্তর, রেফারেলে বিলম্ব, অক্সিজেন ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসা ব্যয়-এসব কারণ হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্যমতে, মহাখালীর সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখনো প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ১০ শিশু নিশ্চিত হাম ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার এই হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) ডা. এআরএম সাখাওয়াত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে যারা ভর্তি হচ্ছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই হামের টিকা থেকে বাদ পড়া শিশু। এদের মধ্যে কেউ টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার পরও টিকা পায়নি। আবার বিশেষ ক্যাম্পেইন চলছিল তখন অনেকের টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছায়নি। এছাড়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে টিকা নেওয়ার সুযোগ না পাওয়া শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী যুগান্তরকে বলেন, হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ হলো লক্ষ্যভিত্তিক সব শিশুকে টিকার আওতায় না আনা। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের নিচে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে সরকারের টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। তবে বাস্তবে ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যা সংক্রমণ অব্যাহত থাকার একটি বড় কারণ। তিনি আরও বলেন, কেবল টিকা দিলেই হবে না, টিকা কার্যকর হয়েছে কিনা তাও যাচাই করতে হবে। টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হয়েছে কিনা, তা নমুনা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যা এখনো করা হয়নি।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ কার্যকর কভারেজ প্রয়োজন, কিন্তু টার্গেট নির্ধারণে ত্রুটি ও প্রচার-প্রচারণার ঘাটতির কারণে অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। ফলে প্রয়োজনীয় হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়নি এবং সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। টিকাদান কর্মসূচির আগে যথাযথ মাইক্রোপ্ল্যানিং ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে লক্ষ্যভুক্ত শিশু শনাক্ত করার কাজ সঠিকভাবে না হওয়ায় অনেক শিশু বাদ পড়ে গেছে বলে মনে করেন তিনি।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে হামে ৬৩ শিশুর মৃত্যু : যুগান্তর ময়মনসিংহ ব্যুরো জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাম আক্রান্ত এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ৭ জুলাই বিকালে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থেকে হামের লক্ষণ নিয়ে সাড়ে ৫ মাসের মেয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়। শিশুটি বুধবার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এ নিয়ে হাসপাতালটিতে হামে ৬৩ শিশুর মৃত্যু হলো।
রংপুর ব্যুরো পাঠানো সংবাদে বলা হয়-তিন মাসে এ বিভাগে ৯ জনের হামে মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জনই শিশু।