Image description
দক্ষতাই গড়ে দেয় পার্থক্য

আটলান্টায় যখন ইংল্যান্ড নিজেকে গুটিয়ে ফেলল, তখনো আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিধারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের ছাপ রেখে যাওয়ার অভিযান শেষ করেননি। হয়তো ফাইনাল মঞ্চে লিওনেল মেসির রাজসিক বিশ্বকাপ অভিযানের সমাপ্তি ঘটবে।

চেষ্টা করা, খোঁজা, খুঁজে পাওয়া—আর কখনো হার না মানা। অন্তত এই প্রতিপক্ষের কাছে তো নয়। আটলান্টার বিশাল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মাঠে অবিরাম গর্জনের মধ্যে ইংল্যান্ড যখন বিশ্বকাপ পথচলার শেষ প্রান্তে, সামর্থ্যের সীমায়, কিংবা দলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা শেষ শক্তিটুকুরও শেষ সীমানায়, তখন প্রতিপক্ষের পথরোধ করে দাঁড়িয়েছিলেন মূলত একজনই—লিওনেল মেসি, যিনি এখনো বিদায় বলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। অন্তত এভাবে তো নয়ই। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে ইংল্যান্ড আসলে এগিয়ে ছিল। অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে ১-০ ব্যবধানে সামনে ছিল তারা। সেটিই ছিল পুরো ম্যাচে তাদের সবচেয়ে স্বচ্ছ, সবচেয়ে নিখুঁত মুহূর্ত। কিন্তু সেই মুহূর্তের পর যেন তারা মাঠ থেকে জীবন্ত একটি সত্তা হিসেবেই হারিয়ে গেল। ইংল্যান্ড খেলেছে হতাশাজনকভাবে। বদলি খেলোয়াড়রা কোনো প্রভাবই রাখতে পারেননি। হ্যারি কেন যেন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুধু হালকা দৌড়ঝাঁপই করে গেলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ভেঙে দিয়েছিল আরেকটি পরিবর্তন—সেই মুহূর্ত, যখন মনে হলো সময়ের কাঁটা উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে, আকাশ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে, বাস্তবতা যেন অলৌকিকতার কাছে হার মানছে। আর স্টেডিয়ামের সব শক্তি এসে কেন্দ্রীভূত হলো গাঢ় নীল জার্সি পরা, ধীর পায়ে হাঁটা, নির্লিপ্ত সেই মানুষটির চারপাশে। হাঁটতে হাঁটতেই তিনি শুরু করলেন অদ্ভুত এক জাদু—ফাঁকা জায়গাগুলোকে টেনে আনলেন নিজের কাছে, চারপাশের সবকিছুকে নিজের কক্ষপথে ঘুরিয়ে নিলেন। অন্যদিকে প্রতিরোধও যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো মাঠটাই হয়ে উঠল ‘মেসির জগৎ’। ৯১ মিনিট পর্যন্ত স্কোর ১-১। কিন্তু সেই ফলাফলটাও তখন বাস্তব মনে হচ্ছিল না। অস্থায়ী কোনো লেখার মতো বদলে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। আর ঠিক তখনই শেষ আঘাতটি করলেন মেসি। সেই সময় ইংল্যান্ড নিজেদের বক্সের চারপাশে এমনভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, যেন জাহাজডুবির পর বেঁচে যাওয়া ক্লান্ত নাবিকরা শেষ আশ্রয় আঁকড়ে আছে। এর কিছুক্ষণ আগেই আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নিচু শট পোস্টে লেগে ফিরে এসেছিল। ডিজেড স্পেন্স শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে একবার মেসির সামনে গিয়ে বল কেড়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু ধরে রাখতে পারেননি। এরপর দুই ফুলব্যাক—স্পেন্স ও নিকো ও’রাইলিকে সামনে পেয়েও মেসি নিঃশব্দে ঢুকে গেলেন সেই ফাঁকা জায়গায়, যেখানে থাকার কথা ছিল তৃতীয় একজনের। যেন ছোট্ট একটি সবুজ দ্বীপ, শুধু তার জন্যই বরাদ্দ। ডান পা থেকে ভেসে আসা তার ক্রসটি ছিল নিখুঁত—নরম, মাপা এবং ঠিক জায়গার উদ্দেশে উড়ে যাওয়া। যেন কেউ ধৈর্য ধরে খুব সহজ করে একটি জটিল গণিতের সমস্যা বুঝিয়ে দিচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য বলটি বাতাসে স্থির হয়ে রইল—একটি সাদা কোমল গোলক। সময় যেন থেমে গেল। স্টেডিয়ামের প্রত্যেক মানুষ তখন মেসির চোখ দিয়েই মুহূর্তটিকে দেখতে শুরু করেছে—ঘটনার আগেই তার পরিণতি বুঝে ফেলেছিল সবাই। তারপর সময় আবার চলতে শুরু করল। লাউতারো মার্তিনেস হেডে বল জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে দিলেন। ইংল্যান্ডের সব শেষ।

সেমিফাইনালের এমন সমাপ্তি অনিবার্য ছিল, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই যখন মেসি এই ম্যাচের শেষ অধ্যায়টি দেখতে শুরু করেছিলেন। যখন তিনি বুঝে ফেলেছিলেন—সব জটিলতা, সব উপকাহিনি মিলিয়ে যাচ্ছে, আর সামনে থাকা দৃশ্যগুলোর ওপর নিজের পূর্ণ প্রভাব বিস্তারের এটাই সময়। ইংল্যান্ড শেষদিকে কিছুটা মরিয়া চেষ্টা করেছিল বটে। কিন্তু তা ছিল মৃতপ্রায় এক দলের শেষ ছটফটানি মাত্র। ড্যান বার্নকে দেখা গেল আর্জেন্টিনার বক্সে উঁচু বলের জন্য নিজের বিশাল শরীর ছুড়ে দিতে, তারপর ওপরতলা থেকে ছুড়ে ফেলা ডাবল ম্যাট্রেসের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়তে। কিন্তু ম্যাচ তার আগেই শেষ হয়ে গেছে।

ইংল্যান্ড নিজেদের ছোট করে ফেলেছিল। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তারা হার মেনেছে এক অদৃশ্য আভিজাত্যের কাছে—এক এমন ক্রীড়া প্রতিভার কাছে, যার সবচেয়ে নীরব কিংবা সবচেয়ে অগোছালো দিনেও শেষ পর্যন্ত নিজের ছন্দ খুঁজে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। শেষ বাঁশি বাজতেই স্টেডিয়ামজুড়ে গর্জে উঠল অন্তহীন উল্লাস। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসের মাঝেও মেসি শুধু হাঁটছিলেন। সতীর্থদের উল্লাসমগ্ন শরীর এড়িয়ে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিচ্ছিলেন। তারপর দুই মুঠো আকাশের দিকে তুলে উদযাপন করলেন—আলো আর উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে। ইংল্যান্ড নিঃসন্দেহে হতাশ করেছে। এমন একটি সেমিফাইনাল তারা কার্যত নিজেরাই হাতছাড়া করেছে। আক্রমণে ছিল না ধার, খেলায় ছিল না প্রাণ, আর কোথাও বোঝা যায়নি যে তারা সত্যিই এই দিনটিকে নিজেদের করে নিতে চায়। তাদের এই ভেঙে পড়ার কারণ, দল নির্বাচন, কিংবা বারবার বড় মঞ্চে এসে আলোয় চোখ ঝাপসা হয়ে যাওয়ার পুরোনো অভ্যাস—এসব নিয়ে আলোচনা করার সময় সামনে আসবেই। কিন্তু দিনটি ছিল মেসির। মুহূর্তটিও ছিল মেসির। এবার তিনি খেলবেন নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক মিডফিল্ডার—এবং সম্ভবত সর্বকালের সেরাও। তার এবারের যাত্রাটা অন্য রকমও বটে। ফাইনালে ওঠার এই টানটান অভিযানে মেসির খেলায় নতুন কিছু দেখা গেছে। অনেক সময় মনে হয়েছে, তিনি যেন কোনো গভীর ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠেছেন। মেসির সবচেয়ে বড় সুবিধা একটাই—তিনি প্রতিটি ম্যাচেই মেসির সঙ্গে খেলেন। আর মেসি নিজের সতীর্থদেরও আরও ভালো খেলোয়াড়ে পরিণত করেন। তিনি যেন এক আলাদা মহাকর্ষ সৃষ্টি করেন, যার আলোয় অন্যরাও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। ইংল্যান্ড এই ম্যাচে কীভাবে এগোবে—সেটাই ছিল বড় প্রশ্ন। কারণ মেসিকে ঘিরেই সবসময় পরিকল্পনা হয়, কৌশল সাজানো হয়, পুরো ম্যাচের ছক আঁকা হয়। থমাস টুখেল তাই বেছে নিয়েছিলেন শক্তি আর গতির সমন্বয়। ডান প্রান্তে নামিয়েছিলেন মরগান রজার্সকে। আর মেসির বিপরীতে বাঁ-প্রান্তে রেখেছিলেন এই ইংল্যান্ড দলের সবচেয়ে ফর্মে থাকা, সবচেয়ে নির্ভীক এবং সমর্থকদের প্রিয় মুখ—ডিজেড স্পেন্সকে। কিক-অফের সময় নীল, সাদা, লাল আর সোনালি রঙের ঢেউ এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করেছিল। জাতীয় সংগীতের মুহূর্তটাও ছিল নিখুঁত আবেগময়। বলে মেসির প্রথম স্পর্শেই তিনি কয়েকজন খেলোয়াড়কে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন—নিজস্ব সময় আর স্থানবোধে চলা সেই চিরচেনা মানুষ। পরে পড়ে গেলেন। রেফারির বাঁশি নীরব। ক্ষোভে ফেটে পড়ল গ্যালারি। এরপর মেসিকে কয়েকবার হাঁটতে দেখা গেল। যেন খেলার কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ, যার জন্য ফুটবল সবসময় অপেক্ষা করে। ইংল্যান্ড ম্যাচে এগিয়ে যাওয়ার পর মেসি অদৃশ্য সুতোয় টান দিতে শুরু করলেন। সাদা জার্সির ফাঁক গলে বেরিয়ে এলেন, আর একের পর এক বিষাক্ত, বাঁক নেওয়া পাসে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচ যেন একই সঙ্গে দুটি গল্প বলে গেছে। একদিকে এমন এক ইংল্যান্ড, যারা বড় মঞ্চে এসে ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে, এমন এক লিওনেল মেসি—যার প্রতিভা যেন অনিবার্য। যিনি এখনো এই মহামঞ্চে হেঁটে বেড়ান, পুরো খেলাটাকেই নিজের মাপে ছোট করে ফেলেন। আর যিনি এখনো পরাজয় মেনে নিতে প্রস্তুত নন। কোনোভাবেই নন।