Image description

দেশের ২৮ উপজেলার ১৬০ ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি এখন শুধু আর মানবিক সংকট নয়, বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকটের দিকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যাকবলিত এলাকায় ৬৬৭ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।

একই সময় সাপের কামড়ে আক্রান্ত ছয়জন এবং পানিতে ডুবে মারা গেছে তিনজন।

গত ১০ জুলাই থেকে নিয়মিত প্রকাশিত স্বাস্থ্য পরিস্থিতির প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাত্র পাঁচ দিনে বন্যাকবলিত এলাকায় দুই হাজার ৬৩০ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৪৬২ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। এ ছাড়া ১২৩ জন সাপের কামড় খেয়েছে এবং পানিতে ডুবে মারা গেছে ২১ জন।

সব মিলিয়ে এই সময় মৃত্যু ২২ জনের। এর মধ্যে ২১ জন মারা গেছে পানিতে ডুবে। প্রায় পুরো ঘটনাই ঘটে চট্টগ্রাম বিভাগে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনো সামনে আসেনি।

পানি নামার পর দূষিত পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানির সংকট, আশ্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড় এবং জমে থাকা পানির কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়া, ত্বকের সংক্রমণ, সাপের কামড় ও পানিতে ডুবে মৃত্যুসহ অন্তত সাত ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বন্যার সময় সবচেয়ে বড় সংকট হয় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের। দূষিত পানি পান করার ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিস-এ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে থাকার কারণে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও বাড়ে। তিনি গর্ভবতী নারী, শিশু ও প্রবীণদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বিস্তার ঘটে, ফলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় ভেজা পরিবেশে থাকার কারণে ত্বকের বিভিন্ন সংক্রমণও দেখা দেয়। তিনি পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পান করার পরামর্শ দেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, মশা নিয়ন্ত্রণ, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা না গেলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে সংক্রামক রোগের আরেকটি বড় সংকটও দেশকে মোকাবেলা করতে হতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার এর মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় তিন হাজার ৬৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছে। এসব এলাকায় তিন হাজার ১১৭টি মেডিক্যাল টিম চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বর্তমানে প্রায় ২২ হাজার ভায়াল অ্যান্টি-স্নেক ভেনম মজুদ রয়েছে এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আরো ২৫ হাজার ভায়াল সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৭৫ লাখ ওআরএস, প্রায় চার লাখ ব্যাগ কলেরা স্যালাইন এবং ৩৬ লাখের বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, বন্যাকবলিত প্রতিটি উপজেলায় মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।