শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত রাখা, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১৩ জুলাই পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করার দাবিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা সচিবালয় মুখে লং মার্চ কর্মসূচি পালন করেছে।
দীর্ঘ দেড়যুগ আওয়ামী দুঃশাসনের অবসানের পর নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ৫ মাসের মাথায় একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের রাজপথ কাঁপানো আন্দোলন ‘সরকারের প্রতি বার্তা’ নজীরবিহীন। নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা কি দায়িত্ব পালনে অক্ষম নাকি তারা দায়িত্ব পালনের চেয়ে আমলাদের উপর দায়িত্ব দিয়ে ‘মন্ত্রিত্বের ক্ষমতা ভোগ বিলাসে বিভোর হওয়ায়’ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে? শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির আন্দোলন সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। গতকালও টিভিতে সরাসরি প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাততালি দিচ্ছেন, পাশের চেয়ারে বসা শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন ঝিমুচ্ছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা যখন দিল্লি থেকে দেশে ফেরার হুমকি দিচ্ছে; তখন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি আন্দোলন রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কোন দিতে মোড় নেয় বলা সত্যিই দুষ্কর।
দীর্ঘ দেড়যুগ পর বর্তমানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। এ সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান ঘটানোয় ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সেই লড়াকু শিক্ষার্থীদের নিয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বালখিল্যতা প্রত্যাশিত নয়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ তকমা দিয়েছিলেন। ফলে রাজপথের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ শ্লোগান দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করে শেখ হাসিনাকে দেশছাড়া করেছে। একই শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ এখন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত করেছে; সংসদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছে, সচিবালয় অভিমুখে লংমার্চ করেছে। তাদের মুখে শ্লোগান ছিল, ‘আমি কে, তুমি কে? ফার্মের মুরগি, ফার্মের মুরগি; কে বলেছে, কে বলেছে? শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী!’ ‘দফা এক, দাবি এক শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।’ হঠাৎ করে এ অবস্থার সৃষ্টি হলো কেন?
দেশে টানা ভারী বৃষ্টি ও পানিবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরীক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। আন্দোলকারীদের বিদ্রƒপ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘ওরা তো ফার্মের মুরগি, একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর চলে আসবে’। মন্ত্রীর এই কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। মন্ত্রীর কথার জেরে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। শিক্ষার্থীরা এহসানুল হকের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে রাজপথে নেমে আসে।
প্রবাদে রয়েছে কথা আর বন্দুকের গুলি একই রকম। বন্দুকের গুলি ছুঁড়লে যেমন তা ফেরানো যায় না, তেমনি কথা একবার মুখ থেকে বের হলে তা ফিরিয়ে নেয়া যায় না। দাম্ভিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সরকারকে স্নায়ুবিক চাপে ফেলে দিয়েছেন। বাধ্য হয়েই শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছেন, ভুল স্বীকার করছেন, কিন্তু এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সচিবালয় অভিমুখে পথযাত্রা করছেন। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি ও সরকারের দায়িত্বশীল চেয়ারে থাকা ব্যক্তিদের কথাবার্তায় দায়িত্বশীল এবং সংযমী হওয়া প্রয়োজন। তাদের বালখিল্যতা একটি রাজনৈতিক সরকারের চরম পরিণতি ডেকে আনতে পারে সেটা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের পর দেখা গেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর তিনি বলেছেন, আমি ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশীকে বের করেছি। আমার কাছে থাকা ১২টি হোল্ডিং সেন্টারে আরো ১ হাজার ৮০০ জন বাংলাদেশি অপেক্ষা করছে। প্রতিদিন তাদের ওপারে (বাংলাদেশ) পাঠানো হচ্ছে। বাস্তবে পুশইন নিয়ে সীমান্তে কয়েকদিন হৈচৈ হলেও হাতে গোনা কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিককে ফেরত পাঠিয়েছে। সুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্যে প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে বিভেদের সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ তকমা দেয়ায় প্রতিবাদ করে এনসিপির নেতা এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, এই ফার্মের মুরগি শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল বলেই আপনারা মন্ত্রী হয়েছেন। বিএনপি ১৫ বছর আন্দোলন করেছে। অথচ তাদের নেতাকর্মীদের রাস্তায়, জঙ্গলে ঘুমাতে হয়েছে আওয়ামী লীগের ভয়ে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে রক্ত দিয়ে হাসিনাকে দেশছাড়া করেছে বলেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। শুধু হাসনাত আবদুল্লাই নয় অনেক নেতা এবং ব্যাক্তি শিক্ষামন্ত্রীকে নিজের মুখের লাগাম টেনে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন।
২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নীল নকথায় ওয়ান ইলেভেনের মাধ্যমে রাজনৈতিক রেজিম চেঞ্জের পর গণতন্ত্র নির্বাসনে চলে যায়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা একের পর এক পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখেন। দেশের মানুষ ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে ছিল। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন এবং তিনি ভারতে পালিয়ে যান। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার নির্দেশে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং আওয়ামী লীগের গুণ্ডাপাণ্ডারা পাখির মতো গুলি করে আন্দোলনরত ছাত্রজনতাকে মারতে থাকে। যাত্রাবাড়ি, কাজলা, শনির আখড়া, রায়ের বাগে একদিন ৫০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাস্তায় লাশের পর লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় আন্দোলনকারীদের উপর গুলি করার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা দু’জন পুলিশ সদস্যকে ধরে ফেলে ঘটনাস্থলে পিটিয়ে হত্যা করে রায়ের বাগের ওভার ব্রীজে ঝুলিয়ে রাখে। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে সচিত্র এ খবর প্রচার হওয়ার পর হাসিনা আরো হিংস্র, মারমুখী হয়ে পড়েন। রাস্তায় দেখলেই গুলি করে ছাত্রজনতাকে হত্যার নির্দেশ দেন।
পাশাপাশি দু’জন পুলিশ হত্যার জন্য বিএনপি ও জামায়াতকে দায়ী করেন। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবৃতি দিয়ে জানান, ‘ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপির দূরতম সমর্থন নেই। বিএনপি এ ধরনের পুলিশ হত্যার রাজনীতি করে না’। শেখ হাসিনা পালানোর পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হলে ক্ষমতালোভী ইউনূসও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার অপচেষ্টা করেন। কিন্তু গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের প্রতিরোধের মুখে ড. ইউনূস ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। হাসিনা পালানোর পর রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যত অপমৃত্যু ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেয় পাশাপাশি সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করে। ফলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। বহুল প্রত্যাশিত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখান। মানুষ তারেক রহমানের প্রতি আস্থাশীল হন।
তবে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের আবেগে মানুষ বিএনপিকে ভোট দেয়। দীর্ঘ দেড় যুগ পর ভোট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনায় রাজনৈতিক দলটির প্রতি মানুষের প্রত্যাশার পারদ উঁচুতে উঠে। কিন্তু অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও ১৫ বছর রাজপথের আন্দোলনে দেখা যায়নি এমন ব্যক্তিদের মন্ত্রী এমপি করায় মানুষ হোঁচট খায়। রাজপথের লড়াকু সিপাহসালাহদের পদ-পদবি থেকে বঞ্চিত করে কম পরিচিত এবং সাংগঠনিক কর্মে তেমন দেখা যায়নি এমন নেতাদের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী করা হয়। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েই কিছু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ক্ষমতার ভোগবিলাসে বিভোর হয়ে যান। অথচ বছরের পর বছর রাজপথে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে বিএনপিকে টিকিয়ে রাখা নেতারা অবহেলিত। জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি নানাভাবে বিএনপিকে আক্রমণ করলেও মন্ত্রিত্বের ভোগ বিলাসে ব্যস্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নীরব থাকেন। ভারতে থেকে হাসিনা বারবার হুমকি ধমকি দিচ্ছে, দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
কিন্তু ওই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নির্বিকার। তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। তবে তারা কারণে অকারণে কাণ্ডজ্ঞানহীন ভাবে আউল-ফাউল বক্তব্য দিয়ে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছেন। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় আউল ফাউল বক্তব্য নিয়ে টোলের শিকার হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে, শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘রমণী দুর্বলতা’র কেচ্ছা কাহিনীর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি জাতীয়তাবাদী ধারার আমলাদের চেয়ে জামায়াতি চেতনার আমলাদের বেশি পছন্দ করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর হঠাৎ করে তার মধ্যে এ চেতনা জেগে উঠেছে। যার কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন অধিদফতর, পরিদফতর ও প্রতিষ্ঠানে জামায়াতপন্থী আমলাদের অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বিএনপি চেতনায় বিশ্বাসী আমলাদের পাত্তা দেন না। অথচ জামায়াতি চেতনামুক্ত প্রশাসন গড়তে বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
গতকালও শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের কঠোর সমালোচনা করে এনসিপি’র দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘সরকার এমন একজন শিক্ষামন্ত্রী পেয়েছে, যিনি স্টান্টবাজি ও টেন্ডারবাজিতে ওস্তাদ। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নকল বন্ধের কথা বলা হলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীরা নানা অব্যবস্থার শিকার হচ্ছে। হাঁটুসমান, কোথাও বুকসমান পানির মধ্য দিয়েও ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। একটি প্রশ্নপত্রে দুটি সৃজনশীল প্রশ্ন ভুল ছিল। প্রশ্নপত্রে ভুল দেখে শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপে পড়ে’। একই দলের নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী শিক্ষামন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন।
বিএনপি রাজনৈতিক দল। আর রাজনৈতিক দলের কমিটমেন্ট থাকে। তারেক রহমান নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার ওই সব প্রতিশ্রুতি কার্যকর করবেন মন্ত্রিসভার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। মন্ত্রিসভা হচ্ছে ইঞ্জিনের মতো। ইঞ্জিনের একটি পার্স নষ্ট হলে ওই ইঞ্জিন ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। তবে নষ্ট পার্টস সারিয়ে তুললে ইঞ্জিন সচল হয়। মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী অকেজো হলে সরকারের মিশন-ভিশন কার্যকর করা দুরূহ। অভিযোগ রয়েছে শিক্ষামন্ত্রীসহ সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর ফাউল টকের কারণে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।
‘কোনটা যে চন্দ্রমল্লিকার ফুল, আর কোনটা যে সূর্যমুখী, বারবার দেখেও-আমার ভুল হয়ে যায়, আমি আলাদা করতে পারি না; ওলকপি এবং শালগম, মৃগেলের বাচ্চা এবং বাটামাছ, মানুষ এবং মানুষের মত মানুষ, বারবার দেখেও, আমার ভুল হয়ে যায়’ (তারাপদ রায়)। কবির মতো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ভুল করার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর পাল্টে গেছে দেশের রাজনীতি, প্রশাসনিক চালচিত্র। ১৪০০ ছাত্রজনতার রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিস্টকে দেশছাড়া করার পর শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগতে পরিবর্তন এসেছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ‘মব সন্ত্রাস’কে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেব চালিয়ে দিয়ে পাড় পেয়েছে। নির্বাচিত সরকারের সে সুযোগ নেই। রক্ত দিয়ে জুলাই সাফল্যের পর শিক্ষার্থীদের মননে বিশ্বাস জন্মেছে রাজপথে নামলেই যে কোনো দাবি আদায় সম্ভব। আবার সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপি ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিধারী ব্যক্তিরা ইচ্ছামত প্রশাসন চালাচ্ছেন। নিজেরা এবং পরিবার-আত্মীয়-স্বজনদের পকেট ভরাচ্ছেন; অথচ ১৮ বছর যারা রাজপথে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে বিএনপিকে টিকিয়ে রেখেছেন তাদের নিরপেক্ষতার ছবক দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যখন বিশ্বাস জন্মেছে রাজপথে নামলেই দাবি আদায়ের সাফল্য একশ’ভাগ। তখন কবির মতো ‘বারবার দেখেও, আমার ভুল হয়ে যায়’ বলার সুযোগ নেই।
মন্ত্রীদের ভুল স্বীকার করে এবং মাফ চাওয়ার চেয়ে ভুল যাতে না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। মন্ত্রীরা ছেলেমেয়েদের পড়তে বিদেশে পাঠিয়ে যেমন দেশের শিক্ষার্থীদের হাঁটু পানি কোমর পানি পেরিয়ে পাবলিক পরীক্ষা দেয়ার যাতনা বোঝা সম্ভব নয়; তেমনি পান থেকে চুন খসলেই রাজপথে নেমে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগের দাবির যৌক্তিকতা নেই। পরীক্ষায় ভুলপ্রশ্ন এবং হাঁটু পানির মধ্যে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা যেমন অদূরদর্শিতা; তেমনি যখনতখন রাজপথ গরম করাও সমর্থনযোগ্য নয়। আবার এটাও ঠিক একজন মন্ত্রী বা একজন প্রতিমন্ত্রীর কারণে নির্বাচিত সরকারকে বিপদে ফেলা উচিত নয়। গাছের একটি পাতা ঝড়ে গেলে গাছের ক্ষতি হয় না।