Image description

‘পাঁচ দিন ধরি ঘরত ভাত রাইদ্দিদ ন পারির, পোয়া-ছা উয়োস আছিল।’ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন ৭০ বছরের রেখা রাণী দাস। তিনি সাতকানিয়া উপজেলার কেওচিয়া ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। ফলে পাঁচ দিন চুলা জ্বলেনি তাঁর ঘরে। অবশেষে ক্ষুধার্ত মেয়ে আর দুই নাতির মুখে খাবার তুলে দিতে কোমরসম নোংরা পানি মাড়িয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে আসেন তিনি। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় পানিবন্দি ৪ লাখ মানুষের যে মানবিক বিপর্যয় চলছে, রেখা রাণী যেন তারই নির্মম বাস্তব চিত্র। যিনি বলছিলেন, পাঁচ দিন ঘরে ভাত রান্না করতে পারিনি, বাচ্চারা উপোস ছিল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাতকানিয়ার কেওচিয়া উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে যখন তিনি পৌঁছান, তাঁর শরীর ঠান্ডায় রীতিমতো কাঁপছিল। অবশেষে বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের হাত থেকে যখন তাঁর হাতে একটি ত্রাণের প্যাকেট পৌঁছে বৃদ্ধার চোখে মুখে তখন এক স্বস্তির হাসি। এরপর ত্রাণের প্যাকেট মাথায় নিয়ে রেখা রাণী দাস আবারও কোমরপানি মাড়িয়ে ফিরে চললেন বাড়ি। এ সময় এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে যা বরলেন, তার সরল অর্থ-তাঁর ঘরে কোনো পুরুষমানুষ নেই। একমাত্র মেয়ে আর দুই ছোট নাতিকে নিয়ে তাঁর সংসার। ক্ষুধার্ত মেয়ে আর নাতিদের মুখে দুই মুঠো খাবার তুলে দিতেই তাঁকে এ বয়সে কোমরপানি ভেঙে ত্রাণের জন্য আসতে হয়েছে। এরপর ত্রাণের এই ভারী প্যাকেট মাথায় নিয়ে তিনি আবার ফিরে চললেন বাড়ি। তবে এই করুণ চিত্র শুধু রেখা রাণীর একার নয়, কেওচিয়া ইউনিয়নসহ সাতকানিয়াজুড়ে এখন এমন দৃশ্য অহরহ। এবারের বন্যায় সাতকানিয়ার প্রায় ৪ লাখ বাসিন্দা সম্পূর্ণ পানিবন্দি।

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন অথই সমুদ্র। হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ ও মাছের ঘের। প্রশাসন ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত সাহায্য পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা জানান, সাতকানিয়াজুড়ে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার ও শিশুখাদ্যের সংকট। উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক ৫ থেকে ৭ ফুট পানির নিচে। ১৭টি ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোনো উপায় নেই। নৌকার অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে যাদের সামর্থ্য নেই তারা কোথাও যেতেও পারছে না। কেওচিয়া উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের চাপ রয়েছে। তাই এ কেন্দ্রে থাকা পরিবারগুলোও রয়েছে স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে।