Image description
চট্টগ্রামে ভয়ংকর সন্ত্রাসীরা

চট্টগ্রামে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠানের মালিককে ২ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে দুই দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাঁদা না দেওয়ায় ওই ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে সশস্ত্র হামলা ও লুটপাট করে তার সহযোগীরা। সোমবার দুপুরে নগরীর চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা এক্সেস রোডের অফিসে সংঘটিত এ হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। শুধু এই একটি ঘটনা নয়; এর আগে চকবাজার চন্দনপুরা এলাকায় একজন শিল্পপতির বাড়ি লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে দুই দফা ভারী অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ করা হয় চাঁদার জন্য। একাধিক চিহ্নিত সন্ত্রাসী গ্রুপ এভাবে নগরীতে বিত্তবান ও সচ্ছল ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে হুমকি-ধমকি, চাঁদা দাবি এবং তা না পেলে হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে।

এদিকে ৫ আগস্টের পর এই চাঁদাবাজির নতুন ট্রেন্ড শুরু হলেও বর্তমানে তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, পুরো চট্টগ্রাম নগরীই যেন চলে গেছে চাঁদাবাজদের দখলে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ না হওয়ায় এর দায় স্বাভাবিকভাবেই বর্তাচ্ছে সরকারের ওপর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরকম দু-একটি ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও অধিকাংশ ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। ভুক্তভোগী অধিকাংশ ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের অত্যাচার নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন। তারা হয় প্রাণ বাঁচাতে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন, নয়তো সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিয়েই টিকে থাকার লড়াই করছেন। বিচার না পাওয়া কিংবা প্রাণ যাওয়ার আশঙ্কায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগও দিচ্ছেন না।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি আমিরুল হক যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত, অনভিপ্রেত ও চিন্তার বাইরে। তিনি চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসী গ্রেফতারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, অভিযোগ পেলেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সোমবার চন্দনপুরায় ইন্টারনেট অফিসে হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তিনি বলেন, অভিযোগ না পেলে অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সূত্র জানায়, নগরীর বিশাল একটি অংশের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে বিদেশে পলাতক একসময়ের দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ আলী খানের নেতৃত্বাধীন বাহিনী। সাজ্জাদ আলী বিদেশে বসে দেশে তার সহযোগীদের দিয়ে চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট আরও গ্রুপ-উপগ্রুপ সমানে চাঁদাবাজিতে নেমেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, পয়সাওয়ালা কিংবা সচ্ছল জীবনযাপন করা ব্যবসায়ী-শিল্পপতি হওয়াই যেন তাদের অপরাধ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার, চন্দনপুরা, বহদ্দারহাট, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা, বায়েজিদ বোস্তামী, অক্সিজেন, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, ইপিজেডসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নানা কায়দায় চাঁদাবাজি করছে। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় শিপিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরাও সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে অনেকটা অতিষ্ঠ। জাহাজে খাবার সরবরাহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী ভেন্ডরিং কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। বাড়ি বানাতে গিয়েও এলাকায় এলাকায় সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। বাকলিয়া এলাকায় চিহ্নিত দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপ বাড়ি নির্মাণকালে মালিকের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চলগুলোর জুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও চাঁদাবাজদের হাতে চলে গেছে। সরকারি অফিসের টেন্ডারেও হানা দিচ্ছে চাঁদাবাজ চক্র। চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক নির্বাহী প্রকৌশলীর টেবিলে অস্ত্র রেখে প্রকাশ্যে টেন্ডার দাবি করার সাম্প্রতিক একটি ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

সোমবার সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ইন্টারনেট ব্যবসায়ী আদিলকে ফোনে কল করার একপর্যায়ে দম্ভের সঙ্গেই বলেন, পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে আমার সম্পর্কে জেনে নিন। ডেভিড ইমনের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ‘ডেভিড ইমন পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদের সহযোগী। তাকে গ্রেফতারে আগে থেকেই পুলিশ একাধিক অভিযান চালিয়েছে। এ কারণেই হয়তো ওই সন্ত্রাসী পুলিশ কমিশনারের নাম বলেছে।’ শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদকে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি আছে বলেও জানান তিনি।

ডেভিড ইমন ইন্টারনেট ব্যবসায়ীকে এও বলেছেন, চকবাজার থেকে অক্সিজেন এলাকা পর্যন্ত যারাই ব্যবসা করছে, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে করছে। স্মার্ট গ্রুপের এমডি মুজিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তার কাছে বিদেশ পলাতক সাজ্জাদ আলী ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিল ফোনে। পরে ডেভিড ইমন ৫ কোটি টাকা দাবি করেন এবং সাজ্জাদের সঙ্গে এ বিষয়ে সেটেল করতে বলেন। তিনি বলেন, আমাদের অপরাধ একটাই-আমরা ব্যবসা করি। আমাদের টাকা আছে। সরকারকে ট্যাক্স দিই। এর বাইরে আর কোনো অপরাধ নেই।’ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাজিমুর রহমান বলেন, পুলিশ প্রশাসনকে বলব সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ যেই হোক, দলমতনির্বিশেষ তাদের যাতে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হয়।

সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন : ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলায় সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বিভাগের নেতারা। মঙ্গলবার বিকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আইএসপিএবি চট্টগ্রাম বিভাগের আহ্বায়ক রাজিব শাহরিয়ার। তিনি বলেন, ডিডিএন কার্যালয়ে চাঁদার দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি পুরো আইএসপি শিল্পের জন্য গভীর নিরাপত্তা সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। এমনকি ইন্টারনেট সেবা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। পরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে সন্ত্রাসীদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেন আইএসপি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।