Image description

কক্সবাজারজুড়ে এখন পাহাড় ধসের আতঙ্ক। এই কদিনের ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসে মারা গেছে অন্তত দুই ডজন মানুষ। এখনো মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে সহস্রাধিক মানুষ। বর্ষা কেবল শুরু হয়েছে, সামনে বাড়তে পারে মৃত্যুর মিছিল। গত ৯ বছরে এই পর্যটননগরীতে পাহাড় ধসের ঘটনা বেড়েই চলেছে। ২০১৭ সালে কক্সবাজারে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় গ্রহণের পর থেকেই এ অঞ্চলে পাহাড়ধসসহ নানান প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৯ বছরে কক্সবাজারে পাহাড় ধসে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অথচ ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পাহাড় ধসে মারা যায় মাত্র নয়জন।

২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা ঢলের পর উঁচুনিচু পাহাড়ের ঢালুতে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ রোহিঙ্গা; যা ছিল একসময়ের গভীর বন। ছিল বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য।

উখিয়ার ৩৩ রোহিঙ্গা শিবিরই পাহাড়ে গড়ে ওঠে। সব শিবিরে বর্ষা মানেই আতঙ্ক। ভারী বর্ষণ শুরু হলেই মৃত্যুভয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ২ লাখ রোহিঙ্গা।

পাহাড় কেটে রোহিঙ্গা বসতি স্থাপন করায় পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। বন উজাড় হয়েছে। বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

উল্লেখ্য, গত বছরে নতুন করে এসেছে আরও ২ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের সবার বসতি উঁচু পাহাড়ে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে তারাই। কক্সবাজারের বনাঞ্চল উজাড়, পাহাড় কাটা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় রোহিঙ্গাসংকটের অন্যতম বড় পরিবেশগত প্রভাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আশ্রয়শিবির নির্মাণের জন্য বিপুল বনভূমি ব্যবহার করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের ঘটনা হলেই কেবল কক্সবাজারের পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা হয়, কিছু মৃত্যু নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুম চলে গেলেই আমরা সব ভুলে যাই!

কক্সবাজার। বাংলাদেশের পর্যটননগরী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বাংলাদেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। কক্সবাজার ঘিরে বাংলাদেশ পর্যটন খাতে বছরে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারত। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার চাপে এ পর্যটননগরী আজ মৃতপ্রায়। বিদেশি পর্যটক দূরের কথা, দেশি পর্যটকরাও এখন কক্সবাজার ভ্রমণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। রোহিঙ্গাদের চাপে এখানে শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেনি। এ জনপদ হয়ে উঠছে মাদক, অস্ত্র চোরাচালানের আন্তর্জাতিক রুট। মানব পাচারসহ নানান অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের পর্যটননগরী।

রোহিঙ্গাসংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ অবকাঠামো, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উল্লেখযোগ্য সহায়তা প্রদান করছে, তবু স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অন্যান্য সরকারি সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজার অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও অনুভব করছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, আশ্রয়শিবিরসংলগ্ন এলাকায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব জটিল ও বহুমাত্রিক।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে আশ্রয়শিবিরে মাদক পাচার, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে অপরাধজগতের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এলাকাবাসী। গত ৯ বছরে এখানে সহিংসতায় সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। কক্সবাজারে অবাধে আসছে অবৈধ অস্ত্র, মাদক; যা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সাগরপথে অবৈধভাবে বিদেশযাত্রায় শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার সূচনা হয়েছে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের পর থেকে। রোহিঙ্গারাই এসব মানব পাচার নেটওয়ার্কের মূল হোতা। সহজেই এরা বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে, যা ব্যবহার করে এভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যখন তাদের দুর্ঘটনার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন বদনাম হচ্ছে বাংলাদেশের। এদের জালিয়াতি ও প্রতারণার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রম বন্ধ অথবা কঠিন করে দিয়েছে।

এর ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় উৎস জনশক্তি রপ্তানি খাত আজ হুমকির মুখে।

স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সীমিত সম্পদ ভাগাভাগি, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা এবং অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সামাজিক টানাপোড়েনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রমও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে অর্থায়ন কমে গেলে সংকট আরও জটিল হতে পারে। এমনিতেই বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক সংকটে, তার ওপর এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার চাপ সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এখন বড় বাধা।

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের নিরাপত্তা হুমকি ও দোদুল্যমান অবস্থায় থাকবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নানান ধরনের সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এ সংকট ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করেছে। আর বাংলাদেশ এর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত সৃষ্টি করবে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং আরাকান আর্মি কর্তৃক বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা। চলতি মাসে আবারও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান থেকে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায় দেশটির সামরিক জান্তা। সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে টেকনাফের জাদিমোড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাবারবার প্রকম্পিত হয়। এ অবস্থায় যেকোনো সময় বাংলাদেশ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আর এ কারণেই রোহিঙ্গাসংকট মোকাবিলায় সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা কমিটি’ গঠন করেছে। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এ সংকট মোকাবিলায় আরও বেশি নিরাপত্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এ পদক্ষেপ। গত রবিবার প্রকাশিত সরকারি গেজেট অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গঠিত এ কমিটিতে সামরিক বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) থাকবেন প্রধান সমন্বয়কারী। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালককে সদস্যসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পরপরই এ কমিটি গঠন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার যে রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে এ কমিটি তার একটা ইঙ্গিত। আশা করি সরকার রোহিঙ্গাসংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেবে। রোহিঙ্গারা এখন শুধু কক্সবাজারের জন্য নয়, গোটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই যত তাড়াতাড়ি তাদের প্রত্যাবাসন হয়, ততই দেশের জন্য নিরাপদ।