সংবিধান পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হচ্ছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য ইতোমধ্যে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সংসদের সরকারি দল বিএনপি। তবে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, সংশোধন নয়, গণভোটের রায় অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। তা না হলে সংসদের পাশাপাশি তারা রাজপথে আন্দোলনে নামবেন। এর আগে এই ইস্যুতে সোমবার সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে জামায়াত। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য সংস্কার পরিষদ দরকার। তাদের মতে, সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক উদ্যোগ জরুরি। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, পর্দার আড়ালে বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলছে সরকার।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, সংশোধন ও সংস্কার দুটির অর্থ ভিন্ন। বর্তমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংবিধান সংশোধন করা যায়। কিন্তু এই পদ্ধতিতে সংবিধানের কাঠামো, মৌলিক অধিকার কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্যে হাত দেওয়া যায় না। সেখানে পরিবর্তন আনতে হলে অবশ্যই গণভোট বা গণপরিষদ দরকার। এবার গণভোটের মাধ্যমে দেশের মানুষ সংসদ-সদস্যদের সেই ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সরকার যেভাবে সংশোধনের কথা বলছে, তা পুরোনো পদ্ধতি। তিনি বলেন, পুরোনো পথ ধরে নতুন গন্তব্যে যাওয়া যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, সংবিধান সংশোধন হলো প্রচলিত বিধিবিধান রেখে সেখানে সংযুক্তি বা কোনো অনুচ্ছেদে পরিবর্তন। কিন্তু সংস্কার হলো মৌলিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন। অর্থাৎ নতুন সংবিধান তৈরি অথবা পুনর্লিখন। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। আবার বিরোধী দল চাচ্ছে গণভোটের রায় অনুসারে সংস্কার পরিষদ গঠন করে পুরো সংবিধানে বড় পরিবর্তন। কিন্তু সেটিও এখন আরও সম্ভব নয়। কারণ ইতোমধ্যে গণভোটের অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে। ফলে গণভোটের ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় সমাধান হলো রাজনৈতিক। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বেশকিছু বিষয়ে একমত হতে হবে। এই ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন কিংবা সংস্কার দুটিই সম্ভব।
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সোমবার ১২ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ওই কমিটিতে অন্য সদস্যরা হলেন-সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিএনপির সংসদ-সদস্য জয়নাল আবেদিন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ-সদস্য জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ-সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ-সদস্য নুরুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ-সদস্য মো. অলিউল্লাহ। কমিটিতে বিরোধী দলকে আরও ৫ জন সদস্যের নাম দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছেন।
জানতে চাইলে সংসদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম না দিয়ে জামায়াত ও এনসিপি দ্বিচারিতা করছে। কারণ জামায়াত ও এনসিপির নারী সংসদ-সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। কিন্তু তারা সংসদের সব ধরনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলের নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা দুটি শপথ নিলেন এবং নারী সদস্যরা একটি শপথ নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বিরোধী দল কমিটিতে সদস্য না দিলেও সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটির কার্যক্রমে সমস্যা হবে না। পাঁচজন সদস্য হলেই এ কমিটি বৈঠক করতে পারবে। মো. নুরুল ইসলাম বলেন, যে প্রক্রিয়ায় হোক না কেন; সংবিধানে সংশোধন আনতেই হবে। ভারতের সংবিধান ১০৬ বার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ২৭ বার সংশোধন হয়েছে। তিনি জানান, জুলাই সনদের ‘স্পিরিট’ আমরা ধারণ করেই সংবিধান সংশোধন করব। তিনি এ নিয়ে অসত্য তথ্য না ছড়াতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।
অপরদিকে জামায়াত মনে করছে, গণভোট ও জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনবে না বিএনপি। এজন্যই সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। জামায়াতের সংসদ-সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছি। বিএনপি গণভোটের জনরায় মানছে না। তিনি বলেন, বিএনপি যে প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধন করছে, তা ভবিষ্যতে টিকবে না। যেমন এর আগে আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিলেন, সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী অবৈধ। সংশোধনী সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থি। তিনি আরও বলেন, সংবিধান সংস্কারের দাবিতে আমরা জাতীয় সংসদ ও রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংস্কার একটি নীতিগত ও কাঠামোগত উদ্যোগ। সংশোধন তার আইনগত বাস্তবায়ন। সংবিধান সংশোধন একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ বা তফসিল পরিবর্তন, সংযোজন কিংবা বিয়োজন করা যায়। এর বৈধতা সংবিধান থেকেই আসে। অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার কোনো নির্দিষ্ট সাংবিধানিক পরিভাষা নয়। এটি একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক ও নীতিগত ধারণা। সংস্কার বলতে শুধু কয়েকটি ধারা পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার, স্থানীয় সরকার কিংবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা; এসব বিষয়ে সামগ্রিক পরিবর্তনের রূপরেখা প্রণয়নকে বোঝায়।
রাষ্ট্র সংস্কারে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর বিএনপি, জামায়াতসহ দেশের ৩০টি রাজনৈতিক দল জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করে। এই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলো-প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা। বাকি ৩৭টি প্রস্তাব আইন বা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন সম্ভব। ওই বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ ও বাস্তবায়ন আদেশ পাশ হয়। অর্থাৎ, জুলাই সনদ নিজে সংবিধান নয়; কিন্তু এটি রাষ্ট্র সংস্কারের একটি নীতিগত ও রাজনৈতিক রূপরেখা। জুলাই আদেশে উল্লেখ আছে, নির্বাচনের পর সংসদ-সদস্যরা দুটি দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে পরর্বর্তী ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসাবে কাজ করবে। আর সংবিধান সংশোধনের পর তারা কাজ করবেন নিয়মিত আইনসভার সদস্য হিসাবে। তবে নির্বাচনের পর এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয় যা এখনো অব্যাহত আছে।