Image description
শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ ১১ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অর্থ পাচার

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশের শীর্ষ ১১ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি, ঘুস-দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তে গতি আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলমান যৌথ তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের অন্য দায়িত্ব থেকে সরিয়ে শুধু এ মামলাগুলোয়ই পূর্ণ সময় কাজ করতে হবে। এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থাপিত যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে থেকে কাজ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সূত্র বলছে, এর আগে কখনো এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এটিই প্রথম।

৭ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া ওই চিঠির একটি কপি যুগান্তরের হাতে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের অগ্রগতি প্রত্যাশিত না হওয়ায় সরকার এবার পুরো প্রক্রিয়াকে আরও নিবিড়ভাবে তদারকির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও দুদক স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের চিঠি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে নানা আলোচনাও হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদককে এভাবে কোনো মন্ত্রণালয় চিঠি দিতে পারে না। কিন্তু বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও জনস্বার্থ বিবেচনায় আন্তঃসংস্থা সমন্বয় জোরদার করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আলোচ্য তদন্ত সফলভাবে শেষ করার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিকভাবে ওই তদন্তে নিয়োজিত রাখতে হবে। পাশাপাশি তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থাপিত যৌথ তদন্ত দলের অস্থায়ী কার্যালয় থেকেই কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অনুরোধ করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, শীর্ষ ১১ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, কর ও শুল্ক ফাঁকি, ব্যাংক জালিয়াতি, ঘুস ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। সেই ভিত্তিতে আপাতত ১১টি করপোরেট গ্রুপের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষ হলে প্রয়োজনীয় ধারা উল্লেখ করে মামলা করা হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হতে পারে। একই সঙ্গে শীর্ষ ১১ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি, ঘুস-দুর্নীতিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কী ধরনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, সে বিষয়টিও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে তদন্তের আওতায় রয়েছে এস আলম, বেক্সিমকো, নাবিল, সামিট, নাসা, সিকদার ও আরামিট গ্রুপসহ আরও কয়েকটি গ্রুপ। শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, এসব গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেনও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ২ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) যৌথ অনুসন্ধান শুরুর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানায়। পরে ৬ জানুয়ারি তদন্তের কাঠামো, নেতৃত্ব ও কার্যপদ্ধতি চূড়ান্ত করা হয়। তদন্ত সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিএফআইইউকে। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালায় সিআইডি, দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও শুল্ক গোয়েন্দা। পুরো প্রক্রিয়ায় আইনি সহায়তা দিচ্ছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রতিটি গ্রুপের জন্য পৃথক তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিধান মেনে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অনুসন্ধান পরিচালনা করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স ও বিএফআইইউকে জানাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া, ভুয়া ও অতিমূল্যায়িত আমদানি-রপ্তানির (ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং) মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচার, কর ও শুল্ক ফাঁকি এবং ঘুস-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। এসব অভিযোগের আর্থিক নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে তদন্তের আওতায় থাকা অধিকাংশ শিল্পগোষ্ঠীর ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছে বিএফআইইউ। পাশাপাশি তাদের ঋণের ব্যবহার, প্রকৃত সুবিধাভোগী, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং অর্থের গতিপথ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের তথ্য সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষ করে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্যেই এখন তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পূর্ণ সময় কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, আন্তঃসংস্থার সমন্বিত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে আলোচিত শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত দ্রুত শেষ হবে এবং বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সরকারের এই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। এই শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাই এ ধরনের মামলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যৌক্তিক।

তিনি বলেন, ‘এটিকে দুদক বা অন্য কোনো তদন্ত সংস্থার কাজে হস্তক্ষেপ হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ হিসাবে বিষয়টি দেখা উচিত।’

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘তবে শুধু অগ্রাধিকার দিলেই হবে না, এর বাস্তব প্রতিফলনও নিশ্চিত করতে হবে। যেসব কর্মকর্তাকে অন্য দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে এই তদন্তে একচেটিয়াভাবে নিয়োজিত করা হবে, তাদের ওপর বড় ধরনের দায়িত্ব বর্তাবে। তারা যেন গভীরতা, নিরপেক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে তদন্তের মান, গতি ও জবাবদিহির ওপর।’