Image description

কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সারা দেশে চরম দুর্ভোগে পড়েন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। এরই মধ্যে চলছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় ঘর থেকেও বের হওয়া কঠিন ছিল। এমন বাস্তবতায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সোমবারের পরীক্ষা পেছানোর দাবি করেছিলেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মন্ত্রণালয় তাদের দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এতে করে অনেক শিক্ষার্থী বিপাকে পড়ে। এ অবস্থায় বৈরী আবহাওয়ায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা গ্রহণ এবং প্রশ্নপত্রের ত্রুটির অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মঙ্গলবার সকাল থেকে দিনভর ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলন থেকে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৮ দফা দাবি জানায়। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং ‘অসংগতিপূর্ণ’ বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম দেয় তারা। এরই প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে কিছু বলিনি। তারপরও কেউ যদি আহত হয়ে থাকেন, আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করায় রাজধানীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তীব্র যানজট। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

এদিন সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্সল্যাব ও উত্তরা এলাকায় জড়ো হয়। সায়েন্সল্যাব থেকে একদল শিক্ষার্থী ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিলসহ যায়। তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয় পুলিশ। পরে বিকালে সায়েন্সল্যাবে ফের জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিলসহ জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার দিকে যায়। তারা সংসদের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের সরিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়।

এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনের কারণে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। এতে করে চরম ভোগান্তিতে পড়েন অ্যাম্বুলেন্স ও বিদেশগামী যাত্রীসহ নগরবাসী। এমন পরিস্থিতিতে অনেককে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঢুকে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা ইন্ধন দিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত কিছু ভিডিও ও পোস্টও ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনা যেভাবে বিস্তার ঘটে : সরেজমিন দেখা গেছে, সকাল ১০টার পর রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড়ে জড়ো হতে শুরু করে। এছাড়া উত্তরায় জড়ো হয় আশপাশের কলেজের শিক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টার পর তারা সায়েন্সল্যাব মোড় বন্ধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, লালমাটিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিএফ শাহীন কলেজসহ ১২-১৫টি কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করে। এ সময় তারা শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবি করে। শিক্ষার্থীরা একদফা এক দাবি, মিলনের পদত্যাগ; আমি কে তুমি কে, ফার্মের মুরগি, ফার্মের মুরগি; এক দুই তিন চার, মিলন তুই গদি ছাড়, উই ওয়ান্ট জাস্টিস-এ ধরনের স্লোগান দেয়।

দুপুরের দিকে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যায়। দুপুর সোয়া ১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরের সামনে থেকে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তারা নীলক্ষেত থেকে টিএসসিগামী সড়কে গিয়ে অবস্থান নিয়ে নানা স্লোগান দেয়। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে পলাশী হয়ে বকশিবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয় তারা। সেখানে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষা বোর্ডের ভেতরে ইট ছোড়ে ও গেটে ধাক্কাধাক্কি করে। তখন পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। বেলা সোয়া ৩টা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করে ফের সায়েন্সল্যাবে এসে অবস্থান নেয়। বিকাল পৌনে ৪টা পর্যন্ত সায়েন্সল্যাবে অবস্থান শেষে জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে রওয়ানা দেয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলার সময় ভবনের সামনে অবস্থান নেয় তারা।

প্রথমে পুলিশ শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে। পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে আসাদ গেটের দিকে সরিয়ে দেয়। পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করলে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের চেষ্টা করে। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান ফটক থেকে আসাদ গেট পর্যন্ত নিয়ে যায়।

যেভাবে সূত্রপাত : সোমবার ‘শিক্ষার্থী ঐক্য’ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে আন্দোলনের ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। এর অংশ হিসাবে মঙ্গলবার সকাল থেকে সায়েন্সল্যাব মোড়, শাহবাগ, উত্তরা ও মিরপুরসহ কয়েকটি স্থানে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় ঢাকার বিভিন্ন কলেজের পরীক্ষার্থীরা। এ ছাড়া রাজশাহী, বরিশাল, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সামনে এবং সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, রংপুর জিলা স্কুলসহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

সায়েন্সল্যাবে আন্দোলনকারী বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল নোমান জানায়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ বাধা দিয়েছে ও হামলা করেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছে। দাবি না মানলে আগামীকালও (আজ) আন্দোলন চলবে। শিক্ষার্থীরা আরও জানায়, তারা মোট আট দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-শিক্ষামন্ত্রীকে নিজের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে; পরীক্ষা নিয়ে কোনো ধরনের ‘গবেষণা’ বন্ধ করতে হবে; দেশের পরিস্থিতি ও পরীক্ষা কেন্দ্র উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখতে হবে। এছাড়া পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের প্রশ্নপত্রে ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুলের জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নম্বর দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তারা। তাদের আট দফা দাবির মধ্যে প্রধান তিনটি দাবি হলো-শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তার জন্য ক্ষমা চাওয়া, ১৩ জুলাইর পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষা পুনরায় নেওয়া এবং ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত ও নতুন রুটিন প্রকাশ।

শিক্ষার্থীদের অবরোধে যানজটে স্থবির ঢাকা : রাজধানীতে সড়ক অবরোধের কারণে দিনের বেশির ভাগ সময় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, ইসিবি চত্বর, সায়েন্সল্যাব ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে। অনেক যাত্রীকে ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে হেঁটে বিমানবন্দরের উদ্দেশে যেতে দেখা যায়। কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্সও দীর্ঘ সময় যানজটে আটকা পড়ে। এতে সাধারণ যাত্রী, রোগী ও বিদেশগামীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।

অন্যদিকে দীর্ঘ সময় সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভও দেখা যায়। অনেকেই বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা থাকলেও সড়ক অবরোধের ফলে জরুরি সেবাসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। তাদের মতে, দাবি আদায়ে এমন কর্মসূচি নেওয়া উচিত, যাতে জনভোগান্তি কম হয়।

ট্রাফিক পুলিশের বক্তব্য : সার্বিক অবস্থা জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান রাত সোয়া ৯টার দিকে যুগান্তরকে জানান, দিনভর রাজধানীর অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বন্ধ করে আন্দোলন করায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। এখনো উত্তরা, মানিক মিয়া এভিনিউতে শিক্ষার্থীরা অবস্থান করছে। তাদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার জন্য বোঝানো হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ : এদিকে এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। মঙ্গলবার প্রশ্নপত্র মডারেশনের (পরিশোধন) দায়িত্বে থাকা চারজন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষকরা সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীন। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

চট্টগ্রামের ৫ জেলা ছাড়া সারা দেশে পরীক্ষা চলবে আজ : চট্টগ্রামের ৫ জেলা ছাড়া সারা দেশে পরীক্ষা চলবে বলে জানিয়েছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। সোমবার সকাল ১০টায় সব শিক্ষা বোর্ড ও জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রীও।