সারা দেশের স্কুল-কলেজের কোমলমতি ছাত্রীদের কাছ থেকে সেশন চার্জের সঙ্গে গার্ল গাইডসের ফি বাবদ প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করা হয় ১৫ টাকা। আত্মনির্ভরশীল হতে শিক্ষার্থীদের দেওয়া কোটি কোটি টাকা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুদান গিলে খাচ্ছে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সংগঠনের জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগমের একক আধিপত্য ও দখলদারিত্বে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয়েছে দুর্নীতি ও লুটপাটের আখড়ায়। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের তদন্তে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি ও ভুয়া ভাউচারে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিললেও, নিজের পিঠ বাঁচাতে অডিট কার্যক্রমই বন্ধ করে দিয়েছেন এ কমিশনার।
ভুয়া সনদে ক্ষমতা দখল, নিয়ম ভেঙে নির্বাচন না দিয়ে পদ আঁকড়ে থাকা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘হলদে পাখি’ ফান্ডের টাকায় নিজের জন্য কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল পাজেরো জিপ কেনার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছেন জেবুন্নেছা। গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা এসবের প্রতিবাদ করলে সদস্য পদ বাতিল ও চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয়। রাজধানীর বেইলি রোডের ১০ তলা ভবনের প্রধান কার্যালয়কে ফাঁকা রেখে জেবুন্নেছার নিজস্ব চক্রের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মহোৎসবে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশব্যাপী গাইডিং কার্যক্রম।
কাজী জেবুন্নেছা বেগমের এই একচ্ছত্র ক্ষমতার পেছনে রয়েছে এক নজিরবিহীন জালিয়াতি ও গঠনবিধি লঙ্ঘনের ইতিহাস। গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে গাইডিংয়ের বেসিক প্রশিক্ষণ (দীক্ষা) এবং কমপক্ষে চার বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ ২০১৮ সালের নির্বাচনের মাত্র এক দিন আগে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ কানিজ মাহমুদার কাছ থেকে ২৮ বছর আগের একটি ভুয়া রেঞ্জার সনদ জোগাড় করে অতিরিক্ত সচিবের দাপটে প্রার্থী হন জেবুন্নেছা। ভুয়া সনদ দেওয়ার পুরস্কারস্বরূপ পরবর্তী সময়ে কানিজ মাহমুদাকে নিয়ম ভেঙে রেঞ্জার সাব-কমিটির সদস্য পদ দেওয়া হয়। তথ্য বলছে, কাজী জেবুন্নেছা বেগম সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে এইচএসসিতে পড়েছেন ১৯৮০-৮১ সালে। সেই সময়ে কানিজ মাহমুদা সিদ্ধেশ্বরীর অধ্যক্ষ বা শিক্ষক ছিলেন না। কানিজ মাহমুদা নিজেই জেবুন্নেছার সমবয়সী।
প্রথম মেয়াদে নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত এক বছর চার মাস পদ দখল করে রাখার পর, ২০২৩ সালের ১১ মার্চ ভোট কারচুপির মাধ্যমে আবারও নির্বাচন জেতেন তিনি। যোগ্য ও সক্রিয় সদস্যদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে, গাইডিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নেই—এমন ব্যক্তিদের ভোটার বানিয়ে এই পকেট ভোট সম্পন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, গঠনবিধি লঙ্ঘন করে নড়াইল জেলার সাবেক ডিসি আঞ্জুমান আরাকে সবচেয়ে বড় ঢাকা অঞ্চলের আঞ্চলিক কমিশনারের পদও উপহার দেওয়া হয়।
দেশজুড়ে ছাত্র-ছাত্রী, তরুণী ও নারীদের আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে স্কাউট ও গার্ল গাইডের নামে শিক্ষার্থীরা সেশন চার্জের সঙ্গে আগে ২৬ টাকা করে দিয়ে আসছিলেন। পরে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার এক পরিপত্রের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বর্ধিত এই ফির ২৫ টাকা পায় স্কাউট এবং ১৫ টাকা পায় গার্ল গাইডস্।
সমগ্র বাংলাদেশে গার্ল গাইডের কার্যক্রম মোট ১০টি অঞ্চলে বিভক্ত-রাজধানী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুর ও ময়মনসিংহ। নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকার ৮০ শতাংশ আঞ্চলিক অফিসগুলো নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যয় করে এবং বাকি ২০ শতাংশ অর্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জলাঞ্জলি দিয়ে স্বৈরাচারী কায়দায় প্রতিষ্ঠান চালিয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন কর্মকর্তা গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল জীবন।
রাজধানীর নিউ বেইলি রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের ১০ তলা প্রধান কার্যালয় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে এক অদ্ভুত চিত্র। ভবনের দ্বিতীয় তলায় নামমাত্র প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড চললেও তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলাজুড়ে বিরাজ করছে ভূতুড়ে পরিবেশ। মূল পরিকল্পনায় এখানে লাইব্রেরি ও ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। ভবনের সপ্তম থেকে দশম তলা পর্যন্ত ফ্লোর ভাড়া দেওয়া হলেও, পুরোনো ভবনের তিনতলা ও চারতলা গত পাঁচ বছর ধরে সম্পূর্ণ খালি। এই বিশাল ফ্লোর স্পেস ভাড়া দিয়ে অ্যাসোসিয়েশনের আয় বৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি।
এদিকে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনে অডিট করতে গিয়ে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের খোঁজ পেয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। অডিট প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশন আইন, ১৯৭৩’ লঙ্ঘন করে অনিয়মিতভাবে জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি ও বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে চুক্তিভিত্তিক জনবল নিয়োগে ১৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন সরকারি বিল থেকে নির্ধারিত হারে ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া অস্বাভাবিক হারে বাল্ক এসএমএস বিলের নামে ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা লোপাটের তথ্য মিলেছে।
একই সঙ্গে জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ফেরদৌসী আক্তার ডলিকে বিশেষ সুবিধা দিতে গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কার্যালয়ে অবস্থিত তার মালিকানাধীন ‘ডলি বিউটি পার্লার’-এর ভাড়া বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম আদায় করা হয়েছে, যার ফলে অ্যাসোসিয়েশনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। এমনকি কোনো বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন না করেই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করার অকাট্য প্রমাণ উঠে এসেছে অডিট রিপোর্টে।
নামসর্বস্ব কর্মশালা ও স্থবির গাইড কার্যক্রম
দেশের সব নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সমমানের মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক ছাত্রীর কাছ থেকে সেশনের শুরুতে যে ১৫ টাকা করে ফি নেওয়া হয়, তা মূলত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গাইডিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যয় করার কথা। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে কেন্দ্র, অঞ্চল, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গৎবাঁধা নিয়মে নামসর্বস্ব সভা, সেমিনার ও কর্মশালা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় অনিয়ম হলো—কেন্দ্র থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ঘুরেফিরে একই ব্যক্তিদের দিয়ে এসব অনুষ্ঠান করানো হচ্ছে। ফলে গার্ল গাইডিং কার্যক্রমে আধুনিকতা বা নতুনত্বের কোনো ছোঁয়া নেই। এসব সভা-সেমিনার থেকে কোনো ভালো সুপারিশ, পরামর্শ বা নতুন কাজের প্রস্তাব এলেও, তা মূল কর্মসূচিতে প্রয়োগ করার কোনো নজির গত সাত বছরে দেখা যায়নি।
পকেট সিন্ডিকেট ও পদায়নের নামে স্বেচ্ছাচারিতা
অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রবীণ সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বহু বছর ধরে গাইডে নিরবচ্ছিন্নভাবে স্বেচ্ছাসেবা দিয়েও ত্যাগী কর্মীরা জাতীয় কমিটিতে জায়গা পান না। অথচ শামীমা আরা ও জীনাত তাবাসসুমের মতো ব্যক্তিরা নিয়মবহির্ভূতভাবে কমিটিতে ঢুকে জাতীয় কমিশনার জেবুন্নেছার অন্যায় কর্মকাণ্ডের প্রধান দোসর হয়ে উঠেছেন।’ জানা গেছে, শামীমা আরা পেশায় একজন কলেজ শিক্ষক ছিলেন এবং কোনোকালেই গার্ল গাইডসের মূল ধারার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। অথচ গঠনবিধি অনুযায়ী জাতীয় কমিটিতে একজন পেশাদার আইনজীবী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার স্পষ্ট বিধান থাকলেও, কাজী জেবুন্নেছা নিজের কোনো মেয়াদেই কোনো আইনজীবীকে কমিটিতে রাখেননি।
তবে জেবুন্নেছা যার কাছ থেকে নিজের রেঞ্জের ভুয়া সনদ নিয়েছিলেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি। গাইডের যাবতীয় নিয়মনীতি ও নৈতিকতা ভঙ্গ করে তিনি সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ কানিজ মাহমুদাকে রেঞ্জার সাব-কমিটির সদস্য পদে বসিয়েছেন। একইভাবে গঠনবিধি সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে নড়াইলের সাবেক ডিসি আঞ্জুমান আরাকে ২০২৩ সালের নির্বাচনে প্রার্থী করে তাকে জিতিয়ে আনা হয়। পরে গাইডিংয়ের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও আঞ্জুমান আরাকে ১৩টি জেলা নিয়ে গঠিত সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ‘ঢাকা অঞ্চল’-এর আঞ্চলিক কমিশনারের মতো বড় পদ উপহার দেওয়া হয়।
ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অপকৌশল ও পদত্যাগ
জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগম নিজের প্রশাসনিক দুর্বলতা ঢাকতে এবং একচেটিয়া রাজত্ব কায়েম করতে নির্বাচনের পরপরই একটি শক্তিশালী পকেট সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই চক্রের জোরেই তিনি প্রথম মেয়াদে নিয়ম ভেঙে অতিরিক্ত এক বছর চার মাস জাতীয় কমিশনারের পদ দখল করে রাখেন। চলতি ২০২৬ সালের ১০ মার্চ তার দ্বিতীয় মেয়াদের সময়সীমা শেষ হলেও তিনি নতুন কোনো নির্বাচনের ব্যবস্থা করেননি। উল্টো জাতীয় কমিশনার পদে থাকার সর্বোচ্চ মেয়াদ ‘পর পর দুই মেয়াদের’ বদলে ‘পর পর তিন মেয়াদে’ উন্নীত করার জন্য মরিয়া অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেবুন্নেছার এই অর্থলিপ্সু ও স্বৈরাচারী চক্রের মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ডেপুটি জাতীয় কমিশনার সাবিনা ফেরদৌস, জাতীয় কার্যালয়ের বেতনভুক্ত ব্যক্তিগত সহকারী মালেকা পারভীন, জেনারেল সেক্রেটারি তানজিনা বিনতে মোশাররফ এবং হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান। এ সিন্ডিকেটের তালিকায় আরও রয়েছেন ডেপুটি জাতীয় কমিশনার (প্রোগ্রাম) প্রফেসর ইয়াসমিন আহমেদ, রাজধানীর আঞ্চলিক কমিশনার রওশন ইসলাম এবং রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক কমিশনার সিরাজুম মুনিরা। এ সিন্ডিকেটের যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ সদস্যরা প্রতিবাদ করতে গেলেই তাদের কমিটি থেকে বহিষ্কার ও সদস্য পদ বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়। কাজী জেবুন্নেছার এমন চরম স্বৈরাচারী আচরণের প্রতিবাদে এরই মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব, প্রকল্প কমিশনার ও গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ফারহানা হক পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
কাজী জেবুন্নেছার স্বামী সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ, তার স্বামীর দুলাভাই মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া—এর সুবাদে জেবুন্নেছা প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র প্রভাব ও নানা অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছেন। অর্থ তছরুপের আরও বড় প্রমাণ মেলে অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয় স্থানান্তর প্রকল্পে। জাতীয় কার্যালয় পুরোনো ভবন থেকে নতুন ভবনে স্থানান্তরের জন্য ৬০ লাখ ৪৫ হাজার টাকার একটি বাজেট প্রাক্কলন (এস্টিমেট) করা হয়েছিল। কিন্তু সেই উন্নয়ন ফান্ড থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা কেটে নিয়ে কাজী জেবুন্নেছা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিলাসিতার জন্য নিজের অফিস কক্ষ সাজানোর কাজে লাগিয়েছেন। অথচ মূল প্রস্তাবনায় ভবনে একটি আধুনিক লাইব্রেরি ও ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি।
সাড়ে ৫ কোটির বিশেষ বরাদ্দ ও ভুয়া ভাউচারের মহোৎসব
গত সাত বছরে ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের সারা দেশের সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে কাজী জেবুন্নেছার চরম স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডে। কাঠামোগত উন্নয়ন, নতুন নেতৃত্ব তৈরি, জনবল নিয়োগ কিংবা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে গাইডিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনাই বর্তমান কমিটির নেই। অ্যাসোসিয়েশনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা থাকলেও গত সাত বছরে কোনো নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
আর্থিক অস্বচ্ছতার চিত্র এতটাই ভয়াবহ যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় রেঞ্জার ক্যাম্প’ এবং ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় সম্মেলন’-এর ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসাব এখন পর্যন্ত সম্পন্ন করা হয়নি। প্রতি বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিশেষ বরাদ্দ পায় গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু এই বিশাল সরকারি অর্থ ব্যয়ে কোনো ধরনের আর্থিক শৃঙ্খলা বা নিয়মনীতি মানা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মনগড়া ও ভুয়া ভাউচার বানিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হচ্ছে, যা এই পকেট সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় সম্মেলনে হট্টগোল ও অবৈধভাবে মেয়াদ বৃদ্ধি
২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সম্মেলনে কোনো পূর্ব এজেন্ডা ছাড়াই সুকৌশলে রাত ৯টায় গঠনবিধি সংশোধনের বিতর্কিত প্রস্তাব তোলেন জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগম। তিনি নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে ‘পর পর সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের’ বিধান পরিবর্তন করে ‘তিন মেয়াদ’ করার প্রস্তাব করেন।
এ সময় গণতান্ত্রিক ব্যালট প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে প্রকাশ্য স্টেজে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিতে গেলে সভাস্থলে তীব্র হট্টগোল ও উত্তেজনা তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে সাধারণ কাউন্সিলরদের একটি বড় অংশ অধিবেশনস্থল ত্যাগ করলেও জেবুন্নেছার পকেট সিন্ডিকেটের সদস্যরা স্টেজে উঠে অনুপস্থিত ১০ থেকে ১৫ জনের নামে ভুয়া স্বাক্ষর করেন। এ নাটকীয় ঘটনার পর, গত ৫ মার্চ জেনারেল সেক্রেটারির স্বাক্ষরিত চিঠিতে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কমিটির মেয়াদ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়া হয়; যা সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও বিধির ধারা ১৯(ঘ), ১৯(ছ), ২১, ২৫(গ) এবং ২৫(ঙ)-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এর আগেও ২০১৮-২০২১ মেয়াদের পর নির্বাচন পিছিয়ে অতিরিক্ত এক বছর চার মাস অবৈধভাবে পদ দখল করে রেখেছিলেন জেবুন্নেছা। ২০২৩ সালের কমিটির মেয়াদ চলতি ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হলেও ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে আবারও অক্টোবর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়িয়ে নতুন নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করছেন।
‘হলদে পাখি’র ফান্ডে ১ কোটির পাজেরো ও মারিয়া ইয়াসমীনের পদত্যাগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘হলদে পাখি’র কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও জোরদার করার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা তখন সেই বরাদ্দের ৮৫ লাখ টাকা দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির জন্য একটি এবং আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর জন্য দুটি সাধারণ গাড়ি কেনার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু সেই যৌক্তিক প্রস্তাব এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে স্বৈরাচারী প্রক্রিয়ায় অ্যাসোসিয়েশনের মূল তহবিল থেকে ১৫ লাখ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাজেট থেকে ৮৫ লাখ টাকা কেটে মোট ১ কোটি টাকা দিয়ে নিজের জন্য একটি আলিশান ‘পাজেরো স্পোর্টস জিপ’ ক্রয় করেন কাজী জেবুন্নেছা। এই বিলাসবহুল গাড়িটি বর্তমানে সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে সার্বক্ষণিক ব্যবহৃত হচ্ছে, যার পেছনে প্রতি বছর মেইনটেইন্যান্স খরচ দেখানো হচ্ছে ১০ লাখ টাকার বেশি। সরকারি বরাদ্দের অর্থ এভাবে লুটপাট করে গাড়ি কেনার প্রতিবাদে জাতীয় কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন হলদে পাখির তৎকালীন কমিশনার ডা. মারিয়া ইয়াসমীন।
জেবুন্নেছার এমন একচ্ছত্র স্বৈরাচারী আচরণের কারণে গত সাত বছর ধরে গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকাণ্ড উপজেলা পর্যায় তো দূরের কথা, দেশের জেলাগুলোতেও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। অথচ ছেলেদের সমসাময়িক প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ স্কাউটস’ দেশব্যাপী অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের সেই গতির সঙ্গে কোনোভাবেই তাল মেলাতে পারছে না গার্ল গাইডস্। প্রশাসন সাব-কমিটির সভায় ২০২০ সালে দক্ষ ট্রেনার ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জোর সুপারিশ করা হলেও, কাজী জেবুন্নেছার সিদ্ধান্তহীনতা ও উদাসীনতার কারণে তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে নিয়মিত ত্রৈমাসিক ‘গাইড বার্তা’ প্রকাশের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু গত পাঁচ বছর জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছার সিদ্ধান্তহীনতা ও ফাইলের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে গাইড বার্তা প্রকাশনা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এখন নিজের সেই ব্যর্থতা ও দোষ ঢাকতে একসঙ্গে দুই থেকে তিনটি গাইড বার্তা ছাপানো হচ্ছে, যা অ্যাসোসিয়েশনের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ। এখানেই শেষ নয়; ২০২৩ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে গাইডসের নিজস্ব তহবিলের সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ করে ‘চার বছরের যাত্রাপথের সোনালি অধ্যায়’ নামক একটি পুস্তিকা ছাপানো হয়। সেখানে গার্ল গাইডসের মূল কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব না দিয়ে জেবুন্নেছা নিজের শতাধিক ছবি যুক্ত করে মূলত ব্যক্তিগত প্রচার চালিয়েছেন।
এ ছাড়া সংগঠনের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে অনির্বাচিত ও নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে কাজী জেবুন্নেছা নিজেকে আহ্বায়ক করে একটি বিশেষ সাব-কমিটি গঠন করেন। এরপর নিজ ক্ষমতাবলে উপসচিব সাবিনা ফেরদৌসকে ‘ডেপুটি জাতীয় কমিশনার (প্রশাসন)’ পদে বসিয়ে দেন।
গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের বিদ্যমান গঠনবিধিতে শুধু ‘জাতীয় কমিশনার’ ও ‘কোষাধ্যক্ষ’ পদের ক্ষেত্রে বলা আছে—‘পর পর দুইবারের বেশি এক ব্যক্তি পদপ্রার্থী হতে পারবেন না।’ কিন্তু জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বাকি ২৪টি পদের জন্য সময়সীমার কোনো স্পষ্ট উল্লেখ বা কড়াকড়ি নেই। এ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে একই ব্যক্তিরা কার্যনির্বাহী কমিটিতে টানা ২০ থেকে ২১ বছর ধরে জগদ্দল পাথরের মতো আসীন হয়ে আছেন।
স্কাউটসে সংস্কার হলেও অধরা গার্ল গাইডস্: ২৭ কোটির ‘হলদে পাখি’ প্রকল্পে হরিলুট
২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর বাংলাদেশ স্কাউটসের কার্যক্রমকে গতিশীল, বেগবান ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করার লক্ষ্যে এর জাতীয় নির্বাহী কমিটি বিলুপ্ত করে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। স্কাউটসে এমন সংস্কারের হাওয়া লাগলেও, বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনকে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট সম্পূর্ণ কুক্ষিগত করে রেখেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত সাত বছরে দেশের ১০টি অঞ্চলে ১২৫টি মৌলিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৫ হাজার ৬০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘হলদে পাখি’ শাখা খোলা হয়। এ প্রকল্পের নামে সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও মাঠপর্যায়ে কাজের কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। উল্টো, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ‘প্রশাসনিক, আর্থিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ’ শিরোনামে যে ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করা হয়, তার সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হলদে পাখি সম্প্রসারণের দূরতম কোনো সম্পর্ক বা কার্যকারিতা ছিল না। এ ছাড়া কোমলমতি শিশুদের জন্য হলদে পাখির যে পোশাক দেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং কাপড়ের মানও অত্যন্ত নিম্নমানের। নিয়ম অনুযায়ী হলদে পাখির জন্য ৫ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাবনা সভায় অনুমোদনের কথা থাকলেও, সেখানে কারও কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি। এমনকি সেই নীতিনির্ধারণী সভায় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এ বিশাল বাজেটের নথিতে খোদ সংগঠনের কোষাধ্যক্ষের কোনো স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি।
সরকারি ছুটির দিন শনিবার গাইডের অফিস খোলা থাকলেও দিনের বেলায় অফিস থাকে অনেকটা নিভৃত। জেবুন্নেছা সাধারণত সন্ধ্যার পর অফিসে আসেন এবং রাত ১০টা পর্যন্ত অবস্থান করেন। তার এ খামখেয়ালিপনার কারণে বেইলি রোডের ১০ তলা ভবনের এসি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পেছনে বিপুল পরিমাণ ভূতুড়ে বিল আসছে। সূত্রমতে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যেখানে বিদ্যুৎ বিল ছিল ২ লাখ ৮ হাজার টাকা, সেখানে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা লাফিয়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকায় এবং একই বছরের আগস্টে বিল আসে ৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। সময়মতো এই বিশাল বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় অ্যাসোসিয়েশনের তহবিল থেকে নিয়মিত জরিমানাও গুনতে হচ্ছে।
এসব ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় কমিশনার কাজী জেবুন্নেছা বেগমের মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে অনিয়মের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘এসব বিষয়ে কথা বলতে হলে আগে সাক্ষাৎকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে হবে, এরপর প্রশ্ন করতে পারবেন।’ এরপরই তিনি লাইন কেটে দেন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী এই নারী সংগঠনের চরম অবক্ষয় ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের মোবাইল ফোনে কয়েক দফা কল এবং খুদেবার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও তার পক্ষ থেকেও কোনো সাড়া বা উত্তর পাওয়া যায়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (বক্তব্য সংরক্ষিত আছে) কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ গার্ল গাইডস্ অ্যাসোসিয়েশনে অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে, এমনটি শুনেছি। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে গার্ল গাইডসের ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়া হয়নি। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এর একটি সমাধান করা হবে। ইস্যুটি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।