হৃদরোগ দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অথচ কুড়িগ্রামের প্রায় ২৩ লাখ মানুষের জন্য সরকারি ব্যবস্থায় হৃদরোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দুটি পরীক্ষা ইকোকার্ডিওগ্রাফি (ইকো) ও এক্সারসাইজ ট্রেডমিল টেস্ট (ইটিটি) কার্যত অচল। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, চারজন টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও দুই বছর আট মাস ধরে ব্যবহার হচ্ছে না মেশিন দুটি। রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে বাড়তি খরচে করাতে হচ্ছে পরীক্ষা। সরকারি হাসপাতালে যে পরীক্ষার ফি প্রায় ২০০ টাকা, তা বাইরে করতে লাগছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, নতুন ভবনের নিচতলায় ইকো ও ইটিটি কক্ষ তালাবদ্ধ। পাশেই এক্স-রে বিভাগে রোগীদের ভিড়; কিন্তু হৃদরোগ নির্ণয়ের কক্ষ দুটি নীরব। দায়িত্বপ্রাপ্ত টেকনিশিয়ানদের দেখা গেছে অন্য বিভাগে কাজ করতে। হাসপাতালের পঞ্চম তলায় কার্ডিওলজি বিভাগে নিয়মিত রোগী ভর্তি হলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না হওয়ায় চিকিৎসকরা তাদের বাইরে পাঠাচ্ছেন।
এ পরিস্থিতির শুরু ২০২৩ সালে। ওই বছর আধুনিক হৃদরোগ নির্ণয় সেবা চালুর লক্ষ্যে হাসপাতালে ইকোকার্ডিওগ্রাফি মেশিন চালু করা হয়; কিন্তু চালুর প্রায় এক মাসের মাথায় পাসওয়ার্ড-সংক্রান্ত জটিলতায় বন্ধ হয়ে যায় সেটি। এরপর বারবার যোগাযোগ করেও মেশিন সচল করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ইটিটি মেশিনও পড়ে রয়েছে ব্যবহারহীন অবস্থায়। ফলে জেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় হৃদরোগ নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে রোগীদের ওপর। হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে হৃদরোগের লক্ষণ নিয়ে আসে আরও অন্তত ৫০ জন। তাদের উল্লেখযোগ্য অংশেরই ইকোকার্ডিওগ্রাফি প্রয়োজন পড়ে; কিন্তু হাসপাতাল থেকে সে সেবা না পেয়ে সবাইকে যেতে হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।
উলিপুর উপজেলার কাশেম মিয়া বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে দুবার ইকোকার্ডিওগ্রাফি করাতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ টাকা। চিকিৎসক তাকে আরও একটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। ‘হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি; কিন্তু পরীক্ষা সব করতে হয় বাইরে। বয়স হয়েছে, ওঠানামা করতেও কষ্ট হয়। তার ওপর এত টাকা খরচ করা খুব কঠিন’— বললেন কাশেম মিয়া।
একই অবস্থা কমল কান্তের। বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হওয়া এই রোগীকেও চিকিৎসকরা ইকো করার পরামর্শ দিয়েছেন; কিন্তু আর্থিক সংকটে পরীক্ষা করাতে পারেননি এখনো তিনি।
শুধু ভর্তি রোগী নয়, দীর্ঘদিনের হৃদরোগীরাও একই সমস্যায় পড়ছে। পঞ্চাশোর্ধ্ব মাহফুজার রহমান রাজু বললেন, ‘প্রতিবার বুকে ব্যথা বাড়লে ইকো করাতে হয়। সরকারি হাসপাতালে সুযোগ না থাকায় বারবার যেতে হয় বাইরে। আমরা কম খরচে সরকারি সেবা চাই।’
চিকিৎসকদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় জনবল থাকলেও যন্ত্র অচল থাকায় তাদের হাত-পা বাঁধা। কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. সাজ্জাদুর রহমানের ভাষায়, ‘কার্ডিওলজি বিভাগে রয়েছেন দুজন চিকিৎসক ও চারজন টেকনিশিয়ান। কিন্তু হৃদরোগ নির্ণয় যন্ত্র অচল থাকায় পরীক্ষা করতে পারছি না রোগীদের। মেশিন চালু হলে রোগীদের ভোগান্তি ও খরচ— দুটিই কমবে।’
হৃদরোগীরা বলছেন, জনবল, অবকাঠামো ও যন্ত্র থাকার পরও কেন বছরের পর বছর একটি জেলার মানুষ সরকারি হাসপাতালে হৃদরোগ নির্ণয়ের মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত থাকবেন? মাত্র একটি কারিগরি সমস্যার সমাধান না হওয়ায় যদি ২৩ লাখ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়, তবে সেটি শুধু একটি যন্ত্রের অচলাবস্থা নয়; এটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবার জবাবদিহি ও সমন্বয়েরও বড় ঘাটতির প্রতিচ্ছবি।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী। তার বক্তব্য, ‘আমরা কয়েকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। চিঠিও দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বন্ধ থাকা এন্ডোস্কোপি মেশিন চালু করতে পেরেছি।’ ইকো ও ইটিটি মেশিনও দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে— আশা করেন তিনি।