Image description
ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢলে দেশজুড়ে দুর্ভোগ

ভারি বর্ষণ পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় দেশজুড়ে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। চট্টগ্রামের ৫ জেলায় ৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তলিয়ে গেছে দেড় লাখ হেক্টর জমির ফসল। নষ্ট হয়েছে ২৪১ কিমি. সড়ক। রোববারও ভারি বৃষ্টিপাতে নগরীর নিচু এলাকা ফের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আজও দেশের ছয় বিভাগে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। ৫ দিন বন্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। বান্দরবানে বন্য-পাহাড় ধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। স্বাভাবিক হয়নি সড়ক যোগাযোগ। রাঙামাটিতে দুর্গত এলাকা ও আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।

বন্যার পানিতে ডুবে কক্সবাজারের চকরিয়ায় দুই শিশু ও এক কিশোর এবং পেকুয়ায় এক শিশু মারা গেছে। ভোলার মনপুরায় রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ত্রাণ পাননি দুর্গতরা। নেত্রকোনার কলমাকান্দায় উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মৌলভীবাজারে পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। বন্যাকবলিত ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ৬০০ মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।

ছয় বিভাগে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা : দেশের ছয় বিভাগে আজ ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। রোববার দুপুরে আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমানের সই করা এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ভারি বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে। শনিবার রাত থেকে টানা বৃষ্টিপাতে তলিয়ে গেছে ঢাকা। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক জানিয়েছেন, ঢাকায় টানা ভারি বৃষ্টির তীব্রতা কমে আসতে পারে। আজ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে পারে। শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ৯৭ মিলিমিটার এবং ভোর ৬টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ৯৫ মিলিমিটার।

অধিদপ্তর জানায়, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে এ বৃষ্টি হলেও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারি বর্ষণ চলছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকালে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের সাঙ্গু, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কুশিয়ারা এবং নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর পাঁচটি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

পাঁচ জেলায় ৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত : চট্টগ্রাম বিভাগের তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজারসহ ৫ জেলায় ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে ১ লাখ ৫৩ হাজার ১০৩ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে শুধু চট্টগ্রাম দক্ষিণে ২৪১ কিলোমিটার রাস্তার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই রাস্তা মেরামত করতে ব্যয় হবে ২১০ কোটি টাকার মতো। আর স্বল্পমেয়াদি এসব রাস্তা মেরামত করতে ব্যয় হবে ৩৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের প্রদত্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠেছে। প্রতিবেদনটি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম দক্ষিণের উপজেলাগুলোতে ভারি বর্ষণ ও বন্যায় জাতীয় মহাসড়ক ৩২ দশমিক ২৩ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৩৩ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার ও জেলা মহাসড়ক ১৭৬ কিলোমিটারসহ সর্বমোট ২৪১ দশমিক ৩১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে স্বল্পমেয়াদি ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ২১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্যের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম জেলায় ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। সওজের আওতাধীন ২০টি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলজিইডির আওতাধীন জেলার ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলা ও মহানগরের ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বলা হচ্ছে সাড়ে ৮ লাখের মতো।

সওজের (দক্ষিণ) সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা যুগান্তরকে বলেন, শুধু দক্ষিণের আওতাধীন ৬৫ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যান্য কার্যালয়ের আওতাধীন সড়কে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর এক জরিপে বলেছে, প্রায় ১০ হাজার পুকুর-জলাশয় ডুবে ৯১ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কেবল মৎস্য খাতে।

চট্টগ্রাম নগরীতেও সড়ক বেহাল : চট্টগ্রাম নগরীতে এ বছর বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় একশ কিলোমিটার সড়ক। এরই মধ্যে কিছু সড়কের অবস্থা একেবারেই বেহাল। খানাখন্দ আর গর্তে ভরা এসব সড়কে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা, নষ্ট হচ্ছে যানবাহন। রোববারও ভারি বৃষ্টিপাতে নগরীর বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

বাঁশখালীতে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের সংকট : বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও রোববার ভোর থেকে আবারও টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ফের বন্যা পরিস্থিতি অবনতি দেখা দিয়েছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। পানিবন্দি মানুষের এখন প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাওয়ার। রোববার সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার বাহারছাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা এলাকায় ভিন্ন জায়গা থেকে আসা ত্রাণবাহী বেশকিছু গাড়ি লক্ষ্য করা যায়।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু : ৫ দিন বন্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল রোববার শুরু হয়েছে। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন চট্টগ্রাম স্টেশন ছেড়ে গেছে। তবে যাত্রী ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় কম। বিভিন্ন স্থানে লাইন ডুবে যাওয়ার কারণে মঙ্গলবার থেকে এ রুটে ট্রেন চলাচল স্থগিত করা হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর ত্রাণ তৎপরতা : চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, বোয়ালখালীসহ ৩ পার্বত্য জেলায় সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ, উদ্ধার কার্যক্রম এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখেছে সেনাবাহিনী। চট্টগ্রাম সেনানিবাস এবং ৩ পার্বত্য রিজিয়ন হতে গত ২৪ ঘণ্টায় ছোট ছোট মোবাইল টিমে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকায় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন দল এসব কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রায় ৫ হাজার লোকের মাঝে জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়েছে সেনাবাহিনী।

বান্দরবানে বিপর্যস্ত জনজীবন : বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও সড়ক যোগাযোগ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। রোববার চতুর্থ দিনের মতো বান্দরবান জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তবে লামা-আলীকদম উপজেলায় অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ চালু হয়েছে। কিন্তু রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি এবং থানচি-আলীকদম, লামা-সূয়ালক সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় পাহাড় ধসে সড়কের ওপরে মাটি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

সরকারের পাশাপাশি জেলা বিএনপির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ-সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী এবং জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাবেদ রেজা পৃথকভাবে বানভাসি মানুষদের শুকনো খাবার, মোমবাতি ও পানির বোতল দুর্গতদের হাতে হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন।

জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, বন্যার্তদের সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে। জেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ও জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

রাঙামাটির দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী : রাঙামাটিতে প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনো নাজুক। জেলায় পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৫ হাজার পরিবারের ৩০ হাজার মানুষ। রোববার বিকালে রাঙামাটি সদরে পাহাড়ধসের দুর্গত এলাকা ও আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্যোগ মোকাবিলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বিকাল ৫টার দিকে রাঙামাটি পৌঁছলে প্রথমে শহরের তবলছড়িতে অবস্থিত ওমদা মিয়া পাহাড় উচ্চ বিদ্যালয়ে খোলা আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং দুর্গত লোকজনের খোঁজখবর নেন।

এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ও রাঙামাটির সংসদ-সদস্য দীপেন দেওয়ান, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব, সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা, জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু, সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো, সাধারণ সম্পাদ মামুনুর রশিদসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

কক্সবাজারে পানিতে তিন শিশু ও এক তরুণের মৃত্যু : কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে পৃথক ঘটনায় দুই শিশু ও এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল একজনের লাশ উদ্ধার করেছে। মারা যাওয়ারা হলেন- চকরিয়া পৌরসভার হাসেম মাস্টারপাড়ার আবুল হাসেমের দেড় বছরের ছেলে মোহাম্মদ হাসান, কৈয়ারবিল ইউনিয়নের খোজাখালী জলদাশপাড়ার তুফান দাশের ছেলে সুজিত দাশ (১২) ও বরইতলী ইউনিয়নের শান্তিবাজার ফতেহ আলী সিকদারপাড়ার মাওলানা নেছার আহমদের ছেলে আতাউল্লাহ (২০)। শনিবার বিকালে বন্যার পানির স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হয় সুজিত। পরে রোববার বিকালে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল মাতামুহুরী নদীর পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। একই দিন বিকাল ৫টার দিকে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের শান্তিবাজার ফতেহ আলী সিকদারপাড়ায় পানিতে ডুবে আতাউল্লাহ মারা যান। এ ছাড়া এদিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চকরিয়া পৌরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ড পালাকাটা হাসেম মাস্টারপাড়ার শিশু হাসান বৃষ্টির পানিতে পড়ে মারা যায়।

এ ছাড়া পেকুয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে ২১ মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার সদর ইউপির বলিরপাড়ায় এ ঘটনাটি ঘটে। মৃত শিশু মুশফিকুর রহিম সৌদি প্রবাসী নাছিরের ছেলে।

মনপুরায় ব্যাপক ক্ষতি, ত্রাণ পাননি দুর্গতরা : ভোলার মনপুরায় আমন ফসলের খেত, শাক-সবজি, কাঁচাপাকা রাস্তা, ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়। উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে এখনো ২০ হাজারের ওপরে মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। এখন পর্যন্ত দুর্গত এলাকায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কেউ ত্রাণ নিয়ে পাশে দাঁড়ায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে স্বেচ্ছাশ্রমে পানি নিষ্কাশনের কাজ করছে যুবদলের নেতাকর্মীরা এমনটি জানিয়েছেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শামসুদ্দিন মোল্লা ও সদস্য সচিব হাফেজ আবদুর রহিম। রোববার বেলা ৩টায় ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দেন উপজেলা ঘূর্ণিঝড় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন। তিনি জানান, মনপুরায় উপজেলার ৩০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

মৌলভীবাজার নদীতে পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি : অতি ভারি বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার পাঁচটি উপজেলার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। নদী ভাঙনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনগর উপজেলা। এই উপজেলায় মনু নদীর দুটি স্থানে ভাঙনের ফলে ৫টি ইউনিয়নের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া বন্যায় স্রোতের টানে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে জেলার মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদর, রাজনগর, কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন। সরকারি হিসাবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৬ হাজার ছাড়িয়েছে। বন্যায় দুর্গত মানুষের মাঝে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ, জেলা রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, জেলা বিএনপি, জেলা যুবদল, জেলা জামায়াত, সমাজসেবক ও বিভিন্ন ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

কলমাকান্দায় উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে : নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সব নদ-নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে উপজেলার বেশকিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ওই নদীর কলমাকান্দা ডাকবাংলো পয়েন্টে পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ৬ দশমিক ৫৫ সেন্টিমিটার।

বন্যাকবলিত ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন : টানা ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও ভূমিধসে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশের ১১ জেলায় মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, জরুরি চিকিৎসাসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় কাজ করছেন তারা। রোববার বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুর জেলার ৯০ পয়েন্টে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং কার্যক্রম করা হচ্ছে। বান্দরবানের বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় ১১৬ পর্যটকসহ ১২২ পরিবারের ৬ শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ জনকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কে উপড়ে পড়া গাছ ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে বিজিবি। এছাড়াও কক্সবাজারের নাইক্ষ্যংছড়িতে একটি স্টিলের সেতু রক্ষায় কাজ করা হচ্ছে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার, ব্যুরো ও প্রতিনিধিরা]