রবিবার রাত ১১টা। রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ মানুষই হয়তো প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঘুমাতে যাওয়ার। তবে জেগে ঢাকা উত্তর সিটির কড়াইল বস্তির মানুষেরা। তখনো সেখানে কোমর সমান পানি। ছেলে-বুড়ো সবার আশ্রয় খাটের ওপর, আসবাবপত্রও খাটের ওপরেই। ডুবেছে রান্নার চুলা, অনেকেরই পেটে পড়েনি কোনো দানাপানি। কড়াইলের মতো ঢাকার প্রায় সব বস্তির বাসিন্দাদের একই দশা।
সিটি করপোরেশনের কর্তাদের নগরের বিভিন্ন এলাকার পানি সরাতে তৎপরতা থাকলেও বস্তিবাসীর অপেক্ষা— আপনা-আপনি কখন নেমে যাবে পানি। টানা ভারী বৃষ্টির পর নগরে জমা পানি সরাতে সরকারি দপ্তরগুলোর দৌড়ঝাঁপ শুরু হলেও বস্তিবাসীকে নিয়ে ভাবার যেন নেই কেউই।
শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীতে মোট বৃষ্টি হয় ১৭৫ মিলিমিটার। আর এই ভারী বর্ষণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বেশিরভাগ এলাকা চলে যায় পানির নিচে। ফলে দিনভর নানা ভোগান্তিতে পড়েন রাজধানীর পথচলতি মানুষেরা। যদিও সন্ধ্যার দিকে অধিকাংশ এলাকার পানি নামতে শুরু করে। সংকট সমাধানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কাজ শুরু করে দেয় দ্রুতই। তবে সেই দ্রুতগতির তালিকার বাইরে ছিল ঢাকার বস্তিগুলো। সেখানকার মানুষগুলোর কথা ভাবার সময় পায়নি সরকারের কোনো সংস্থাই।
কড়াইল বস্তির বাসিন্দা হাসিবুর। রবিবার রাতে তার সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হচ্ছিল মোবাইল ফোনে। জানালেন, এখনো সেখানে কোমরপানি। বললেন, ‘ছেলে বুড়ো সবাই খাটের ওপরে বসে আছি দিনভর। ফ্রিজ, টিভি এবং যাবতীয় আসবাবপত্রও রাখা হয়েছে খাটের ওপর। যাদের খাট নেই তারা নতুন করে খাট কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ফ্রিজ, টিভি বাঁচাতে। এতে বাড়তি টাকা খরচ হয়েছে অনেকের।’
সেখানকার বাসিন্দা আলী নামে এক যুবক জানালেন, ৫০০ টাকার খাট কিনেছেন ২ হাজার টাকা দিয়ে।
ভারী বর্ষণে কড়াইল বস্তির মতো ঢাকার বিভিন্ন নিচু এলাকা এবং বস্তিতে পানি জমে কোমর পর্যন্ত। এর মধ্যে কালশী এবং মহাখালী এলাকার কয়েকটি বস্তি অন্যতম। পানিতে বস্তিগুলোর রান্নার চুলাও যায় ডুবে। সংকট দেখা দিয়েছে খাবার এবং খাবার পানির। এর মধ্যে কালশীর ষোলোবিঘা খেলার মাঠের পেছনের ৪টি বস্তির অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়।
বস্তিটির শিলা নামের এক বাসিন্দা একরাশ ক্ষোভ ঝেড়ে বললেন, ঢাকার মেয়ররা (প্রশাসক) বিভিন্ন এলাকার পানি সরাতে ব্যস্ত থাকলেও তাদের অপেক্ষা করতে হয় কখন আপনা-আপনি পানি নেমে যাবে। তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পানি নামানোর কোনো চেষ্টা নেই বলে করলেন অনুযোগ।
মহাখালীর সাততলা বস্তিরও কিছু বাসায় পানি উঠেছে। জোবায়ের নামে সেখানকার এক বাসিন্দা আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘পানি ওঠার কারণে মাটির চুলায় রান্না করতে হয় এমন বাসিন্দাদের ভোগান্তি বেশি হচ্ছে। এখনো কোমর পানি কড়াইল বস্তিতে।’
এর আগে রাত ১০টার দিকে সাততলা বস্তিরই মোজাম্মেল নামে আরেক বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় আগামীর সময়ের। বলছিলেন, ‘বৃষ্টির পর থেকে পানিবন্দি। ছেলেমেয়েরা না খেয়ে আছে। এখনো পর্যন্ত কেউ কোনো সাহায্য সহায়তা নিয়ে আসেনি।’
নগরপরিকল্পনাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, নিম্ন আয়ের মানুষ সবসময়ই থাকে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বাইরে, বস্তিবাসীর খোঁজ না রাখাই তার বড় প্রমাণ। ভারী বৃষ্টির পর পুরো শহরকে নিয়ে সবার মাথাব্যথা শুরু হলেও বস্তিবাসীকে নিয়ে ভাবার কেউ নেই। যতদিন পর্যন্ত সমাজে এমন বৈষম্য থাকবে ততদিন দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হবে না বলেও মত তাদের।