Image description

চলতি সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। রোববার (১২ই জুলাই) উভয়পক্ষ একে- অপরের ওপর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ ঘোষণা করেছে।
গত কয়েকদিনের পাল্টাপাল্টি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে এবং চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে গত ১৭ই জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক হয়েছিল, তা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে তিনি আলোচনার পথ এখনও খোলা রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা
১৭ই জুন দেশ দুইটির মধ্যে সমঝোতা চুক্তি সই হওয়ার পর গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে অন্তত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা চালায় বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান জানায়, অনুমোদনহীন পথে চলা একটি জাহাজকে সতর্ক করতে গুলি ছোড়া হলে সেটিতে আঘাত লাগে। এরপর আরেকটি জাহাজ অচল করে দেয়ার দাবি করে তেহরান।
এর জবাবে ৭-৮ই জুলাই ইরানে অতর্কিত করে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এরপর গত বৃহস্পতিবার ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেয়া আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের দিনেও তেহরানে হামলা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয় ইরান। ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) পক্ষ থেকে বলা হয়, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ( সেন্টকম) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখনও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়েই হতো।

১৪০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
মার্কিন সেন্টকম জানিয়েছে, শনিবার (১১ই জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর আগে গত তিন রাতের অভিযানে ইরানে মোট ৩০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি তাদের।
ওয়াশিংটনের ভাষ্য, বাণিজ্যিক জাহাজ ও নৌপথে ইরানের হামলার সক্ষমতা দুর্বল করতেই এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন বন্দরনগরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা ঘিরে উত্তেজনা
সর্বশেষ মার্কিন হামলার জবাবে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা
জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং ড্রোন হ্যাঙ্গার ধ্বংস করেছে।
কুয়েতে মার্কিন রাডার স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
ওমানে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর সহায়ক ও জ্বালানি সরবরাহ প্ল্যাটফর্মে আঘাত করেছে।
কাতারে মার্কিন যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও কমান্ড স্থাপনা ধ্বংস করেছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

কাতার সরকার জানিয়েছে, হামলার সময় ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছে।
আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।
অন্যদিকে বাহরাইনে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে এবং কাতারের রাজধানী দোহায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
পরে আমিরাতের জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানায়, সনাক্ত হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি তাদের সীমান্তের বাইরে ছিল।
জর্ডানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, রোববার ভোরে ইরান থেকে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র জর্ডানের ভূখণ্ডে পড়লেও এতে শুধু সামান্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এ ছাড়া ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাও জানিয়েছে, দেশটির মুসানদাম অঞ্চলে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে হতাহতের বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

পাশাপাশি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে জিএফএস গ্যালাক্সি নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর ১১ জন ভারতীয় নাবিকের মধ্যে ১০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। নয়াদিল্লি ওই হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
উত্তেজনা আরও বাড়লো
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামপ্রতিক হামলার গতি ও লক্ষ্যবস্তু আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। এর আগে তারা সতর্ক করেছিল, জাহাজে হামলার ঘটনায় যেকোনো প্রতিশোধের জবাব হবে ‘কঠোর’।
সামপ্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে হামলা চালালেও এপ্রিলের শুরু থেকে কাতার এবং মে মাসের শুরু থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি। এবার প্রথমবারের মতো কাতারেও হামলা চালিয়েছে ইরান।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কাতারই এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিল। দোহা আগেই জানিয়েছিল, হামলার মুখে থাকলে তারা মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করবে না।

বিশ্ববাজারে প্রভাব
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত অবরোধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও বাড়ছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ লিখেন, একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম- কথা রাখুন, নাহলে মূল্য দিতে হবে। বাস্তবতা এখন দরজায় কড়া নাড়ছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি অপরিশোধিত তেল বিক্রির অনুমতি বাতিল করে, যা কাতার ও সৌদি আরবের বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার পর নেয়া হয়। এরপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও বেড়ে যায়।