দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের দুয়ার খুলেছে চীন। চীনের সহযোগিতায় দেশে ২১ হাজার শয্যার ২০টি অত্যাধুনিক হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা চলছে। এর মধ্যে নারী-শিশুদের জন্য দুটি বিশেষায়িত হাসপাতালের আলোচনা রয়েছে। চিকিৎসাসেবায় আধুনিকায়নের পাশাপাশি বিদেশগামী রোগীর ভিড় কমাতে এ উদ্যোগে জোর দিচ্ছে সরকার।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘চীনের সঙ্গে ২০টি অত্যাধুনিক হাসপাতাল তৈরির আলোচনা চলছে। এর মধ্যে ১৮টি হবে জেনারেল হাসপাতাল এবং দুটি হবে নারী ও শিশুর জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল। চীন আমাদের এ প্রস্তাবে আগ্রহ দেখিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে জায়গা নির্ধারণ করে হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। হাসপাতালের জন্য জায়গা দেবে সরকার। খুবই সীমিত সুদে ঋণ দেবে চীন। আশা করছি, দেশের স্বাস্থ্যসেবায় এ উদ্যোগ নতুন মাত্রা যোগ করবে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ক্যানসার, কিডনি, লিভার, ইনফার্টিলিটিসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সেবায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অভাবে আধুনিকমানের সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে মানুষকে। তাই স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিকায়ন এবং বিশেষায়িত চিকিৎসায় জোর দিয়েছে সরকার। এ
রই মধ্যে আগুনে পোড়া রোগীদের সেবায় চীনের অর্থায়নে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ বার্ন ইউনিট নির্মাণকাজ চলছে। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের নীলফামারীতে চীনের অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল। দেশের স্বাস্থ্য খাতে চীনের আগ্রহকে কাজে লাগাতে আরও ২০টি হাসপাতাল তৈরিতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীনের অর্থায়নে দেশে ২১ হাজার শয্যার ২০টি হাসপাতাল নির্মিত হবে। এর মধ্যে ১ হাজার শয্যার ১৮টি সাধারণ হাসপাতাল এবং নারী ও শিশুদের জন্য ১ হাজার ৫০০ শয্যার দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হাসপাতাল নির্মাণে বিনিয়োগের বিষয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগে থেকেই এ বিষয়টা নিয়ে কাজ চলছে। মন্ত্রণালয়ে এ সম্পর্কিত মিটিং রয়েছে। সেখানে দেশের কোথায় হবে, কীভাবে হাসপাতাল সেবা দেবে-এ বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশের ওষুধশিল্পের কাঁচামাল, হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, টেস্ট কিট, রিএজেন্টসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহের অন্যতম বড় অংশীদার চীন। কভিড-১৯ মহামারির সময়ও চীনের টিকা দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গত ১৩ মে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৮০ ডোজ পোলিও টিকা অনুদান হিসেবে দিয়েছে চীনের শীর্ষস্থানীয় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক বায়োটেক লিমিটেডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) চলমান কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে এ টিকা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এবার হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে সরাসরি চিকিৎসাসেবা খাতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। নতুন এ প্রকল্পে বাংলাদেশ শুধু হাসপাতাল নির্মাণের জন্য জায়গা দেবে। বাকি সব কিছু করবে চীন। চীনের নির্মিত হাসপাতালের স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী অত্যন্ত উন্নত। হাসপাতালগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে ঘনবসতিপূর্ণ জেলাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। অগ্রাধিকার পাবে উত্তরবঙ্গ, খুলনা, চট্টগ্রাম অঞ্চল। পাশাপাশি দেশের অন্য অঞ্চলও এর আওতায় আসবে। হাসপাতালগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হবে, যাতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা যায়।
এ ব্যাপারে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু প্রথমে দেখতে হবে কোথায় প্রয়োজনীতা রয়েছে তা যাচাই করা। এরপর হাসপাতাল পরিচালনার জন্য চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। দেশের স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। নিজস্ব অর্থায়ন এবং নিজেদের যেসব স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র আছে সেগুলোর মানোন্নয়নে জোর দিতে হবে। এরপর বিদেশি সহযোগিতায় গুরুত্ব দিতে হবে।’