যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের বাজারে সম্প্রতি ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পাল্টা শুল্কের লড়াইয়ের বড় প্রভাব পড়েছে মার্কিন বাজারে। বাড়তি শুল্কের চাপে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি এখন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। চীনের এ বিশাল পতনের সুযোগে পোশাক সরবরাহে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানটি নিজের দখলে নিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য অন্যতম বড় অর্জন। ইউএস অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সার)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে।
যদিও চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের চেয়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের ক্ষেত্রে এই পতনের হার প্রায় ৪৩ শতাংশ। এতে বাংলাদেশ খুব সহজেই চীনকে টপকে দ্বিতীয় স্থানটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং শুল্কের প্রভাবে মার্কিন ক্রেতারা এখন ব্যাপকভাবে চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলে নতুন উৎস খোঁজার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা। চীনের এ বাজার হারানোর সরাসরি সুফল পাচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ওটেক্সার অফিসিয়াল তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ। রপ্তানি হওয়া পোশাকের পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশের রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২১ শতাংশ কমেছে। তবে মে মাসের একক পারফরম্যান্স বাংলাদেশের জন্য বেশ আশাব্যাঞ্জক ছিল। একক মাস হিসেবে ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ৫৮২ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে।
এটি ২০২৫ সালের মে মাসের ৫৪৮ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার তুলনায় ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ বেশি। ওটেক্সার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মেয়াদে মার্কিন বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি বিপুল পরিমাণে কমেছে। এই পাঁচ মাসে চীনের রপ্তানি আয় ৪২ দশমিক ৭৫ শতাংশ বা প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে মাত্র ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। গত বছরের একই সময়ে চীনের এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। পোশাকের পরিমাণের দিক থেকেও চীন ২৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ বড় পতনের মুখোমুখি হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন বাজারে চীনা পোশাকের প্রতি ইউনিটের দাম কমেছে ১৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
চীনের এ ঐতিহাসিক ধসের কারণেই মূলত বাংলাদেশ ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানটি নিজের দখলে রাখতে পেরেছে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বৈশ্বিক পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ২৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ মন্দা বাজারের মধ্যেও ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া তাদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী করেছে। ভিয়েতনাম ৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে। তাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে কম্বোডিয়া ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিপিএএমইএ পরিচালক এবং কাজী প্রিন্টিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফাহাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে, চীনের রপ্তানি কমেছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। এ বাস্তবতা আমাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন সময় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য, উদ্ভাবন এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করে বৈশ্বিক ক্রেতাদের আরও বেশি আস্থা অর্জনের।’ তিনি বলেন, ‘এ সাফল্যের পেছনে গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপিএএমইএ-এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বমানের অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে। সরকার, উদ্যোক্তা ও শিল্প খাত একসঙ্গে কাজ করলে আমরা শুধু দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখব না, বরং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারি আরও বৃদ্ধি করে দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হব।’