চীন, ভারত, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার কোনো ভোক্তার কাছে তার চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদিত কৃষি ও শিল্পপণ্য রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশের কৃষক কিংবা উদ্যোক্তা। এজন্য কোনো ব্যাংকে এলসি খুলতে হবে না। লাগবে না কোনো ডকুমেন্ট। কোনো এজেন্ট ছাড়াই সরাসরি ভোক্তার কাছ থেকে গ্রাহকের অনলাইনে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুযোগ অবারিত করতে দেশে প্রথমবারের মতো ক্রস বর্ডার (আন্তসীমান্ত) ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালার অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার।
নীতিমালাটির খসড়া তৈরি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সূত্র জানায়, নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সভা করার বিষয়ে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন। এটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ নিয়মিত অনলাইনে কেনাকাটা করেন। বিশ্বের মোট খুচরা বাণিজ্যের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এখন অনলাইনে সম্পন্ন হয়। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী ব্যবসা থেকে ব্যবসার (বিটুবি) এবং ব্যবসার সঙ্গে ভোক্তার (বিটুসি) লেনদেনসহ ডিজিটাল বাণিজ্যের বাজারটি বর্তমানে বিশাল আকার ধারণ করেছে। অনলাইনে ট্রিলিয়ন ডলারের এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত হওয়ার জন্য কিছু বিধিবিধান ও প্রক্রিয়া মেনে বাণিজ্য করা দরকার। ক্রস বর্ডার বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬ এর মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হবে।
কেন এই নীতিমালা : ছোট ছোট উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের কোনো পণ্য বা সবজি বা ফলমূল যদি বিদেশে রপ্তানি করতে চায়, তবে তা লাগেজ পার্টির মাধ্যমে পাঠায়। এ ধরনের বাণিজ্যের বিপরীতে যে পেমেন্ট হয়, তা ব্যাংকিং সিস্টেমে আসে না। হুন্ডি বা অন্য কোনো মাধ্যমে আসে। একইভাবে ক্রস বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা না থাকায় বাংলাদেশের ভোক্তারা অ্যামাজন, আলিবাবার মতো ইকমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি পণ্য আনতে পেমেন্ট সমস্যায় পড়েন। এ সমস্যা সমাধানে নীতিমালাটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
খসড়া নীতিমালায় যা আছে : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের খসড়ায় বলা হয়েছে, অনলাইনে পেমেন্ট সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্রসবর্ডার এস্ক্রো সার্ভিসের প্রচলন করা হবে। দেশীয় পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রণোদনা সহায়তা ছাড়াও বিদেশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রসেসিং সেন্টার ও ওয়্যারহাউস স্থাপনে নীতি সুবিধা দেওয়া হবে। ডিজিটাল বাণিজ্যের মাধ্যমে নকল বা ভেজাল পণ্য কেনাবেচা করা যাবে না। অনলাইন লটারি, জুয়া, বেটিং, গেমিং ইত্যাদি আয়োজন করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো গিফট কার্ড, গিফট ভাউচার বা অর্থের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, এমন কোনো কার্ড বা ডিজিটাল নম্বর বা মাধ্যম কেনাবেচা করতে পারবে না। অ্যামাজন, আলিবাবার মতো বিদেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে পণ্য বিক্রি করতে চাইলে বিক্রয়োত্তর সেবার জন্য অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে কোনো কোম্পানি স্থাপন ছাড়া বিদেশি বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এ নীতিমালা হলে ঋণপত্র (এলসি) খোলা ছাড়াই দেশে বসে যেকোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্যের মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্য ও সেবা আমদানি-রপ্তানি করা যাবে। অ্যামাজন, আলিবাবা, বেস্টবাইসহ বিশ্বজুড়ে থাকা সব ধরনের বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে অনলাইনে খুচরা ও বাল্ক আকারে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। আবার বাংলাদেশি দারাজ, অথবা ডট কম, বিক্রয় ডট কম, ফুডপান্ডার মতো দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোও বিদেশে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাবে। পাশাপাশি দেশীয় ব্র্যান্ডেড পণ্যসহ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্য এসব বৈশ্বিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রি ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, চীন বাংলাদশ থেকে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা জাতীয় ফল নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে।
এলসি করে এ ধরনের ছোট অ্যালটমেন্টের পণ্য রপ্তানি করা কঠিন। যদি এই নীতিমালাটি অনুমোদন হয়, তখন বাংলাদেশের কৃষক ও উদ্যোক্তাশ্রেণি নিজের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিদেশি ভোক্তার কাছে রপ্তানি করতে পারবে। জামদানিসহ কুটির শিল্পের বা ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের পণ্য বিদেশে বিক্রির সুযোগ বাড়বে। এজন্য কোনো এলসি করতে হবে না। ধরা যাক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো বাগান মালিক তার আমের ছবি অনলাইনে প্রদর্শন করল। ওই ছবি দেখে চীনের কোনো ভোক্তা সরাসরি অর্ডার দিতে পারবে। এর ফলে উদ্যোক্তার সঙ্গে ক্রেতার সরাসরি যোগাযোগ সম্পর্ক তৈরি হবে। প্রাণ আরএফএল গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ মোস্তাহিদাল হক বলেন, বর্তমানে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান চায়নিজ পণ্য এনে অনলাইনে ব্যবসা করছেন। এতে দেশীয় পণ্যের প্রসার হচ্ছে না।
এই নীতিমালার মধ্য দিয়ে দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঢোকার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজের সাবেক এই সিইও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের একটি জামদানি শাড়ি কিংবা হাতের কাজ করা পাঞ্জাবি বিদেশি ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে হলে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠাতে হয়। এতে পেমেন্টসহ নানা জটিলতা তৈরি হয়। ক্রসবর্ডার বাণিজ্য নীতিমালাটি হলে সেই সমস্যা থাকবে না। অনলাইনে প্রদর্শিত বাংলাদেশের একটি বা দশটি যেকোনো সংখ্যক পণ্য বিদেশের যেকোনো ভোক্তা কেনার সুযোগ পাবেন।