Image description

পাহাড়ধসে বান্দরবান ও কক্সবাজারে নারী-শিশুসহ সাতজন মারা গেছে। এর মধ্যে বান্দরবানের লামায় ঘুমন্ত শিশুসহ দুই পরিবারের পাঁচজন এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় দুই ভাই-বোনের মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার এসব ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে গত চারদিনে পাহাড়ধসে ২৯ জনের মৃত্যু হলো।

স্থানীয়রা জানান, অব্যাহত ভারী বর্ষণের ফলে লামার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় বৃহস্পতিবার ভোর ৪টার দিকে আচমকা পাহাড় ধসে মো. ইউনুছ ও জুয়েলের বসতঘরের ওপর পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা স্থানীয়দের সহায়তায় আক্রান্তদের উদ্ধার করেন। ততক্ষণে দুই পরিবারের ঘুমন্ত পাঁচজন মারা যান। নিহতরা হলেন-মো. ইউনুছ (২৮), তার স্ত্রী রানু আক্তার (২২) ও চার বছরের ছেলে মো. সোলেমান, মো. জুয়েল ( ২৭) ও তার স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৩)।

এর আগে রাত দেড়টার দিকে উত্তরপাড়ায় আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রেহানা বেগমের ঘরে পাহাড় ধসে পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।

ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক জানান, তার ইউনিয়নে ৫০টির মতো ঘরবাড়ি পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লামা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম জানান, পাহাড়ধসে ৫০টি এবং ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে ১০০ ঘরবাড়ি। পানিবন্দি হয়েছে এক হাজার পরিবার।

অন্যদিকে উজানের পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলা শহরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের এক হাজার ঘরবাড়ি প্লাবিত এবং পাহাড় ধসে পড়ে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধস্ত হয়েছে। এছাড়া লামা-আলীকদম সড়কের কেয়ারারঝিরি, রেপারপাড়া আবাসিক ও লাইনঝিরি এলাকা ঢলের পানিতে ডুবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া সড়কের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে, সড়কধসে ও ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়ে লামা-আলীকদম সড়ক যোগযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

এদিকে প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধসে প্রাণহানির আশঙ্কায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয় নিতে বিভিন্ন মাধ্যমে মাইকিং শুরু করে উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলো। এর পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা আশিকার উদ্যোগেও দুর্যোগ আগাম বার্তা ও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দুর্যোগকবলিতদের জন্য ৫৫টি বিদ্যালয় অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেয় প্রশাসন। টানা ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে ভয়াবহ বন্যাসহ পাহাড়ধসে আরো মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

পাহাড়ধসে পাঁচজন নিহত হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে লামা থানার ওসি কাইছার হামিদ বলেন, পাহাড়ধসে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ বিষয়ে লামা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মঈন উদ্দিন বলেন, টানা বর্ষণের শুরুতেই পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের যথাসময়ে নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়। এরপরও পাহাড়ধসে আজিজনগরের মিশনপাড়ায় শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে এক হাজারের মতো দোকানপাট-ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে।

তিনি বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রসহ বন্যাকবলিতদের মধ্যে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল না থাকায় এবং রাস্তাঘাট ভেঙে তছনছ হওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপনণ করা সম্ভব হয়নি।

চকরিয়ায় দুই শিশুর মৃত্যু

কক্সবাজারের চকরিয়ায় বসতবাড়ির ওপর পাহাড়ধসে ঘুমন্ত দুই শিশু মারা গেছে। এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা জেগে উঠে স্থানীয়দের সহায়তায় মাটি সরিয়ে দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করে। বৃহস্পতিবার ভোরে বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়া কাটা পাহাড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত দুই শিশুর মধ্যে রুমি আক্তার (১৫) মোহছেনিয়া কাটা গ্রামের মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে। সে বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অপর শিশু মোহাম্মদ তৌসিফ (১০) আবদুল মজিদের ছেলে এবং স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা সম্পর্কে আপন চাচাতো ভাইবোন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন, ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে লোকজনের মধ্যে। গত দুদিনে পানিতে তলিয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম।

চারদিনে ২৯ জনের মৃত্যু

ভারী বৃষ্টিতে গত চারদিনে পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানে ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জন রোহিঙ্গা এবং বাকিরা স্থানীয় নাগরিক।

টানা বৃষ্টিপাতের ঘটনায় কক্সবাজারে আটটি পাহাড়ধসের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চারটি পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া কক্সবাজার সদরের সাত্তারঘোনা, দরিয়ানগর বড়ছড়া, চকরিয়া এবং পেকুয়ায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় অনেকেই হতাহত হন।

গত বুধবার উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এ পাহাড়ধসে পাঁচ শিশু মারা গেছে। এ ঘটনায় ১৩ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে সোমবার রাতে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজন নিহত হন।

এদিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাত্তারঘোনা এলাকায় সোমবার গভীর রাতে পাহাড়ধসে আলী আকবর (৫০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে পেকুয়ার টইটং ইউনিয়নের আলম্ম্যার ঝিরি এলাকায় সোমবার বিকেলে পাহাড়ধসে মোহাম্মদ মিনহাজ (৮) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন শিশুটির নানী জান্নাতুল ফেরদৌস।

অন্যদিকে মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সদরের দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় নাছিমা আক্তার নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তার স্বামী জসিম উদ্দিন ও পরিবারের আরেক সদস্য গুরুতর আহত হন।

আর বৃহস্পতিবার চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়া কাটা পাহাড়ি গ্রামে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলায় পাঁচজন করে মারা গেছে।