Image description

আফগানিস্তানে পপি চাষ কমে যাওয়ার পর বৈশ্বিক হেরোইন উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত উত্থান ঘটেছে মিয়ানমারের। আর এ নতুন মাদক-সমীকরণের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ শিকার হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে মিয়ানমারের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলো পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হেরোইন উৎপাদনকেন্দ্রে। উৎপাদিত হেরোইন ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে পাচারে বাংলাদেশের অরক্ষিত সীমান্ত, নাফ নদ ও চট্টগ্রাম রুটকে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক মাদকচক্র। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) ২০২৬ সালের ২৬ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদনে মিয়ানমারে পপি চাষ ও আফিম-হেরোইন উৎপাদনের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে দেশটিতে পপি চাষের জমি ১৭ শতাংশ বেড়ে ৫৩ হাজার ১০০ হেক্টরে পৌঁছেছে। একই সময়ে আফিম উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১০ মেট্রিক টন, যা ২০২১ সালে ছিল ৪২০ মেট্রিক টন। এর মাধ্যমে মিয়ানমার বিশ্বের শীর্ষ আফিম ও হেরোইন উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে।

মাদকবিষয়ক গবেষক এবং ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল থেকে বাংলাদেশ : বাংলাদেশে মেথামফিটামিন মাদকের উৎস, প্রকৃতি ও পাচার রুটের আঞ্চলিক বিশ্লেষণ’ গ্রন্থের লেখক হুমায়ন কবির খন্দকার বলেন, ‘মিয়ানমারের শান, চিন ও কাচিন অঞ্চল এখন আফিম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। উৎপাদন থেকে পাচার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় ১৫ থেকে ২০টি সশস্ত্র বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত। প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের মাদক বাণিজ্য হয়। সেই অর্থ দিয়ে তারা অস্ত্র কেনা ও সংগঠন পরিচালনা করে। হেরোইন পাচারের অন্যতম ট্রানজিট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হওয়া আমাদের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, আফগানিস্তানে তালেবান সরকার পপি চাষ নিষিদ্ধ করার পর আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের বড় অংশ মিয়ানমারে বিনিয়োগ শুরু করে। এরপর শান, চিন, কাচিন ও সাগাইং অঞ্চলে দ্রুত বাড়তে থাকে পপি চাষ। এর মধ্যে শান প্রদেশেই সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিয়ানমারে উৎপাদিত হেরোইনের একটি অংশ মংডু ও সিত্তুই উপকূল থেকে ছোট নৌকা বা মাছ ধরার ট্রলারে করে রাতের অন্ধকারে নাফ নদ পেরিয়ে টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনসংলগ্ন এলাকায় প্রবেশ করে। মাছের স্তূপ, বরফের বাক্স কিংবা ট্রলারের গোপন চেম্বারে মাদক লুকিয়ে আনা হয়। এ ছাড়া বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম ও রুমা এবং কক্সবাজারের উখিয়া, পালংখালী ও ঘুমধুমের দুর্গম সীমান্তপথ ব্যবহার করেও মাদকের চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করে। স্থানীয় বাহক বা ‘ক্যারিয়ার’দের মাধ্যমে এসব চালান সীমান্ত অতিক্রম করে প্রথমে সীমান্তবর্তী এলাকায় মজুত করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে চট্টগ্রাম হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়।

চলতি বছরের ৭ এপ্রিল কর্ণফুলী এলাকা থেকে ৮ কেজি হেরোইনের একটি বড় চালান জব্দ করে সিএমপির গোয়েন্দা (পশ্চিম) বিভাগ। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জব্দ হওয়া হেরোইনের চালানটি মিয়ানমার থেকে এসেছিল। এটি ঢাকা হয়ে তৃতীয় একটি দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। তবে পথে সেটি জব্দ করা সম্ভব হয়।