আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বিশ্ব অর্থনীতিতে সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছিল। সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করায় বিশ্ববাজারে কমতে শুরু করেছিল জ্বালানি তেলসহ খাদ্যপণ্যের দাম। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা এবং এর পরপরই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। এ সংঘাতের প্রত্যক্ষ ধাক্কা এসে লেগেছে ৪ হাজার কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে; যার রেশ পড়েছে ঢাকার নীতিনির্ধারক মহলেও।
গত দুই দিনের যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে ঊর্ধ্বমুখী ধারা সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা ও বাজেট প্রাক্কলনকে বড় ধরনের শঙ্কার মুখে ফেলেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে সরকার বাজেট প্রণয়নের সময় মে মাসের সাময়িক স্বস্তিকে ভিত্তি ধরে ভর্তুকি ও মূল্যস্ফীতির যে হিসাব কষেছিল, গত ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবাস্তবতা তা পুরোপুরি ওলটপালট করে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতা শুরুর পর দুই দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা যাচ্ছে। এটি চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে। যদিও তাঁরা এখনই আতঙ্কের কিছু দেখছেন না। তবে মূল্যবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে নতুন বাজেটের হিসাবনিকাশ পাল্টে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সরকার সতর্কতার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যেহেতু এর সঙ্গে জ্বালানির দামের বিষয়টি জড়িত, সে কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার রেশ ঢাকায় ছড়িয়ে যায়। ওই কর্মকর্তা বলেন, সংঘাত থেমে গেলে আতঙ্কের কিছু নেই। যদি এটি দীর্ঘ মেয়াদে হয়, তবে সমস্যা হবে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় এবং সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে এরই মধ্যে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটে কিছু ব্যয় স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। থোক বরাদ্দ থেকে ব্যয় বন্ধসহ উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ, যানবাহন কেনা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে যুদ্ধের অনিশ্চয়তায় ভেস্তে যেতে পারে এসব উদ্যোগের সুফল।
ফের যুদ্ধ ফের অনিশ্চয়তা : ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলার পর পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে ইরানও। এর ফলে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইন, কুয়েতসহ অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ শঙ্কার মধ্যে ইরান নতুন করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। আর এটিই ঢাকার টেনশন বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৮ সেন্ট থেকে ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৮ দশমিক ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল বিক্রি হচ্ছে ৭৪ দশমিক ২৬ ডলারে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম আবারও ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেটি হলে সামষ্টিক অর্থনীতি নতুন করে চাপে পড়বে। বেড়ে যাবে মূল্যস্ফীতি।
পাল্টে যেতে পারে বাজেটের হিসাব : অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ রেকর্ড ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৪০ হাজার কোটি এবং কৃষি খাতের জন্য প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। সরকারের সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার বাজেটে ভর্তুকির এ প্রাক্কলন করেছিল আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৭২ থেকে ৭৫ ডলারের মধ্যে স্থিতিশীল থাকবে ধরে নিয়ে। কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর (৭৮.৮০ ডলার) এরই মধ্যে সেই প্রাক্কলন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এটি আরও বাড়লে বাজেটের হিসাব পাল্টে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের জ্বালানি বাবদ বার্ষিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পায়। ব্রেন্ট ক্রুড ৭৫ ডলারের প্রাক্কলন পেরিয়ে ৮০ ডলারের দিকে ধাবিত হলে এবং স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রকৃত ভর্তুকির চাহিদা ৪০ হাজার কোটি থেকে এক ধাক্কায় ৫২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে শুধু জ্বালানি খাতেই অতিরিক্ত ঘাটতি বাড়বে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
তৈরি পোশাক খাত ও রেমিট্যান্সে দ্বিমুখী সংকট : দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দুটি প্রধান স্তম্ভ তৈরি পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এ দুই খাত আবারও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে জাহাজগুলো দীর্ঘ পথ (আফ্রিকার গুড হোপ অন্তরীপ) ঘুরে যাতায়াত করতে বাধ্য হবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য পৌঁছানোর সময় আগের তুলনায় ১২ থেকে ১৫ দিন বেড়ে যাবে। বাড়তি দূরত্বের কারণে কনটেইনার ফ্রেইট কস্ট বা জাহাজভাড়া এক ধাক্কায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রথম পর্যায়ের ইরান যুদ্ধের অভিঘাতে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎসংকটের কারণে এমনিতেই উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। আবারও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা রপ্তানি খাতে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে।