Image description

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গানীতি পুনর্বিন্যাসের তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। সংস্থাটি বলছে, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে রেখে ঢাকার উচিত বর্তমান বাস্তবতার আলোকে একটি অন্তর্বর্তী কৌশল গ্রহণ করা। যেখানে শরণার্থী শিবিরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গাদের স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রক শক্তি আরাকান আর্মির সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর জোর দিতে হবে।

গতকাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষ প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। ক্রাইসিস গ্রুপ জানিয়েছে, মিয়ানমারে যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় তাড়াহুড়ো করে কোনো প্রত্যাবাসন উদ্যোগ নেওয়া টেকসই হবে না। তবে নীতিগতভাবে নিষ্ক্রিয় থাকারও সুযোগ নেই। সামনের দিনগুলোতে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ভবিষ্যৎ স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখতে বাংলাদেশকে তার রোহিঙ্গানীতিতে এই বাস্তবসম্মত সংস্কারগুলো আনতেই হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। ঢাকা বরাবরই প্রত্যাবাসনকে একমাত্র স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখলেও মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে পূর্ববর্তী সরকারের শুধু মিয়ানমার জান্তাকেন্দ্রিক দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি এখন আর কার্যকর নয়। এদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের সামনে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সুসংহত, অর্থনীতি সচল করাসহ নানান অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাসংকট শীর্ষ অগ্রাধিকারের তালিকায় না থাকলেও একে অবহেলা করা হবে একটি গুরুতর ভুল। কারণ তহবিলসংকট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে এ সংকট এখন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

আইসিজি জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন মানবিক সংকট তৈরি হওয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বাধ্য হয়ে শরণার্থীদের মাসিক রেশন কমিয়ে মাথাপিছু মাত্র ৭ ডলারে নামিয়ে এনেছে। তহবিলসংকটের মধ্যে প্রতি বছর শিবিরে প্রায় ৩০ হাজার নতুন শিশুর জন্ম নিচ্ছে এবং মিয়ানমারে নতুন করে সংঘাতের কারণে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এমন পরিস্থিতিতে বৈধ কাজের সুযোগ না থাকায় শরণার্থীরা অনানুষ্ঠানিকভাবে কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, যা স্থানীয় বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। পাশাপাশি মাদক চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শরণার্থী শিবিরে আরসা ও আরএসওর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্যের লড়াই নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। সংকট মোকাবিলায় ক্রাইসিস গ্রুপ একটি দ্বিমুখী (অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক) বাস্তবভিত্তিক রোডম্যাপ প্রস্তাব করেছে। 

সংস্থাটি বলছে, রোহিঙ্গাদের শরণার্থী শিবিরে এবং বাইরে নির্দিষ্ট কিছু খাতে নিয়ন্ত্রিত ও নিয়মতান্ত্রিক কাজের সুযোগ দেওয়া উচিত। এটি একদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর পরনির্ভরশীলতা কমাবে, অন্যদিকে স্থানীয়দের সঙ্গে মজুরি নিয়ে তৈরি হওয়া অসম প্রতিযোগিতা বন্ধ করবে। এ ছাড়া পণ্য সহায়তার পরিবর্তে সরাসরি নগদ অর্থ স্থানান্তর করলে পরিচালন ব্যয় কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি সচল হবে। বাঁশ-তেরপলের অস্থায়ী আশ্রয়ের বদলে টেকসই বা বহুতল বাসস্থান নির্মাণ করা দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী। পাশাপাশি কক্সবাজারের তুলনায় পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরটি বন্ধের পরিকল্পনা করা উচিত। এ ইস্যুতে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা এড়াতে ক্ষমতাসীন দলের উচিত প্রধান বিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা।