Image description

মানুষ গিজগিজ করছে। বিশাল লাইন।

বাইরে থেকে একজন এসে কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, ‘সারা দিন দাঁড়ায়ে থাকলেও কাজ হবে না। আমারে কিছু দেন। দুই ঘণ্টার ভেতরে কাজ সেরে বাসায় চলে যেতে পারবেন।’

নিশ্চয়ই বুঝতে কারো অসুবিধা হচ্ছে না যে এটা সেই চিরপরিচিত দালালচক্র।

হতে পারে এ দেশের যেকোনো সরকারি ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিসের মতো জরুরি সেবা কার্যালয়ের সামনের নিত্যদিনের একটা দৃশ্য। এমন দৃশ্যে এখন আর বিস্ময় জাগে না কারো। কিন্তু শুনে চমকে উঠবেন, যখন জানবেন এই দৃশ্যটা বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আরো ভয়াল হয়ে উঠেছে সৌদি আরবে। সেখানকার রিয়াদ দূতাবাস আর জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেল অফিসের সামনে যেকোনো  কর্মদিবসে গেলেই এই দৃশ্য এখন চোখে পড়বেই।
 
দালাল আর কর্মকর্তাদের মাঝে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য চক্র। আর সেই চক্রে পড়ে নাস্তানাবুদ অবস্থা দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী টিম সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দার কনস্যুলেট জেনারেল অফিসের সামনে কী ঘটে, তা পর্যবেক্ষণের জন্য দুজন প্রবাসী সূত্রকে দুই দিন সেখানে অবস্থান করিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। রিয়াদ দূতাবাসের সামনে পর্যবেক্ষণ করা শরিফ মল্লিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওখানে যাওয়ার পরেই দেখি, কয়েক শ মানুষ পাসপোর্ট নবায়ন করতে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। আমি নিজেও লাইনে গিয়ে দাঁড়াই আর কিছুক্ষণ পরে একজন এসে আমাকে ফিসফিস করে ওই পরামর্শ দেন।

ওই দালাল তাঁর কাছে ৩৫০ রিয়াল চেয়ে বলেন, দুই ঘণ্টার মধ্যে ফিঙ্গার (বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলা) দিয়ে বাসায় চলে যেতে পারবেন।’

শরিফ আরো বলেন, ‘এমন বেশ কয়েকজনকে আমি টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট করে দেওয়ার অফার দিতে দেখি। তাঁরা হুটহাট করে দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কক্ষে ঢুকছে-বেরোচ্ছে। অনেক সময় ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমেও তাঁদের কথাবার্তা বলতে দেখি।’

প্রবাসী শরিফ মল্লিক খোঁজ নিয়ে জানান, এই দালালদের বেশির ভাগই ফ্রি ভিসায় সৌদি এসেছেন। তাঁরা এখানে পার্মান্যান্ট কোনো কাজও করেন না; দালালিই তাঁদের কাজ। তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ দোকানের কর্মচারী, বিকাশের দোকান, হোটেলেও কাজ করেন।

জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল অফিসের সামনে একদিন অবস্থান করেন গাড়িচালকের কাজ করা শাহ আলম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, এখানকার দালালরা বেশ চতুর। তাঁরা আগে থেকেই অনলাইনে তাঁদের ক্লায়েন্ট ঠিক করে অনলাইনেই আবেদন পাঠিয়ে দেন। একদিকে দেখা যায়, শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, অন্যদিকে মাঝে মাঝে কিছু গ্রাহক এসেই সরাসরি অফিস রুমে গিয়ে বায়োমেট্রিক দিয়ে বেরিয়ে যান।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যাঁরা সৌদিতে পাসপোর্টের দালালির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বেশির ভাগই অনলাইনে প্রবাসীদের ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এক দিনের মধ্যে বায়োমেট্রিক, আগে কাজ পরে টাকা, পাসপোর্ট সংক্রান্ত সকল সমস্যার সমাধান ইত্যাদি স্ট্যাটাস/মেসেজ/কমেন্ট করে সেবাপ্রত্যাশীদের প্রলোভন দেখান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে প্রবাস আয়ে (রেমিট্যান্স) এগিয়ে আছে সৌদি আরব। এ বছর মে মাসে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৪৬.৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এপ্রিলে এসেছে প্রায় ৫২৬ মিলিয়ন। গেল অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ১১ মাসে (জুলাই ২৫ থেকে মে ২৬) সৌদি আরব থেকে দেশে রেমিট্যান্স আসে ৫.২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেখানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪.৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ৩৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭.৩০ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩০.৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

অথচ এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা আজ পাসপোর্ট নিয়ে পড়েছেন মহাযন্ত্রণায়। দেশের পাসপোর্ট অফিসগুলোয় দালালের সংখ্যা আগের চেয়ে কমলেও সৌদির রিয়াদ ও জেদ্দায় পাসপোর্ট অফিসের সামনে দালালের উৎপাত ভয়ংকরভাবে বেড়েছে। দালালের সংখ্যা আরো বেশি বেড়েছে অনলাইনে। এসব দালালের সঙ্গে দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আর এ কারণেই যাঁরা বৈধ প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট নবায়নের কাজে যান, তাঁদের হয়রানির শেষ থাকে না। শুধু আবেদন ও ফিঙ্গারের জন্যই লেগে যায় চার থেকে পাঁচ মাস। আর নবায়ন হতে হতে পেরিয়ে যায় আট থেকে ১০ মাস। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক ধরনের ক্ষতি হয়ে যায় রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের। 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর কালের কণ্ঠকে বলেন, এটি প্রবাসী কর্মী তথা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রতি এক ধরনের জুলুম, জবরদস্তি এবং তাঁদের কষ্টের উপার্জনকে অবমূল্যায়ন করার শামিল। তিনি বলেন, এই সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অতিষ্ঠ প্রবাসীরা : সৌদি আরবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন ড. আব্দুল আজীজ। পরিবার নিয়ে থাকেন সে দেশে। সবকিছু স্বাভাবিক চললেও বিপত্তি বাধে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে। রিয়াদ দূতাবাসসহ সেবা কেন্দ্রে দুই মাস ধরনা দিয়েও কাজ হয়নি। অগত্যা তাঁকে শুধু পাসপোর্ট নবায়নের উদ্দেশ্যেই সপরিবারে দেশে ফিরতে হয়। মাত্র ১০ দিনের মাথায় তাঁরা নতুন পাসপোর্ট হাতে পান।

ড. আজীজের বিস্ময়মাখা প্রশ্ন, দেশে মাত্র ১০ দিনে যেটা সম্ভব, তা সৌদিতে কেন আট থেকে ১০ মাস লাগে? তিনি বলেন, সৌদিতে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই নিয়মিত এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। দূর-দূরান্ত থেকে এসে অনেকে আবেদনই করতে পারছেন না।

এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে আরো কয়েকজন সৌদিপ্রবাসীর সঙ্গে আলাপে। তাঁরা প্রত্যেকেই অভিন্ন অভিযোগে জানিয়েছেন, প্রথমে আবেদন জমা দিতে অনলাইনে সিরিয়াল নিতে হয়। সিরিয়াল পাওয়া যায় এক মাস পর। এরপর নির্ধারিত দিনে গিয়ে আবেদন জমা দিলে বায়োমেট্রিকের জন্য সিরিয়াল দেয় অন্তত চার মাস পর। এতেই চলে যায় পাঁচ মাসের বেশি। এরপর পাসপোর্ট মুদ্রণ ও দেশ থেকে আসতে আরো দুই থেকে তিন মাস। সব মিলিয়ে আট মাসের বেশি সময় লাগে।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে আমরা অন্তত ২৫ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে আলাপ করেছি। প্রত্যেকেই বলেছেন, বর্তমানে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে বায়োমেট্রিক দেওয়ার তারিখ পেতে চার মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় নির্ধারিত তারিখে গিয়েও লম্বা লাইনের পেছনে থাকায় সেদিন আর কাজ হয় না। সেটিও নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এসব ভোগান্তি এড়াতে অনেকে দালালের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন।

রিয়াদে বসবাসরত প্রবাসী মাসুদ রানা বলেন, আমি এমআরপি পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেছি মে মাসে। কিন্তু সাক্ষাৎকারের জন্য সিরিয়াল পেয়েছি সেপ্টেম্বরে। অথচ আমার পাসপোর্টের মেয়াদ আছে জুলাই পর্যন্ত। জরুরি বিবেচনায় রিয়াদ দূতাবাসে যাই। কিন্তু সেখানকার কর্মকর্তারা কথা বলতেই নারাজ।

মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, ভেতরে কর্মকর্তারা চুপ থাকার ভান করলেও দূতাবাস অফিসের বাইরে চলে জাদুকরী কারবার। সেখানে আলাদিনের চেরাগ হাতে এমন একটি চক্র ঘুরঘুর করে, যারা মাত্র এক দিনেই বায়োমেট্রিক, ছবি তোলা সম্পন্ন করে দিতে পারে। এর জন্য প্রতিজনকে গুনতে হয় ৩০০ থেকে ৫০০ রিয়াল পর্যন্ত। একজন আমার কাছে ৪০০ রিয়াল (প্রায় ১৩ হাজার টাকা) দাবি করে আশ্বাস দিয়েছেন, মাত্র দুই দিনের মধ্যে সবকিছু করে দেবেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, অফিসের লোকজন লম্বা সিরিয়াল লাগায়, আর বাইরে চলে রকেট সার্ভিস।

মাসুদ রানা অর্থের সংকটে এই রকেট সার্ভিস নিতে ব্যর্থ হলেও সফল হয়েছেন জেদ্দার এক প্রবাসী। জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেল অফিস থেকে এক দালালের মাধ্যমে ৩০০ রিয়াল (প্রায় ১০ হাজার টাকা) ঘুষ দিয়ে এক দিনের মধ্যেই পাসপোর্টের বায়োমেট্রিক, ছবি তোলাসহ আবেদন শেষ করেন তিনি।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এই প্রবাসী কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রথমে স্বাভাবিক নিয়মে আবেদন করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কনস্যুলেট অফিস থেকে জানানো হয়, প্রায় এক মাস পরে আবেদন এবং এর পরে অন্তত চার মাস লাগবে বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার সিরিয়াল পেতে। কিন্তু আমার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন আকামা নিতে জটিলতায় পড়তে হবে বিধায় বাধ্য হয়ে দালাল ধরে আবেদন করেছি। এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।

এই প্রবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জেদ্দার কনস্যুলেট অফিসে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ মানুষ পাসপোর্ট নবায়ন করতে যান। কিন্তু এর মধ্য থেকে ১৫০ থেকে ২০০ জন বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলা সম্পন্ন করতে পারেন। বাকিদের আবার অপেক্ষা করতে হয়। আর অফিসের সামনে খোলা আকাশের নিচে প্রচণ্ড গরমে প্রবাসীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু দালাল ধরলে কোনো কষ্ট নেই, অপেক্ষাও নেই।

দাম্মামের প্রবাসী শ্রমিক মুয়াজ খান কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি এক মাসের বেশি অপেক্ষা করে মে মাসের শুরুতে আবেদন করেন। বায়োমেট্রিকের সিরিয়াল পেয়েছেন আগামী সেপ্টেম্বরে। বায়োমেট্রিক হলে পাসপোর্ট মুদ্রণ, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে পাঠানো এবং বিতরণসব মিলিয়ে আরো কয়েক মাস লাগতে পারে।

স্বল্প আয়ের প্রবাসীরা বেশি কষ্টে : সৌদি আরবে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার জন্য আকামা (রেসিডেন্স পারমিট) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর আকামা নিতে হয় বৈধ পাসপোর্টের মাধ্যমে। যদি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তবে আকামা নবায়ন সম্ভব হয় না। ফলে পাসপোর্ট নবায়নে বিলম্ব সরাসরি আকামা নবায়নের ওপর প্রভাব ফেলছে।

জানা গেছে, এই প্রভাবটা বেশি পড়ছে স্বল্প আয়ের প্রবাসীদের ওপর। তাঁরা বলছেন, অনেক নিয়োগকর্তা মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টধারী কর্মীদের নিয়ে ঝুঁকি নিতে চান না। এতে চাকরি হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম কিংবা তাবুকের মতো শহর থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে কর্মরত শ্রমিকদের অনেককে আবেদন করতে একাধিকবার দূতাবাস বা নির্ধারিত কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। প্রতিবার যাতায়াতে তাঁদের কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার অনুমতি নিতে হচ্ছে। আবার কেউ কেউ কয়েক শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে গিয়ে জানতে পারছেন, নতুন কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট খালি নেই।

দাম্মামের নির্মাণ শ্রমিক বেলাল মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, এক দিন ছুটি নিলে পুরো দিনের মজুরি কাটা যায়। দুই-তিনবার গিয়েও যদি কাজ না হয়, তাহলে আমাদের জন্য সেটা বড় ক্ষতি। আমরা প্রবাসীরা এত পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পাঠাই। কিন্তু আমাদের সঙ্গে দূতাবাস ও সরকারের এমন অবহেলা কেন? দূতাবাসের কর্মকর্তারা তো আমাদের মানুষই মনে করেন না, কুকুর-বিড়ালের মতো আচরণ করেন।

সেবা কমে এখন সিকি ভাগ 

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য এমআরপি ছিল সবচেয়ে সহজলভ্য পাসপোর্ট সেবা। দূতাবাস সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার এমআরপি আবেদন গ্রহণ করা হতো। কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে এমআরপি কার্যক্রম বন্ধ করে ধীরে ধীরে ই-পাসপোর্টে স্থানান্তর করা হয়। এই পরিবর্তনের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি বা বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি।

২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর থেকে বিদেশি মিশনে নতুন করে আর কোনো এমআরপি আবেদন নেওয়া হবে না বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিদেশি মিশনে এমআরপি পাসপোর্টসংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়। তবে মেয়াদ উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকদের হাতে থাকা এমআরপি বৈধ। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তাঁদের এমআরপির স্থলে ই-পাসপোর্ট নিতে হবে।

সৌদি দূতাবাস সূত্র কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছে, আগে যেখানে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার ই-পাসপোর্টের আবেদন নেওয়া হতো, এখন তা কমে এক-চতুর্থাংশে নেমেছে। মাসে মাত্র ছয় হাজার আবেদন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার আবেদনকারী সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্টে রূপান্তরের জন্য অন্য সময়ের তুলনায় মিশনগুলোতে ভিড়ও বেড়েছে।

দালালচক্রের সন্ধানে  : কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে সৌদিতে দালালচক্রের কিছু তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। সৌদি প্রবাসীদের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপের পোস্ট, কমেন্ট পর্যবেক্ষণ করে বেশ কয়েকজন দালালের সঙ্গে সেবাপ্রার্থী হিসেবে যোগাযোগ করে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী সেল। বিভিন্ন নামে হেল্প সেন্টার কিংবা অনলাইন সেবার নামে তৈরি করা ফেসবুক গ্রুপ, পেজ ও ব্যক্তিরা দালালচক্রে সক্রিয়। তারা সরাসরি জানায়, টাকা দিলে গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার দিন ও সময় দুই-তিন দিনের মধ্যেই দিতে পারবে। এমনকি তারা প্রমাণ হিসেবে বিগত কাজের ডকুমেন্টসও দেখায়।

গত ২৬ জুন রাতে এই প্রতিবেদক তাঁর পাসপোর্ট নবায়ন করতে গ্রাহক সেজে মেহেদী নামের এক দালালের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করেন। দ্রুত পাসপোর্ট নবায়নের কথা জানালে তিন দিনের মধ্যে বায়োমেট্রিক সিরিয়াল পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

মেহেদী হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস বার্তায় জানান, আপনি যদি জরুরি করতে চান তাহলে আমাদের ২৫০ রিয়াল দিতে হবে। কাজের আগে ১০০ রিয়াল জমা দিতে হবে এবং বাকি টাকা কাজ শেষ হলে বায়োমেট্রিকের তারিখ পড়ার পরে অনলাইনে চেক করে এরপর দেবেন। আর যেদিন বায়োমেট্রিক দিতে যাবেন সেদিনও ভিড় এড়িয়ে কাজ শেষ করে আসতে পারবেন। আমরা আপনাকে সব প্রসেস বলে দেব, আপনাকে কোনো ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। ওখানে আমাদের লোকজন থাকবে।

আরেকটি ভয়েস মেসেজে তিনি বলেন, যদি নরমালভাবে দেন তাহলে তারিখ পেতে পেতে ডিসেম্বর হবে। কারণ নভেম্বরের শিডিউল ফুল হয়ে গেছে। আর আমাদের মাধ্যমে এই সেবা নিলে আপনি তিন দিনের মধ্যই বায়োমেট্রিক দিতে পারবেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি এই প্রতিবেদককে মেহেদী ডিজিটাল অনলাইন সেবা সেন্টার নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করেন। এই গ্রুপে গুনে গুনে ৮০ জন সেবাগ্রহীতাকে পাওয়া গেল।

সৌদি ভিসা সাপোর্ট নামের আরেকটি ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, এ ধরনের সার্ভিসের জন্য তাদের ফি ৩০০ রিয়াল।

কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী টিম অনলাইনে, অফলাইনে এসব দালালের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে রয়েছে রিয়াদে মোবাইল ব্যাংকিং-এর দোকানে কাজ করা মো. মেহেদী হাসান শুভ, রেস্ট্রুরেন্টে কাজ করা শাওন আহমেদ, জেদ্দার হসিবুর রহমান, হানিফ আহমেদ শ্রাবণ, তাকরিম ডিজিটাল অনলাইন সার্ভিস সেন্টারের সাব্বির রহমান সরকার প্রমুখ।

বিশেষ টিম পাঠানো উচিত : অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে। এক. এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্টে রূপান্তরের আগে সম্ভাব্য আবেদনকারীর সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। দুই. প্রয়োজনীয় জনবল ও বায়োমেট্রিক কিট সরবরাহ করা হয়নি। তিন. আবেদন গ্রহণ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং পাসপোর্ট সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘাটতি রয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার যখন এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন প্রবাসীদের জন্য কোনো কার্যকর পরিকল্পনা রাখা হয়নি। এই সংকট নিরসনে দ্রুত লোকবল বৃদ্ধি করা অথবা বিশেষ টিম পাঠিয়ে কার্যক্রম গতিশীল করা উচিত ছিল।

আসিফ মুনীর বলেন, দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ দেশে-বিদেশে সব জায়গাতেই পাসপোর্টের ক্ষেত্রে রয়েছে। দালালরা যদি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কাজ সহজে করাতে পারেন, তবে কর্মকর্তারা কেন নিজেরা পারেন না বা এই দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না?

চেষ্টা চলছে, দাবি স্বরাষ্ট্রর : গত ২১ জুন রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে কল্যাণ সেবা সাময়িক স্থগিতের ঘোষণা দেয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্টের প্রয়োজনীয় মোবাইল ইউনিট ও কিটের সংকট এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

দূতাবাসের কর্মকর্তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন, ই-পাসপোর্ট সেবার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বায়োমেট্রিক কিট এবং প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি সার্ভারসংক্রান্ত সমস্যার কারণেও আবেদন প্রক্রিয়া ধীরগতি।

অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের অফিশিয়াল নম্বরে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। ই-মেইল ও ফেসবুকে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া মেলেনি। এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা এই বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এই সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত কিট সরবরাহ করে বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তারা দালালদের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য অফিসার ফয়সল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, দূতাবাসগুলোর ওপর চাপ কমাতে যেসব দেশে প্রবাসীর সংখ্যা বেশি, সেখানে টিম পাঠানো হয় বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক পাসপোর্টের এই সেবা দেওয়ার জন্য। সৌদিতে সাময়িকভাবে এই টিম ফিরিয়ে আনা হয়েছে হয়তো, তাই একটু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে দ্রুতই নতুন টিম পাঠানোর কথা।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অর্থ) এ টি এম আবু আসাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের (স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র) সঙ্গে সৌদি আরবের এই জটিলতা নিয়ে আমাদের মিটিং হয়েছে। পাসপোর্ট নবায়নে সেখানে যে সমস্যাগুলো হচ্ছে, সেগুলো সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এক সঙ্গে বেশি মানুষের আবেদনের কারণে এই জটিলতা তৈরি হচ্ছে। সৌদির রিয়াদ দূতাবাস ও জেদ্দার কনস্যুলেট জেনারেল অফিসে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত ডিভাইস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানে লোকবল সংকটের কারণে যন্ত্রগুলো সব ব্যবহার করতে পারছে না।’

তিনি আরো বলেন, সৌদি দূতাবাসে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের লোকবল নেই, দূতাবাসের ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আমরা শুধু পাসপোর্টের আবেদন পেলে পরে প্রিন্ট করে পাঠিয়ে দিই। আগে পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকেও লোকবল দূতাবাসগুলোতে নেওয়া হতো, কিন্তু এখন সেটা নেওয়া হচ্ছে না।

সৌদিতে পাসপোর্টের আবেদন করতে গিয়ে সার্ভারের জটিলতার বিষয়টি স্বীকার করে এই কর্মকর্তা বলেন, সার্ভারের ব্যবস্থাপনা আমাদের সঙ্গে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও করতে পারে। তবে সার্ভারে মাঝে মাঝে জটিলতা দেখা দেয়, এ কারণে সাময়িক সমস্যায় পড়তে হয়। আমরা এই জটিলতা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছি। জুন মাসে রিয়াদে আট হাজারের মতো এবং জেদ্দাতে ১০ হাজারের মতো প্রিন্ট পাসপোর্ট সরবরাহ করা হয়েছে। এখান থেকে সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই, মূল সমস্যা দূতাবাসের অফিসগুলোতে।