দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করা বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে। উন্নত দেশগুলোর বাজেট সংকোচন, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং জাতীয় অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের কারণে ২০২৪ সালেই বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোতে দাতা দেশগুলোর অর্থায়ন ১৫ শতাংশ কমেছে।
গতকাল বুধবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক ওয়েবিনারে প্রকাশিত ‘বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন ২০২৬ : দক্ষিণ এশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনের মূল অনুসন্ধান উপস্থাপন করেন সহলেখক লিওনার্দো আলতিয়েরি ও মারিয়ুস গেরিন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোতে দাতা দেশগুলোর মোট অবদান ছিল ১০৭.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ছিল সর্বোচ্চ। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯১.৩ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ প্রকৃত মূল্যে এক বছরেই অর্থায়ন কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি সাময়িক কোনো ওঠানামা নয়; বরং বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের দীর্ঘমেয়াদি সংকোচনের সূচনা।
লিওনার্দো আলতিয়েরি বলেন, ২০২৪ সাল বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি মোড় ঘোরানো বছর। একই সময় দাতা দেশগুলোর নমনীয় মূল তহবিল এবং নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক তহবিল উভয়ই কমেছে। এর পেছনে উন্নত অর্থনীতিগুলোর আর্থিক চাপ, রাষ্ট্রীয় ব্যয় পুনর্বিন্যাস এবং ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, এটি স্বল্পমেয়াদি সংকট নয়; বরং আগামী কয়েক বছর ধরে অর্থায়ন কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে উন্নয়ন সহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে ১১টি প্রধান দাতা দেশ।
ওইসিডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৭ সালের মধ্যে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন আরো ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে স্বল্পোন্নত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর। এসব দেশ ১৩ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নয়ন সহায়তা হারাতে পারে। একইভাবে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাঞ্চলের আফ্রিকার দেশগুলোতে সহায়তা ১৬ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বড় ধরনের অর্থসংকট তৈরি হতে পারে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে প্রতিবেদনে অনুদান ও স্বল্প সুদে ঋণভিত্তিক অর্থায়নের সংকোচনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়নের ৯০ শতাংশের বেশি এবং মানবিক সহায়তার ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই উৎস থেকে। অথচ আর্থিক চাপের সময় দাতা দেশগুলো প্রথমেই এই অর্থায়ন কমিয়ে দেয়।
প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন সহায়তা ১৯ থেকে ৩৩ শতাংশ, মানবিক সহায়তা ২১ থেকে ৩৬ শতাংশ এবং শিক্ষা খাতে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
অন্যদিকে অর্থায়ন কমলেও ২০২৪ সালে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অর্থ ছাড় ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বছরজুড়ে এসব সংস্থা প্রায় ২৯৬ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। সহলেখক মারিয়ুস গেরিন বলেন, এই রেকর্ড অর্থ ছাড় নতুন অর্থপ্রবাহের প্রতিফলন নয়; বরং আগের প্রতিশ্রুত তহবিল, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পূর্ববর্তী অর্থায়নকাঠামোর কারণে আপাতত এই প্রবাহ বজায় রয়েছে। তবে এর মধ্যে অনেক সংস্থা কর্মসূচি সীমিত করা এবং কার্যক্রমের ভৌগোলিক পরিধি কমিয়ে আনার মতো পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতের আর্থিক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো দাতাদের প্রতিটি ডলারকে তিন-চার ডলার পর্যন্ত উন্নয়ন বিনিয়োগে রূপান্তর করতে সক্ষম। ফলে অর্থায়ন কমে গেলে তার প্রভাব বহুগুণ বেড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর পড়বে। একই সময়ে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, জাতিসংঘ শিশু তহবিল, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থাসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রম এরই মধ্যে সংকুচিত হতে শুরু করেছে।
ওয়েবিনারের প্রধান অতিথি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের কাঠামো এখন মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর ঋণের চাপ, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উন্নয়ন সহায়তার বাজেট কমছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জায়গায় কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ উন্নয়ন অর্থায়নের অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠন—এই তিন ধাপের কৌশল অনুসরণ করছে। একই সঙ্গে দেশীয় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং পুঁজিবাজারের উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থায়নের ভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত ৩.৪৬ বিলিয়ন ডলারের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিবেদনটি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নে কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো দেশকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল বহুপক্ষীয় অর্থায়ন ব্যবস্থার পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
পাকিস্তানের টেকসই উন্নয়ন নীতি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আবিদ কাইয়ুম সুলেরি বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন কমে যাওয়া, দাতা দেশগুলোর অগ্রাধিকার পরিবর্তন এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উন্নয়ন অর্থায়নের সংকট আরো গভীর হচ্ছে। তাই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা এবং জরুরি, স্বল্প সুদে ও সাধারণ ঋণের পৃথক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শ্রীলঙ্কার দারিদ্র্য বিশ্লেষণ কেন্দ্রের প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক রূপান্তরবিষয়ক দলনেতা ড. রোশান অ্যান পেরেরা বলেন, ঋণখেলাপির পর বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলো শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে অনুদান ও স্বল্প সুদে ঋণের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই বাজারভিত্তিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ালে ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
নেপালের দক্ষিণ এশিয়া বাণিজ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. পরাস খারেল বলেন, বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে এখন উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান বাড়াতে হবে, জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।