Image description

অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাই কম থাকায় চলতি মৌসুমে সারাদেশে ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে এই উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষক খুবই হতাশ। বীজ, সার, সেচ ও পরিবহনসহ প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় অনেক রেড়েছে। সারের বাড়তি দাম, শ্রমিক মজুরি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে। অন্যদিকে, বাজারে পণ্যের দাম না থাকায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত দৌরাত্ম্যের কারণে কৃষক ফসল বিক্রি করে উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না। কৃষকরা মাঠপর্যায়ে পানির দরে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হলেও ভোক্তাদের চড়া দামে পণ্য কিনতে হয়। লাভবান হচ্ছে মূলত ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। যে পণ্য কৃষক বিক্রি করেন পাঁচ টাকা কেজি, সে পণ্য ভোক্তাদের কিনতে হয় ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে। অথচ কৃষককে ওই পণ্যটি উৎপাদন করতে কেজিপ্রতি ব্যয় করতে হয়েছে সাত থেকে আট টাকা। কেজিতে তার লোকসান দিতে হচ্ছে দুই থেকে তিন টাকা। এভাবে সব পণ্যে ক্রমাগত লোকসানের কারণে দেশের প্রান্তিক কৃষকরা চরম হতাশায় দিন পার করছেন। কৃষি বিশেষজ্ঞরা কৃষকের এই হতাশাকে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনের জন্য উদ্বেগের বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, কৃষক হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ভালো ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে দেশকে আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। তারা যদি হতাশ হয়ে চাষাবাদে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন, তাহলে দেশ আবার খাদ্য ঘাটতির মুখে পড়বে। তখন খাদ্য আমদানি করতে হবে। আর এমনটি হলে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে তাদের আশঙ্কা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেলে হতাশ হয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে দেয়ার বা মুখ ফিরিয়ে নেয়ার ঝুঁকি বাড়বে। এর ফলে পরবর্তীতে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে। দেশের অর্থনীতি ও কৃষি খাতকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে কৃষি ও কৃষক সুরক্ষায় সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃত কৃষকদের চিহ্নিত করে সরাসরি ভর্তুকি এবং প্রণোদনা প্রদান এবং কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো ও বাজার ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ রাখতে কৃষি মূল্য কমিশন গঠন করে নিয়মিত বাজার তদারকি করতে হবে। পর্যাপ্ত হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ না থাকায় পচনশীল ফসলগুলো দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন কৃষক। এই সমস্যা সমাধানে সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কেনার ব্যবস্থা করা জরুরি।

চলতি অর্থবছরে সারাদেশে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু মৌসুসে কৃষক তাদের এই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাননি। ধান কাটার সময় উৎপাদন খরচ ও সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাজারে অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হয়েছে। সরকার বোরো মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৬ টাকা (অর্থাৎ প্রায় এক হাজার ৪৪৪ টাকা মণ) নির্ধারণ করলেও কৃষকরা ৭০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ৫০ টাকা মণ বিক্রি করেছেন। হাওর অঞ্চলের কৃষকদের এবার লোকসানের পরিমাণ অনেক বেশি। অতিবৃষ্টির ফলে হাওরের ৩০ শতাংশের বেশি ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। আর বাকি ধানও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ ধরে বিক্রি করতে হয়েছে। অর্থাৎ অনেক লোকসানে তাদের ধান বিক্রি করতে হয়েছে।

অন্যদিকে উৎপাদন খরচ ও সংরক্ষণের অভাবে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা আলুর ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। চলতি মৌসুমে সার, বীজ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় উৎপাদন খরচ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে আলুর ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক। মৌসুমে অনেক অঞ্চলে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি মণ আলু ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। আলু উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রংপুরে চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই। ভরা মৌসুমে আলুর নজিরবিহীন মূল্যধস এবং বৈরী আবহাওয়ায় মজুদকৃত আলুতে পচন ধরায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা।

উপায় না পেয়ে অনেক কৃষক বস্তাভর্তি আলু রাস্তার ধারে ফেলে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। চাষিদের তথ্যমতে, এবার প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বাজারে পাইকারি পর্যায়ে আলু বিক্রি হয়েছে মাত্র সাত থেকে ৯ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ছয় থেকে আট টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিমাগার ভাড়া ও পরিবহন খরচের বাড়তি চাপ। অনেক কৃষক শুরুতে দাম না পেয়ে আলু ঘরে তুলে রাখলেও সংরক্ষণের অভাবে পচন ধরায় বস্তাভর্তি আলু রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। শুধু ধান বা আলু নয়, এরকম সব ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রেই কৃষককে লোকসান গুণতে হচ্ছে। যা চাষাবাদের প্রতি কৃষকদের অনুৎসাহিত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে উৎপাদন, প্রণোদনা, ভর্তুকি ও বাজার ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এনে কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষিত করা হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্বাস করে এবং দেশের সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করে, কৃষক অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে আধুনিক, পরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে উৎপাদন বৃদ্ধি, কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা এবং কৃষকের আয় নিশ্চিতের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

দেশের বিভিন্ন জেলায় পণ্যের দাম ও কৃষকদের হতাশার চিত্র নিয়ে আমাদের সংবাদদাতাদের পাঠানো রিপোর্ট নিচে তুলে ধরা হলো :
রাজশাহী থেকে রেজাউল করিম রাজু জানান, প্রকৃতির সাথে লড়াই করে কৃষিপ্রধান রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকরা ধান আলু, পেঁয়াজসহ নানা রকম শাকসবজি আবাদ করছেন। সার, বীজ শ্রমিকের মজুরিÑ সব কিছুর মূল্য বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু কোনো ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না উৎপাদকরা। আমন-আউশ ধান উঠেছে। আবহাওয়া মোটামুটি অনুকূল থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। আবাদকারীরা ন্যায্য দাম পাননি। ঘেষতে পারেননি সরকারি খাদ্য গুদামের কাছেও। পাননি ন্যায্য দাম। ফলে ফড়িয়াদের হাতে তুলে দিতে হয়েছে, লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাওয়ার মতো খেয়ে নিয়েছে।

সর্বশেষ ওঠা আউশের চার জেলায় (রাজশাহী, নওগাঁ, চাপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর) প্রায় ১৩ লাখ হেক্টর জমিতে। ফলন মোটামুটি তবে ন্যায্য দাম পাননি। মৌসুমে আলুর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৮ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে। আলু উৎপাদন হয়েছে ১৪ লাখ সাড়ে ১৩ মেট্রিক টন। গতবার আলু নিয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। তারপর চলতি মৌসুমে আলুর আবাদ করেন গতবারের লোকসান পুষিয়ে নেয়ার আশায়। আলু ওঠার সময় কাক্সিক্ষত দাম পাননি। এবারো লোকসান। তানোরের চাষি জুলফিকার বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূল থাকায় বিঘাপ্রতি ফলন পাওয়া যায় ৪০ বস্তা (৬০ কেজিতে এক বস্তা) শুরুতে দাম মিলেছে প্রতি বস্তা সাত-আট শ’ টাকা। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় আলু পাওয়া যাচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অথচ খরচ হয়েছে বিঘাপ্রতি কমপক্ষে ৬০ হাজার টাকা। এরপর যারা হিমাগারে আলু রাখেন তারাও পড়েছেন বিপাকে। বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে তারা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখনো শহরের বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ১০-১২ টাকা কেজিতে।

পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার ৯৪ হেক্টর। কিন্তু আবাদ হয়েছে বেশি জমিতে। আর উৎপাদন হয়েছে সাত লাখ ৩৫ হাজার ৮০০ মে.টন। ভারতের পেঁয়াজ নির্ভরতা কমাতে এ অঞ্চলের চাষিরা ঝুঁকে পড়েন পেয়াজ আবাদে। কিন্তু এখানেও স্বস্তি নেই। পেঁয়াজের বাম্পার ফলন যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন যুক্ত হয়েছে গ্রীস্মকালীন পেঁয়াজ। রাজশাহীতে চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে নজিরবিহীন দরপতনে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। জেলার বিভিন্ন হাটে বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে হাজার টাকায়। উৎপাদন খরচই না ওঠায় হাজারো কৃষক লোকসানের মুখে পড়েছেন। সংরক্ষণে পচন, ওজন কমে যাওয়া এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরো সংকটময় করে তুলেছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে আট হাজার ৩৪৪ হেক্টরে আবাদ হয়েছে আগামজাত বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ। মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল চার লাখ ৩২ হাজার ৩০০ টন, যার মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ টন। অনুকূল আবহাওয়ায় তাহেরপুরী ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজেরও ভালো ফলন হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, অন্য বছর এ সময়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এবার জাতভেদে দাম নেমে এসেছে ৮০০ থেকে হাজার টাকায়। ফলে প্রতি মণে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত কম দাম পাচ্ছেন তারা। মঙ্গলবার জেলার অন্যতম বৃহৎ পেঁয়াজের হাট দুর্গাপুর সদর সিংগাবাজার ঘুরে দেখা যায়, দাম কমে যাওয়ায় চাষিদের মধ্যে তীব্র হতাশা বিরাজ করছে। পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক আজিজুল হক বলেন, ‘দাম স্বাভাবিক না হলে আমি আর পেঁয়াজ চাষ করব না। দীর্ঘদিন সংরক্ষণে পেঁয়াজ শুকিয়ে ওজন কমেছে, আবার অনেক পচেও গেছে। বাজারে এসে ভালো দামও মিলছে না। এর মধ্যে সার ও ওষুধের দোকানে হালখাতার চাপ। উৎপাদন ব্যয় তোলাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

ময়মনসিংহ থেকে মো. শামসুল আলম খান জানান, চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাই কম থাকায় ময়মনসিংহে ধান, আলু, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসলের বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে সোনালি ধান আর সবজির সমারোহে কৃষকদের মধ্যে শুরুতে ছিল ব্যাপক আশাবাদ। তবে বাজারে উৎপাদিত ফসলের কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় সেই আনন্দ এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। ময়মনসিংহ সদর, ফুলপুর, ত্রিশাল, মুক্তাগাছা, গৌরীপুর ও ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে ধান, পেঁয়াজ ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম তুলনামূলক কম। ফলে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের ক্রমবর্ধমান খরচ মিটিয়ে অনেক কৃষকই লাভের মুখ দেখতে পারছেন না।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার কৃষক আব্দুল করিম বলেন, ‘এবার ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচই ঠিকমতো উঠছে না।’ ত্রিশালের আরেক কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ফসল বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু দাম কম থাকায় আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় অনেক কৃষিপণ্যের দাম চাপের মুখে রয়েছে। এছাড়া সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক দ্রুত ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নিশ্চিত করা, সরকারি পর্যায়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল ক্রয় বৃদ্ধি এবং হিমাগার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হলে তারা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং কৃষিতে আগ্রহ ধরে রাখতে পারবেন।

কুমিল্লা থেকে সাদিক মামুন জানান, চলতি বছর অনুকূল আবহাওয়া ও অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করায় কুমিল্লা জেলাজুড়ে কৃষিতে বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠের পর মাঠে সোনালি ধান, পরিপুষ্ট আলু, ভুট্টাসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই চোখ জুড়ানো ফসলের পেছনে লুকিয়ে আছে কৃষকের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস। ফলন ভালো হলেও বাজারে উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় জেলার প্রান্তিক চাষিরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। কুমিল্লার চান্দিনা, বুড়িচং, দেবিদ্বার এবং বরুড়া উপজেলার বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকা ঘুরে চাষিদের এই দুর্দশার কথা জানা গেছে। চলতি মৌসুমে কুমিল্লা জেলার অন্তত ১০টি উপজেলায় আলু, ধান, ভুট্টাসহ প্রায় সব ধরনের ফসলের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম থাকায় এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় হেক্টরপ্রতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তবে এসব ফসল বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে কৃষকের হতাশার কথা বেরিয়ে এসেছে। কুমিল্লার সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’-এই স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কুমিল্লার প্রান্তিক কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

অন্যথায়, বাম্পার ফলনও কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। চান্দিনা উপজেলার আলুচাষি ছালামত জানান, এবার বীজ, সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিক বেশি ছিল। এক মণ আলু উৎপাদন করতে যে খরচ হয়েছে, বাজারে পাইকারি দর তার চেয়ে অনেক কম। কোল্ডস্টোরেজে রাখার ভাড়াও চড়া দিতে হয়েছে। বুড়িচংয়ের খাড়াতাইয়া এলাকার ধানচাষিরা জানান, বাজারে নতুন ধান ওঠার পর পাইকাররা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দিয়েছে। শ্রমিকের চড়া মজুরি দিয়ে ধান কাটার পর বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। কুমিল্লার কৃষিনির্ভর এলাকার ভুক্তভোগী চাষিরা এই সংকট থেকে বাঁচতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। কৃষকদের দাবিÑ সরকারি উদ্যোগে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে ধান, আলু ও পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য কেনা। মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। কৃষকদের জন্য সরকারি হিমাগার বা কোল্ডস্টোরেজ সুবিধা বাড়ানো, যেন তারা ফসল ধরে রাখতে পারেন।

গাইবান্ধা থেকে আবেদুর রহমান স্বপন জানান, চলতি রবি ও বোরো মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূল এবং সেচ সুবিধা পাওয়ায় গাইবান্ধা জেলায় এবারে বোরো, আলু, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুনসহ অন্যান্য সহায়ক ফসল বাম্পার ফলন সত্ত্বেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। কৃষকরা বাজারে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। বীজ, সারসহ কৃষি উপকরণ এবং শ্রমিক সংকটজনিত কারণে উৎপাদিত ধানের দামের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এবারও কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। উৎপাদন খরচই উঠছে না। ফলে কৃষকরা তাদের কষ্টের ফসল উৎপাদন করতে দুশ্চিন্তায় তাদের দিন কাটছে।

সাদুল্ল্যাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের ভগবানপুর গ্রামের কৃষক হাফিজার জানান, আমি এক হেক্টর জমিতে আলু করেছি উৎপাদন হয়েছে ৬০ মণ কিন্তু আমার প্রতি কেজি আলু ১০ টাকা দরে বিক্রি করেছি এতে আমার উৎপাদন খরচ ওঠেনি। গাইবান্ধা খাদ্য বিভাগ এবার জেলায় চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ২৬ হাজার ৪০ মেট্রিক টন এবং ৯ হাজার ৫৬৩ মেট্রিক টন। চালের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ৪৯ টাকা এবং ধান ৩৬ টাকা দরে। উৎপাদিত ধান চালের সিকি ভাগেও সরকার ক্রয় করবে না। তার ওপর রয়েছে আর্দ্রতা যাচাইয়ের ফ্যাকরা। কুলিদের দাপট, অফিসের ঝামেলা। কৃষকরা তাই বাজারমুখী। বাজারে মূল্য নেই। সরকারি মূল্য প্রতি কেজি ধান যেখানে ৩৬ টাকা। সেখানে মহাজনের কাছে তার দাম মাত্র ২০ টাকা। ফলে উৎপাদন খরচ উঠছে না। বাড়তি ফসল উৎপাদন করতে পেরে তাদের মুখে যেখানে হাসি ফোটার কথা। সেখানে উৎপাদন খরচই না উঠায় তাদের মুখে এমন দুশ্চিন্তার ছাপ।

ফরিদপুর থেকে আনোয়ার জাহিদ জানান, চলতি বছর অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশে ফরিদপুরে কৃষিতে বাম্পার ফলন হয়েছে। আলু ধান পেঁয়াজসহ প্রায় সব ফসলের ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু কৃষক উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে হতাশ। এ বিষয়ে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেলÑ পেঁয়াজ, আলু, ধানের ব্যাপক ফলন হলেও দামে কম। কৃষকরা খরচ ওঠাতে পারবে না বলে জেলার ৯টি উপজেলার পাঁচটি উপজেলার কৃষকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। বৃহত্তর ফরিদপুরের পেঁয়াজ, রসুন ও পাটের রাজধানীখ্যাত সালথা, নগরকান্দা এলাকার কৃষকদের পেঁয়াজ নিয়ে হাহাকার করতে দেখা গেছে। পেঁয়াজের দাম কম পেয়ে রাগে ক্ষোভে এই অঞ্চলের কৃষকরা বাজারের পেঁয়াজ বিক্রি করতে এনে দাম না পেয়ে নদীতে ফেলে দেয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সালথার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারের কাছে কৃষকদের কষ্টের কথা উপস্থাপন করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি পাঠিয়েছেন বলে ইউএনও গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করছেন। পাশাপাশি, ধানের দামও তুলনামুলক কম এবং পাটের দামও কম বলে কৃষকরা হতাশ।