Image description

কারবালায় মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে শোক। ছবি: হজরত আলীর মাজার কর্তৃপক্ষ

এ যেন এক বিষাদ-সিন্ধুর পুনরুত্থান। আবারও অশ্রুজলে ভিজল কারবালা। মুসলিম বিশ্বের একবিংশ শতাব্দীর মহানায়কের বিদায়ে ডুকরে কেঁদে উঠল আরেকবার। ইমাম হোসাইনের বংশধর শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ‘শেষ বিদায়’।

শোক অনুষ্ঠানের ষষ্ঠ দিনে (বুধবার) ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় জানাজা হয় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার। লাখো কণ্ঠের আহাজারিতে কেঁপে ওঠে নাজাফ-কারবালার তপ্ত মরুভূমি। শোকে নিথর হয়ে গিয়েছিল মাথার ওপরের অসীম মহাশূন্যও! ইরাকের আকাশে কোনো পাখির ডাক শোনা যায়নি গতকাল। ছিল না মেঘের গর্জন। হাসতে ভুলে গিয়েছিল ইরাক। শোকার্ত নীল আকাশের নিচে শুধুই কান্নার আওয়াজ।

শোকের কালো পতাকা উড়ছিল ফোরাত নদীর অববাহিকায়। ইমাম হোসাইনের (আ.) পুণ্যভূমির ধূলিকণা যেন নতুন করে চিনে নিল এক আত্মিক বন্ধনকে, যা কাঁটাতারের সীমান্ত পেরিয়ে একই বেদনার সুতোয় গেঁথে ফেলল প্রতিবেশী দুই ভূখণ্ডকে। সীমানা মুছে একাকার হয়ে গেল ইরান আর ইরাকের হৃদয়।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘মাহান বিমানে’ পৌঁছায় মহান নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির (রহ.) নিথর দেহ। বুকফাটা আর্তনাদ, হাহাকার, আহাজারিতে ছুটে এলেন ইরাকের মানুষও। মুহূর্তে শোকসাগরে পরিণত হলো নাজাফ। লেখাল আরেক বিষাদের ইতিহাস। বিমানবন্দরের পাশে তখন লাখো মানুষের ঢল। ঘরে বসে নেই কেউ। রাতেই ছুটে যান ইরাকের প্রেসিডেন্ট নাজার উমাইদি, আলি ফলেহ জাইদি, প্রধান বিচারপতি ফয়েক জাইদান, সরকারদলীয় নেতাকর্মীসহ বিরোধীদলীয় নেতারা। আলেম সমাজ, নারী, শিশু, সাধারণ মানুষসহ সবাই নাজাফ বিমানবন্দরের দিকে। জানালা দিয়ে শুনতে পাচ্ছি শুধু কান্নার আওয়াজ। কণ্ঠে ভেসে আসছে ‘আহলান বিকা ইয়া ইবনুল হোসাইন সৈয়েদ আলি খামেনায়ী (আপনাকে স্বাগতম হে হোসাইনের সন্তান আলি খামেনি)।’

স্থানীয় সময় গতকাল দুপুর ১টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪টায়) জোহরের নামাজের পর ইমাম আলির (কাররামাল্লাহ ওয়াজহু) মাজারের ভেতরে সৈয়েদ মোহাম্মাদ তাকি আল-হাকিমির নেতৃত্বে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য মোতাবেক, প্রায় ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষ ইরাকের বিভিন্ন স্থান থেকে উপস্থিত হন নাজাফে। জানাজা উপলক্ষে সরকারি ছুটিও ঘোষণা করে ইরাক।

কারবালার উদ্দেশে রওনা

পবিত্র নাজাফ আল-আশরাফ নগরীতে মারাসিমে জানাজা শেষে গাড়িবহরে তোলা হয় খামেনির কফিন। আনা হয় ৯০ কিলোমিটার দূরের সেই ঐতিহাসিক কারবালার ময়দানে। সেখানেও প্রায় ২০ লাখ মানুষের ভিড়।

লাখো মানুষ এই শোকযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, খুব বেশি দিন নয়, মাত্র ১২ দিন আগেও ইরাকের কারবালায় বয়ে গেছে নবীজির কনিষ্ঠ দৌহিত্র ও ইসলামের ইতিহাসের সব থেকে স্মরণীয় হৃদয়বিদারক শোকের বাতাস। ইমাম হোসাইনের কারবালায় সংঘটিত সেই ১০ মহররমের ঘটনা। দিনটি প্রতি বছর ইরাকের মানুষ শোক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে পালন করে থাকেন। সেটি পার হতে না হতে আবার যেন ইরাকের দিগন্তে ভেসে এলো নতুন শোকের আওয়াজ। ইমাম হোসাইন (রাহ.) যেমন অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে বেছে নিয়েছিলেন শাহাদাতের রাস্তা। একই রাস্তায় হাঁটলেন তার বংশধর ইমাম খামেনি। বিকালে স্থানীয় সময় ৩টা-৪টার (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা-৮টা) মধ্যবর্তী সময়ে পূর্বপুরুষ ইমাম হোসাইনের মাজারে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। মানুষের ঢল দেখে মনে হয়নি তাকে ইরান থেকে আনা হয়েছে। পরে তাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় নিজ দেশে। জন্মশহর ইরানের মাশহাদে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন মুসলিম বিশ্বের এই আপসহীন নেতা।

খামেনির শেষ বিদায়ে নাজাফবাসীর শ্রদ্ধা। ছবি: হজরত আলীর মাজার কর্তৃপক্ষ

কেন কারবালায় খামেনির মরদেহ

কারবালা শহর ইরাকের মধ্যাঞ্চলে রাজধানী বাগদাদ হতে ১০৫ কিঃ মিঃ দক্ষিণে ফুরাত নদীর তীরে অবস্থিত। শিয়া মাযহাবে (ইসলামী ফিকহ) কারবালা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। ইমাম হোসাইনের (রা.) ৬১ হিজরীতে ১০-ই মুহাররমে শাহাদাতের পর থেকেই জায়গাটি জিয়ারতের স্থান হিসেবে পরিচিত। সাহাবীদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ও প্রবীণ সাহাবী জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আনসারি প্রথম ইমাম হোসাইনের (রা.) মাজার জিয়ারত করেন। শিয়াদের ইমামরা এই পবিত্র স্থানটি জিয়ারতের জন্য তাগিদ প্রদান করেছেন। স্থানীয় কোন শিয়া নাগরিক মৃত্যুবরণ করলেও নিকট আত্মীয়-স্বজন মৃতদেহকে কারবালা জিয়ারত ও জানাজার নামাজ মাজার শরিফের ভীতরে অনুষ্ঠিত করে তারপর দাফন করেন। এটিকে অত্যান্ত বরকতময় মনে করেন তারা।

সৈয়েদ আলী খামেনি (রহঃ) হলেন ইমাম হোসাইনের (আঃ) বংশধর। পিতার সিলসিলা মোতাবেক তার পূর্ব পুরুষ শিয়াদের ৯ম ইমাম জাওয়াদ পর্যন্ত পৌছায়। ইমাম জাওয়াদ হলেন ইমাম হোসাইনের ৬ষ্ঠ তম সন্তান। ইমাম হোসাইনের (রা.) মাজারে মূলত জানাজার নামাজ পড়ার জন্যই খামেনির মৃতদেহ আনা হয়েছে ইরাকে। তাছাড়াও সৈয়েদ আলী খামেনি একজন শিয়া মাযহাবের শীর্ষ পর্যায়ের ধর্মীয় নেতা ছিলেন। কারবালার ঐতিহ্য ও শিক্ষা তিনি নিজের মধ্যে লালন করতেন। ইরাকের শিয়া মাযহাবে অনেক অনুসারীও আছেন তার। নিজ অনুসারীদের মধ্যে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত করাও ছিলো একটি অন্যতম কারণ।