দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। নিষ্পত্তির তুলনায় নতুন মামলা দায়েরের হার বেশি হওয়ায় মামলাজট নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখে পৌঁছেছে।
আইনজ্ঞদের মতে এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং সময়মতো ন্যায়বিচার করাও সম্ভব হবে না। মামলাজট কমাতে প্রয়োজনীয় বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি নতুন মামলা দায়ের ঠেকানো জরুরি বলেও অভিমত তাঁদের।
সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি। এ ছাড়া হাই কোর্টে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬ ও আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৯৭৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে বিভিন্ন আদালতে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৯টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে আপিল বিভাগে ৬ হাজার ৫৩৬, হাই কোর্ট বিভাগে ৭ হাজার ৭৩৯ ও অধস্তন আদালতে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে নতুন মামলা হয়েছে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৮৭৫টি। এর মধ্যে আপিল বিভাগে ৩ হাজার ৯৫৮, হাই কোর্ট বিভাগে ২২ হাজার ৯৯৯ ও অধস্তন আদালতে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৯১৮টি মামলা নতুন করে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ তিন মাসে নিষ্পত্তির তুলনায় নতুন মামলা হয়েছে ৯৫ হাজার ৫১৬টি বেশি, যা মামলাজট বৃদ্ধির প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন মামলা দায়েরের হার নিষ্পত্তির চেয়ে বেশি হওয়াই মামলাজট বৃদ্ধির প্রধান কারণ। পাশাপাশি বিচারকের তুলনায় মামলার সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তিও সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে উচ্চ আদালতে ১০৬ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে আপিল বিভাগে রয়েছেন পাঁচজন এবং হাই কোর্ট বিভাগে ১০১ জন। অন্যদিকে অধস্তন আদালতে কর্মরত বিচারকের সংখ্যা ২ হাজার ২৩৪। তবে এ সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মামলাজট কমানোর বিষয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল সংসদে তাঁর বক্তব্যে বলেন, মামলার জট কমানো এবং দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বিচার বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে ইতোমধ্যে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আদালতের সহায়ক কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান।
তিনি আরও জানান, সরকার সম্প্রতি ৬৫০টি সিভিল জজ ও সিনিয়র সিভিল জজ আদালত, ৪০৬টি যুগ্ম দায়রা জজ আদালত এবং ২০৪টি অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব আদালতের জন্য নতুন বিচারকের পদ সৃষ্টির বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে মামলার নিষ্পত্তির গতি আরও বাড়বে।
বিচারক বৃদ্ধির তাগিদ দুই সুপারিশে : তথ্যানুযায়ী, উচ্চ আদালতে বর্তমানে ১০৬ জন বিচারপতি রয়েছেন। এর মধ্যে আপিল বিভাগে পাঁচজন ও হাই কোর্ট বিভাগে ১০১ জন। এ ছাড়া অধস্তন আদালতে কর্মরত আছেন ২ হাজার ৩৪১ জন বিচারক। তবে এ সংখ্যাকে অপ্রতুল বলছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের দেওয়া ৩৫২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে মামলাজট কমানোসহ ৩২ বিষয়ে সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বে গঠন করা বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশে মামলাজট নিরসনের বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারকসংখ্যা অন্তত ৬ হাজারে উন্নীত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে সুপারিশে।
এর আগে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও জট কমিয়ে আনতে ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট একটি প্রতিবেদন দেয় আইন কমিশন। প্রতিবেদনে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে জটের মূল পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হচ্ছে পর্যাপ্ত বিচারক না থাকা, বিশেষায়িত আদালতে পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ না হওয়া, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, জনবলের অভাব ও দুর্বল অবকাঠামো। আইন কমিশনের এ প্রতিবেদনেও মামলাজট নিরসনে অধস্তন আদালতের বিচারকসংখ্যা পর্যায়ক্রমে ৫ হাজারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।
নতুন মামলা দায়ের ঠেকাতে হবে : মামলাজটের বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মামলাজট বিচার বিভাগের জন্য একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে বার ও বেঞ্চকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রধান বিচারপতিকে আরও বেশি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বার্থ মামলার আইনজীবী খ্যাত সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘শুধু পরিকল্পনা নয়, মহাপরিকল্পনা করে মামলাজট বৃদ্ধির প্রধান দুই কারণ নিয়ে কাজ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের মামলাজট বাড়ার প্রধান দুই কারণের একটি হচ্ছে আমরা মামলা দায়েরও ঠেকাতে পারছি না, অন্যটি দ্রুত নিষ্পত্তিও করতে পারছি না।’ সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, ‘মূল কাজটা না করে মুখে যদি বলতে থাকি মামলাজট কমাতে হবে, তাহলে এটা কোনো সমাধান নয়।’ তাঁর মতে মামলাজটের লাগাম টানতে হলে বিচারকের সংখ্যা অন্তত তিন গুণ বৃদ্ধি করতে হবে, লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মামলার উৎপাদন কমানোর বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।’