দুই মাস ছাড়া ১০ মাসই পণ্য রপ্তানি কমেছে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ০.৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন (৪ হাজার ৮০০ কোটি) ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক উল্লম্ফন দেখা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বৃহস্পতিবার পণ্য রপ্তানির এই হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, চলমান যুদ্ধ ও ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ব্যাহত করায় রপ্তানিতে এই পতন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগে ছিল ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সরকার ৫৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।
এতে দেখা যায়, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারেনি। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশল ও হিমায়িত পণ্যে প্রবৃদ্ধি আছে।
বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম মাস অর্থাৎ জুলাইয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পরের মাস থেকে রপ্তানি কমতে থাকে। টানা আট মাস কমার পর গত এপ্রিলে রপ্তানি বৃদ্ধি পায় প্রায় ৩৩ শতাংশ। তারপরের দুই মাসে আবার কমেছে। গত অর্থবছরে চার মাস চার বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি হয়েছে। অন্য মাসগুলোয় তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়। সবমিলিয়ে অর্থবছরের ১২ মাসে রপ্তানি হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পণ্য। তার আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় ১.৬৪ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। গত জুনে ২৭৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ২১ শতাংশের কাছাকাছি।
গত অর্থবছর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৭ শতাংশ। এ সময়ে ১২.২৬ বিলিয়ন ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। তার আগের বছরে রপ্তানি হয়েছিল ১১.৪৫ বিলিয়ন ডলার। গত মাসে ৮ কোটি ৭২ লাখ ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম দুই উৎস প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানি। বিদায়ী অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় আসে ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার। এই আয় তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি আমদানি কম হওয়ার কারণে গত মাস শেষে বিপিএম-৬ অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩১.৫৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তবে রপ্তানি বেশি হলে রিজার্ভ আরও বেশি হতো।
এদিকে, সদ্য সমাপ্ত জুন মাসে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫.৯১ শতাংশ বেড়েছে। ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ ৪২০ কোটি ২৬ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই মাসে এ আয় ছিল ৩৩৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। এক মাসের ব্যবধানে শক্তিশালী এ প্রবৃদ্ধি রপ্তানি খাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জুনের শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নতুন অর্থবছরের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই রপ্তানি খাতকে টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত বছর বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। এতে তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ধাক্কা খায়। শুধু তাই নয়, ইউরোপের বাজারেও তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়েন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। ইরান যুদ্ধ শুরু হলে সংকট আরও প্রকট হয়। ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে গেছে। এর প্রভাবে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধ বাড়ছে।
অন্যদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৫৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো।
বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া এবং ক্রেতাদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত দাম না পাওয়াই এই ধসের প্রধান কারণ। এ ছাড়া, ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং লোকসানের ভার সইতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে অথবা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।