Image description

ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টার্গেট কিলিংসহ প্রায় সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। ছোট বড় সব সন্ত্রাসীর হেফাজতে এখন দেশি-বিদেশি অস্ত্র রয়েছে। হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ অস্ত্র। দেশের সীমান্ত দিয়ে এসব অস্ত্র দেশে আনছে অস্ত্র চোরাকারবারিরা। হাত বদল হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকার অপরাধীদের কাছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিজ্ঞাপন দিয়ে অবৈধ অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও উদ্ধার হওয়া অবৈধ অস্ত্রের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। আর এই অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়িতে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, গত তিন মাসে সারা দেশে অন্তত ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত মার্চ মাসে ৩১৭টি, এপ্রিল মাসে ২৮৮টি ও মে মাসে ৩১০টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা রেঞ্জে ২০৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর বেশির ভাগই ব্যবহৃত হয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। আর এইসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ১৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১ হাজার ৭৮৫ রাউন্ড গুলি, ৫২টি ম্যাগাজিন, ৩২টি হাতবোমা ও ২ হাজার ২শ’ কেজি গানপাউডার উদ্ধার করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা এবং সীমান্তপথে অস্ত্র চোরাচালানের কারণে দেশে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ বেড়েই চলেছে। তাই সীমান্ত এলাকায় অভিযান জোরদার হলেও সড়ক ও নদী পথে ঠিকই অস্ত্রের চালান রাজধানীমুখী হচ্ছে। আর বহনের সুবিধার্থে এই চালানের শীর্ষে রয়েছে ‘বিদেশি পিস্তল’ (৭.৫ ক্যালিভার)। এর মধ্যে মেড ইন ইউএসএ, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের অস্ত্রেরও দেখা মিলেছে উদ্ধার অভিযানে। বর্তমানে ঠিক কি পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রাজধানীতে আছে তার সঠিক তথ্য গোয়েন্দা পুলিশের কাছেও নেই।
সূত্র বলছে- একটি চক্র দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে এনে দিনাজপুরের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় মজুত করছে অবৈধ অস্ত্র। এরপর অর্ডার অনুযায়ী মোটা টাকার বিনিময়ে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ডেলিভারি দিয়ে যাচ্ছে।

প্রাইভেটকার, পণ্যবাহী ট্রাকসহ নদী পথে দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব অস্ত্র চলে আসছে রাজধানীতে। এ ছাড়াও যশোরের বেনাপোল, শার্শা, চৌগাছা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের রহনপুর রাঘব বাটি, গোপালপুর, মনাকষা, সোনা মসজিদ, আজমতপুর, বিলভাতিয়া, ঝিনাইদহের মহেশপুরের জুলুলী, সাতক্ষীরার কলারোয়ার তলুইগাছা, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা, চারঘাট, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, সাতক্ষীরার শাঁকারা, মেহেরপুর, কুমিল্লা, সরাইল, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফের খড়ের দ্বীপ ও উখিয়া, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চরচিলামারী, সিলেটের কানাইহাট, জৈন্তাপুরের মিনাটিলা, জাফলংয়ের কাটরি, সুনামগঞ্জের ছনবাড়ি বাজার, চারাগাঁও, দিনাজপুরের গিলবাড়ি, মৌলভীবাজারের বড় লেখার তারাদরমসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়তই প্রতিবেশী দেশ হয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে।

গোয়েন্দারা বলছেন- সীমান্তে যারা অবৈধভাবে লোকজন পারাপারে জড়িত, তাদের বড় অংশ অস্ত্র চোরাকারবারির সহযোগী। চোরাকারবারিরা বড় অস্ত্রের চালান পার করতে ছোট চালানগুলো নিজেরাই পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়। কারণ, একটি অভিযানে পুলিশকে ব্যস্ত রেখে চোরাকারবারিরা অন্য চালানগুলো নিরাপদে গন্তব্যে পাঠিয়ে দেয়। শুধু সীমান্ত দিয়েই নয় কারিগর ভাড়া করে এনে দেশের অভ্যন্তরের গহিন পাহাড় ও লেদ মেশিনেও বানানো হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। আর এইসব অস্ত্র শুধু শীর্ষ সন্ত্রাসী নয় টাকার বিনিময়ে পৌঁছে যাচ্ছে কিশোর গ্যাং, মাদককারবারি এমনকি পেশাদার ছিনতাইকারীদের হাতে। আর অস্ত্রের এই সহজলভ্যতাই অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি করছে। এতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে অপরাধী চক্র।

র‌্যাবের তথ্য বলছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাই-চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে রোববার র‍্যাব-২ এর একটি দল অভিযান পরিচালনা করে চন্দ্রিমা হাউজিং থেকে একটি বিদেশি অস্ত্র এবং দুই রাউন্ড তাজা গুলিসহ শামীম পাটালিসহ ৮ জন ছিনতাইকারীকে আটক করেছে। এর আগে গত শনিবার দুপুরেও চিহ্নিত কিশোর গ্যাং ‘মাওরা গ্রুপের’ প্রধান মো. সোহেল ওরফে মাওরা সোহেলকে আটক করেছে র‌্যাব-২ এর সিপিসি ২ এর সদস্যরা। ওই সময় তার কাছ থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র (পিস্তল)। আগে দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করলেও বর্তমানে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে এই চক্রটি।
এর আগে গত ১২ই জুন দুপুর পৌনে ২টার দিকে রাজধানীর রামপুরা এলাকার বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের উল্টো দিকে নিজের বাসার কাছে গুলিবিদ্ধ হন ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইলা পলাশ। সেদিন দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে খুব কাছ থেকে পলাশের মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায়। এরপর প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে।

শুক্রবার গভীর রাতে সেখানেই মৃত্যু হয়েছে তার। চাঞ্চল্যের কথা এই হত্যাকাণ্ডেও ব্যবহৃত হয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। সেদিন ওই পলাশ কিলিং মিশনে সামনে থেকে দু’জন অংশ নিলেও তাদের গ্রুপে ওই এলাকায় একাধিক ব্যক্তি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছিলেন। এর ঠিক চারদিন আগে গত ৭ই জুন বিকাল ৩টার দিকে মতিঝিল শাপলাচত্বর এলাকায় জনতা ব্যাংকের সামনে মো. লোকমান নামের এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, প্রথমে লোকমানের কাছ থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিল দু’জন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে দিনদুপুরে সকলের সামনে তাকে গুলি করা হয়। পরে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির কাছ থেকে টেনেহিঁচড়ে ব্যাগ নিয়ে মোটরসাইকেলে চেপে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এর কিছুদিন আগেই গত ২৮শে এপ্রিলও রাজধানীর নিউমার্কেট বটতলা এলাকায় সকলের সামনে প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করা হয় খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে। ওই হত্যাকাণ্ডেও ব্যবহৃত হয়েছে একাধিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। এমনকি পথচারীরা যখন কিলারদের ধাওয়া দেয় তখনও গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায় খুনিরা।

ঘটনার প্রায় দুই মাসেও এখনো অস্ত্র বা খুনি কাউকেই আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। এর আগেও গত বছরের ১০ই নভেম্বর বেলা পৌনে ১১টার দিকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে ঠিক প্রকাশ্যে রাস্তায় ফেলে ফিল্মি স্টাইলে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় পুলিশের এক সময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈফ মামুনকে। সেই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা যায়, শত শত মানুষের সামনে মুখে মাস্ক পরা দুই ব্যক্তি কীভাবে মামুনকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছুড়ছে। আর এই সব ক’টি ঘটনাতেই ব্যবহৃত হয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। এ ছাড়াও প্রতিনিয়তই এমন অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখছে রাজধানীবাসী।

এদিকে গত ১৮ই জুন রাতে ওয়ারীর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইসমাইল হোসেন ওরফে অটো সজলসহ তার ৩ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্বামীবাগের বাসা থেকে ২ টি ‘টাওরাস’ ব্র্যান্ডের অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিন এবং ৭৭ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়। গত ২৮শে এপ্রিলও রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও পল্টন এলাকা থেকে দেশি-বিদেশি অস্ত্রসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। তাদের কাছ থেকে ৩টি বিদেশি পিস্তল, ২টি ম্যাগাজিন, ৩৩টি গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া একই সময়ে মোহাম্মদপুরের ৪০ ফুট এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি দেশীয় একনলা বন্দুক ও একটি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। গত ২৬শে এপ্রিলও কাফরুল এলাকায় বিশেষ অভিযানে অবৈধ বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে র‍্যাব।

গত ২রা ফেব্রুয়ারিও রাজধানীর তুরাগের হরিরামপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী সোয়েব হোসেন মুন্না ওরফে ভাগিনা মুন্নাকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব-৪ এর সদস্যরা। গ্রেপ্তারকালে তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, ২টি ম্যাগাজিন ও ১৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব জানায়, এসব অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সে তুরাগ, মিরপুর, কাফরুল, পল্লবী, ভাষানটেক এবং ক্যান্টনমেন্ট থানাসহ আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতো। পাশাপাশি এগুলো বিভিন্ন পেশাদার অপরাধীদের ভাড়ায় সরবরাহ করতো। গত ৭ই ফেব্রুয়ারিও রাজধানীর মধ্য বাড্ডার বেপারীপাড়া থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেহেদী হাসান ওরফে দীপুকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। তার বাড়ি থেকে মোট ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র ও ৩৯৪টি গুলি উদ্ধার করা হয়। এই বাহিনীর কাছে আরও অবৈধ অস্ত্র রয়েছে বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস. এন. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অবৈধ অস্ত্র, খোয়া যাওয়া অস্ত্র, এমনকি এখন দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়েও অস্ত্র বেচা-কেনা হচ্ছে।

এসব বিষয়ে আমাদের সোর্স নিয়োগ করা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আমরা যখন কোনো অবৈধ অস্ত্র পাচ্ছি তখন সেই অস্ত্র কোথা থেকে সে পেলো, কীভাবে তার কাছে আসলো সেসব রুট আউট করছি। এ ছাড়া আমাদের সিটিটিসি, গোয়ন্দা পুলিশ এ বিষয়ে কাজ করছে। কোথাও যদি এমন অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করা হয় তখন তারা এর ডিগআউটের চেষ্টা করছে এসব অস্ত্র কোথা থেকে আসলো। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। বিভিন্ন সময় অনেকে ধরাও পড়ছে। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আসলে আমাদের সমস্যা হচ্ছে একটা ঘটনা ঘটার পর সেটাতে যতটা সময় দেয়া প্রয়োজন সেই পর্যাপ্ত সময় আমরা দিতে পারি না। একটা ঘটনার পরই আরেকটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এর আগে একটা ঘটনা ঘটে ২রা মার্চ। সেই একটা ঘটনা নিয়ে তার অস্ত্র উদ্ধার হলো জুনের ১৮ তারিখে। ঘটনার তিন মাস পর হলেও কিন্তু আমরা অস্ত্র উদ্ধার করেছি। মূল কথা আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং-এর পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, অপরাধ দমনে আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে চলেছি। আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। অপরাধ বিশ্লেষণ করে আমরা যেই এলাকায় যখন প্রয়োজন ঠিক সে সময়েই টহল চালাচ্ছি। আমাদের র‌্যাব সদস্যরা সাদা পোশাকেও নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু অস্ত্রসহ আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।