Image description
সংকট নিরসনে বাজেটে রোডম্যাপ জরুরি

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের গড় আমদানি শুল্ক ও করপোরেট করহার-দুটোই বেশি। এর সঙ্গে নীতি ধারাবাহিকতার অভাব, ব্যবসার লাইসেন্স-পারমিট গ্রহণে জটিলতা, বন্দর-কাস্টমস-আয়করসহ সরকারি অফিসের ঘুস-দুর্নীতি বিনিয়োগকারীদের ‘গোদের ওপর বিষফোড়ার’ মতো যন্ত্রণা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমলাতান্ত্রিক এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে দেশি বিনিয়োগকারীরা কোনোরকমে নিশ্বাস নিচ্ছেন, হাঁপ ছেড়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। আর বিদেশি বিনিয়োগের অবস্থা ক্রমেই নিম্নমুখী। তবে বিদ্যমান এমন পরিস্থিতির জন্য বর্তমান সরকার কোনোভাবে দায়ী নয়। অতীতের সরকারের ভুলে খেসারতে দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, তা সরকারকে এই বাজেটের মধ্য দিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। যুগান্তরকে এমনটি জানিয়েছেন কয়েকজন বিশ্লেষক।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্যের কাঁচামাল আমদানি থেকে উৎপাদন এবং বিপণনের প্রতিটি ধাপে এত ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। করনীতি ও কর-কাঠামো যেখানে হওয়া উচিত ব্যবসাবান্ধব, সেখানে বাংলাদেশে করনীতি শোষণমূলক। এখানে ব্যবসাকে সহায়তা করার পরিবর্তে রাজস্ব আদায়কে কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্স হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আর এ কারণে কর কর্মকর্তারাও কর আদায়ে জুলুম করতে বাধ্য হন। এতে একধরনের অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতিও বাড়ে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্যমতে, বাংলাদেশের গড় শুল্কহার ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। রপ্তানি খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের গড় শুল্কহার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ আর কম্বোডিয়ার ১০, লাওসের ৮ দশমিক ৭, পাকিস্তানের ১০ দশমিক ৩ এবং শ্রীলংকার ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতের গড় শুল্কহার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, ১৭ শতাংশ। এর প্রধান কারণ-ভারত অভ্যন্তরীণ কৃষি ও কিছু নির্দিষ্ট উৎপাদনশীল খাতকে উচ্চ শুল্ক সুরক্ষা দেয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের নন-লিস্টেড কোম্পানির করহারও অনেক। বাংলাদেশের করপোরেট করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ; যেখানে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওসের ২০, আর ভারতের ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশের চেয়ে করপোরেট কর বেশি পাকিস্তান ও শ্রীলংকার; যথাক্রমে ২৯ ও ৩০ শতাংশ। এ কারণে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) টানার ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি ও সুনীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন নতুন শিল্প খাতকে উৎসাহিত করতে শুল্ক-করছাড় ও রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। করনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা রয়েছে। একই সঙ্গে করহার কমানোর অঙ্গীকারও রয়েছে, যা ইতিবাচক।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এ বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কর্মসংস্থান। আমরা করনীতি এমনভাবে সাজাতে চাই, যাতে নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা এবং নতুন প্রজন্ম এগিয়ে আসতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, নতুন বাজেট অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তার বিকাশ এবং উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করা হবে। এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে, যেখানে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হবে বেসরকারি খাত এবং তরুণ ও নারীদের জন্য সৃষ্টি করা হবে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগে চরম মন্দা চলছে। আর এই মন্দার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়েছে। অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে কর ও সুদের হার কমাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। উচ্চকর এবং ১৪-১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগে যাবে না। কারণ, সৎভাবে ব্যবসা করলে এই হারে কর ও সুদ দিয়ে মুনাফা সম্ভব নয়। ফলে তিনি কীভাবে টিকে থাকবেন। এজন্য বিনিয়োগ বাড়ছে না। এটি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা।

তিনি আরও বলেন, বক্তৃতা-বিবৃতিতে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু সমস্যার সমাধান করতে হলে দেশের বিদ্যমান বাস্তবতা মানতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো-বন্ধ কারখানা চালুর কথা বলছে সরকার। এজন্য ৬০ হাজার কোটির তহবিল গঠন করছে। এই প্রণোদনা তহবিলের সুদের হার রাখা হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ। কিন্তু এটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নয়। কারণ, অনেকে এই টাকা পাওয়ার জন্য এখন কারখানা বন্ধ রাখবে। এক্ষেত্রে সমাধান হলো-সুদের হার কমিয়ে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

আবু আহমেদ বলেন, বতর্মান প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সবচেয়ে জরুরি। তবে সরকারের বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় থাকলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। এটি একেবারে পরিষ্কার বিষয়। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে কর ও ঋণের সুদের ব্যাপারে সরকারকে নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ব্যবসার প্রধান প্রতিবন্ধকতা উচ্চ করহার ও জটিল কর-কাঠামো। প্রশাসনিক জটিলতাও অনেক আছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এসব বিষয়ে সরব হয়েছেন। আগাম কর, অগ্রিম আয়কর, উৎসে কর, উৎসে মূসকসহ নানা নামে নানা বিধিনিষেধ পরিপালন করতে হয়। যার কারণে কার্যকর করহার ৪৫-৪৮ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। এতে বেশি কর দিয়ে দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারীই ব্যবসা করতে পারবে না।

তিনি আরও বলেন, হয়রানি শুরু হয় পণ্যের কাঁচামাল আমদানি থেকে। আমদানিকারকের ঘোষিত ইনভয়েস ভ্যালু কাস্টমস মেনে নিয়েছে-এমন কোনো নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে নেই। যেই কাঁচামালই আমদানি করা হোক না কেন, কাস্টমস ডেটাবেজ ভ্যালুর নামের নিজস্ব মনগড়া মূল্যে সেটির শুল্কায়ন করে। এতে ব্যবসা খরচ বেড়ে যায়। এ প্রক্রিয়ায় সংক্ষুব্ধ হয়ে কোনো ব্যক্তি আপিল করতে চাইলেও রেহাই নেই। কারণ, আপিল-ট্রাইব্যুনালেও কাস্টমস কর্মকর্তারা বিচার করে থাকেন। একজন কর্মকর্তার রায় আরেকজন কর্মকর্তা সাধারণত বাতিল করতে চান না। তখন বাধ্য হয়ে বিনিয়োগকারীকে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

তার মতে, ব্যবসাকে টেকসই করতে হলে করহার কমানোসহ পুরো ব্যবসা প্রক্রিয়াটিকে ঢেলে সাজাতে হবে। তা না হলে দেশি বিনিয়োগকারীরা টিকতে পারবে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আসবে না।

হিসাববিদ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান বাড়াতে বাজেটে অনেক উদ্যোগ যেমন আছে, তেমনই কিছু বিষয় এড়িয়ে গেছে। যেমন: করপোরেট করহার ৫ বছরের জন্য অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় এবং এত বেশি উচ্চহার বিনিয়োগবান্ধব নয়। কারণ, বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর করপোরেট করহার অনেক কম। তিনি আরও বলেন, আয়কর আইনে নানা শর্ত পরিপালনে বাধ্যবাধকতা আছে, যা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিপালন সম্ভব নয়। এ কারণে বাংলাদেশে কার্যকরী করহার প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়। করপোরেট করহারেও বৈষম্য আছে। একই প্রকৃতির ব্যবসা করেও দেশি কোম্পানির চেয়ে বিদেশি কোম্পানির করহার অনেক বেশি। এ ধরনের বৈষম্য থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।