ডাক্তার হয়ে যাঁরা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেবেন, তাঁদের অনেকেই পাচ্ছেন না ডাক্তার হওয়ার উপযুক্ত শিক্ষা। বছরের পর বছর পার হয়ে যাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের অনেকে ‘ডাক্তারি পড়ে’ সেশনও শেষ করে ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার পথে।
একাধিকবার আন্দোলনের পরও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় গত রবিবার আবারও রাজপথে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমাদের মেডিক্যালের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিজস্ব হাসপাতাল পাচ্ছি না। ক্লিনিক্যাল ক্লাস ও ওয়ার্ড সুবিধা না থাকায় আমরা বাস্তব জ্ঞান থেকে পিছিয়ে আছি। এক বছরের মধ্যে হাসপাতাল চালুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্লাসে ফিরব না।’
সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজের এই চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নেত্রকোনা, নওগাঁ, নীলফামারী, মাগুরা, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর ও রাঙামাটি—এই সাতটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরও নিজস্ব ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল পায়নি। কক্সবাজার, পাবনা, যশোরসহ আরো কয়েকটি কলেজও হাসপাতাল সংকটে রয়েছে। অনেক কলেজ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা পুরনো ভবনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ১৫০ শিক্ষার্থীর জন্য নির্মিত মিলনায়নত ও শ্রেণিকক্ষে ২৫০ শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রায় অর্ধেক শিক্ষক পদ শূন্য। মৌলিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সংকট আরো ভয়াবহ। ফরেনসিক মেডিসিনে দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের জন্য অধ্যাপক আছেন মাত্র একজন। চরম দুরবস্থায় থাকা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ যেন নিজেরাই রুগী হয়ে গেছে।
এই সংকটের মধ্যেও সরকার এরই মধ্যে দুটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি আরো ছয়টি নতুন মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও চলছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যমান কলেজগুলোর মানোন্নয়ন না করেই নতুন কলেজ স্থাপনের এই প্রবণতা চিকিৎসা শিক্ষার সংকটকে আরো গভীর করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
‘অদক্ষ চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে’ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা এবং ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিক্যাল এডুকেশনের সাবেক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে প্রকৃত চিকিৎসা শিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তাঁর মতে, দক্ষ শিক্ষক না থাকলে দক্ষ চিকিৎসক তৈরি হবে না। আবার দক্ষ চিকিৎসক না হলে ভবিষ্যতে দক্ষ শিক্ষকও তৈরি হবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার ওপর।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের জন্য স্বীকৃত ও বাধ্যতামূলক ‘কন্টিনিউয়িং মেডিক্যাল এডুকেশন’ ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক চিকিৎসক নতুন ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের ওপর নির্ভর করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
ফরেনসিক মেডিসিনের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফরেনসিক মেডিসিন দুর্বল হয়ে পড়লে শুধু চিকিৎসা শিক্ষা নয়, বিচারব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার মান কমে গেলে মানুষ সঠিক বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
চিকিৎসা শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। ‘ইজ লাইফ সাপোর্ট কম্পিটেনসিস অ্যান আর্জেন্ট ইস্যু ইন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল এডুকেশন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের জরুরি চিকিৎসা দক্ষতা গড় মানেরও নিচে।
বাংলাদেশ জার্নাল অব মেডিক্যাল এডুকেশনে (বিজেএমই) প্রকাশিত ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণায় আটটি সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক, চিকিৎসক, শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দক্ষতা মান নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচটি। পয়েন্টে এক হলে দক্ষতা ধরা হয় খুবই কম। দুই হলে কম, তিন হলে গড় বা মধ্যম, চার হলে ভালো, পাঁচ হলে খুবই ভালো।
গবেষণায় দেখা যায়, লাইফ সাপোর্টে দক্ষতার স্কোর ২.৬৯, জরুরি ফার্মাকোলজিতে ২.৮১, ওষুধ ব্যবস্থাপনায় ২.৭৫, ব্যবস্থাপত্র লেখায় ২.৮২, কার্ডিয়াক মনিটরিংয়ে ২.৬৮ এবং কার্ডিওপালমোনারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র ২.৩৩।
মৌলিক বিষয়ে শিক্ষক সংকট ভয়াবহ : স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে মৌলিক ও ক্লিনিক্যাল বিষয়ে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ সাত হাজার ৩৬টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে তিন হাজার ৫২টি পদ। অর্থাৎ মোট পদের প্রায় ৪৩ শতাংশই খালি। আটটি মৌলিক বিষয়ে ২৫ শতাংশ এবং ক্লিনিক্যাল বিষয়ে ৪৮ শতাংশ শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ফরেনসিক মেডিসিনে অধ্যাপক রয়েছেন মাত্র একজন। তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত।
মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে অধ্যাপক পদের ৭২.৭২ শতাংশ, সহযোগী অধ্যাপক পদের ৫১.৬৯ শতাংশ এবং সহকারী অধ্যাপক পদের ২৯ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে।
মেডিক্যাল শিক্ষার আটটি মৌলিক বিষয় হলো অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যা, শারীরবৃত্ত, প্রাণরসায়ন, কমিউনিটি মেডিসিন, ওষুধবিজ্ঞান, চিকিৎসা আইন (ফরেনসিক), রোগবিদ্যা ও অণুজীববিজ্ঞান।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক ডা. মো. মাছুদুর রহমান বলেন, চিকিৎসকদের মধ্যে একাডেমিক পেশার প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। বেশির ভাগই ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে যেতে চান।
তিনি জানান, ২০৪০ সাল পর্যন্ত কোন বিষয়ে কত চিকিৎসক প্রয়োজন হবে, সে বিষয়ে প্রজেকশন তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া সাত হাজার চিকিৎসককে সুপারনিউমারি পদোন্নতি দেওয়া হলেও অনেককে প্রয়োজনীয় স্থানে পদায়ন করা যাচ্ছে না। কারণ অনেকেই ঢাকার বাইরে যেতে অনাগ্রহী।
তিনি আরো বলেন, অনেক মেডিক্যাল কলেজে আধুনিক সিমুলেশন টেবিল, উন্নত মাইক্রোস্কোপ, পোস্টমর্টেম সুবিধা কিংবা পর্যাপ্ত মৃতদেহের মতো মৌলিক শিক্ষাসামগ্রীরও ঘাটতি রয়েছে। ফলে হাতে-কলমে শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
সংকটের মধ্যেই নতুন মেডিক্যাল কলেজ : শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটের মধ্যেও বর্তমান মেয়াদে ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদীতে দুটি নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ফলে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৯টিতে।
শুধু তাই নয়, শেরপুর, লক্ষ্মীপুর, নাটোর, ভোলা, জয়পুরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ আরো কয়েকটি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব মূল্যায়নাধীন রয়েছে। জয়পুরহাট ছাড়া বাকি সব প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর-ডিজিএমই সূত্র জানায়, তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তাঁর নিজ জেলা লক্ষ্মীপুরে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর লক্ষ্মীপুরের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিও এ বিষয়ে তৎপরতা চালান।
একইভাবে নাটোর মেডিক্যাল কলেজের প্রস্তাবের পেছনে ছিলেন সাবেক স্বাস্থ্যসচিব সাইদুর রহমান, যিনি নাটোরের বাসিন্দা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিক্যাল কলেজের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। পরে জেলার নতুন সংসদ সদস্যরাও এ প্রস্তাবকে সমর্থন দেন।
অন্যদিকে জয়পুরহাট মেডিক্যাল কলেজের প্রস্তাবের পেছনে রয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী। বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই একমাত্র নতুন প্রস্তাব। নরসিংদী, শেরপুর ও ভোলার প্রস্তাব এসেছে স্থানীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। এর মধ্যে নরসিংদী বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজ জেলা।
ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিক্যাল কলেজের জন্য স্থানীয় একটি সংগঠন আবেদন করেছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্যোগের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মির্জা ফখরুল বলেন, মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নিতে একটি শক্তিশালী টিম কাজ করছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।
ঠাকুরগাঁও বিএনপি মহাসচিবের নিজ জেলা হওয়ায় এটি রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদিত হয়েছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এখানে কোনো রাজনৈতিক যোগসূত্র নেই। ঠাকুরগাঁও দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত এলাকা, সেই দিকগুলো বিবেচনা করেই এই মেডিক্যাল কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ২০টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে আরো এক হাজার ৩০টি আসন বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক, অবকাঠামো ও ল্যাব সুবিধা ছাড়াই আসন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১৪টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ৩৫৫টি আসন কমিয়ে দেয়। তাদের যুক্তি ছিল, শিক্ষার মান বজায় রাখতে শিক্ষার্থীসংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে। বর্তমানে দেশে ৩৮টি সরকারি ও ৭২টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি বছর প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।
সরকারের পরিকল্পনা কী? : স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, সরকার চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছে। বর্তমানে ১৯টি ছাত্রাবাস নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। পুরনো মেডিক্যাল কলেজগুলোর অবকাঠামো সংস্কার এবং নতুন কলেজগুলোর নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষক সংকট দূর করতে পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রণোদনা কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তাঁর ভাষায়, ‘বাংলাদেশের মেডিক্যাল শিক্ষা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। তবে আমরা পরিবর্তনের জন্য কাজ করছি। খুব শিগগিরই দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।’