Image description

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খামখেয়ালি ও দায়িত্বে চরম অবহেলার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের। প্লট বরাদ্দ, হস্তান্তর কিংবা চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি দলিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিতে মৌজা, দাগ ও প্লট নম্বর ভুলের ঘটনা এখন নিত্যদিনের চিত্র। রাজউকের নিজস্ব ভুলের কারণে তৈরি হওয়া এ জটিলতা সংশোধন করতে গিয়ে হাজার হাজার গ্রাহককে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। মাত্র এক লাইনের একটি ভুল সংশোধনের জন্য ফাইল ঘুরছে মাসের পর মাস। এর ওপর সংশোধনী দলিল বা ‘ভ্রম সংশোধন’ করতে গিয়ে নাগরিকদের পকেট থেকে অন্যায়ভাবে খসে যাচ্ছে হাজার থেকে লাখ টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজউকের উত্তরা, পূর্বাচল, ঝিলমিলসহ বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের শত শত গ্রাহক এ মৌজা ভুলের শিকার। জমি বা প্লট হস্তান্তরের সময় নথিপত্রে যে মৌজা বা খতিয়ান উল্লেখ করা হচ্ছে, পরে দেখা যাচ্ছে সিএস, আরএস বা বিএস রেকর্ডের সঙ্গে তার মিল নেই। অনেক ক্ষেত্রে এক জোনের মৌজা অন্য জোনের দলিলের ভিতর ঢুকে পড়েছে। রাজউকের এ প্রশাসনিক ভুলের খড়্গ এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। নিয়মানুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভুলের দায় সেই প্রতিষ্ঠানেরই নেওয়া উচিত এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তা দ্রুত সংশোধন করে দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টো চিত্র।

ভুক্তভোগীরা জানান, দলিলের মৌজা ভুল ধরা পড়ার পর তা সংশোধনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি। প্রথমে রাজউকের সংশ্লিষ্ট জোনের পরিচালকের কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করতে হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি ফাইল চালাচালি। সার্ভেয়ারের পরিদর্শন, মূল রেকর্ড বা নকশা যাচাই এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ফাইল টেবিলে টেবিলে ঘোরে। এ দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে অনেক গ্রাহককে বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে, যেখানে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। চূড়ান্ত ভোগান্তি তৈরি হয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে। রাজউক থেকে সংশোধিত বরাদ্দপত্র বা অনাপত্তি পাওয়ার পর নতুন করে ‘ভ্রম সংশোধন দলিল’ সম্পাদন করতে হয়। এ সংশোধনী দলিলের জন্য সরকারি নিয়মে পুনরায় স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহককেই। জমির মূল্য বা প্লটের আকারভেদে এ খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় লাখ টাকা। নিজের কোনো ভুল না থাকা সত্ত্বেও রাজউকের গাফিলতির খেসারত হিসেবে এ টাকা নাগরিকদের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক বলে মনে করছেন গ্রাহকরা।

মৌজার এ ভুলের কারণে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়ছেন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। জমির কাগজপত্রে ভুল থাকায় তারা যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে জমির নামজারি করাতে পারছেন না। নামজারি না হওয়ায় থমকে আছে হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের প্রক্রিয়াও। সবচেয়ে বড় বিপত্তি ঘটছে বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে। দলিলের মৌজা ও দাগ নম্বরে গরমিল থাকায় রাজউক নিজেই ইমারত নির্মাণ নকশা বা প্ল্যান অনুমোদন দিচ্ছে না। আবার অনেকে বাড়ি তৈরির জন্য ব্যাংক থেকে গৃহঋণ নিতে পারছেন না, কারণ ব্যাংকের আইনি দল জমির ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে। পূর্বাচল প্রকল্পের ৫ নম্বর সেক্টরের এক ভুক্তভোগী প্লট মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাজউক থেকে প্লট বরাদ্দ নিয়ে সব টাকা নিয়মমতো পরিশোধ করেছি। কিন্তু এখন বিডিএস জরিপের সময় জানতে পারলাম আমার দলিলে মৌজার নাম ভুল লেখা হয়েছে। রাজউকের এ ভুলের কারণে আমার নামজারি বাতিল হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ ভুল সংশোধনের জন্য রাজউকে আবেদন করতে গেলে পদে পদে হয়রানি হতে হচ্ছে।

সরকারি অফিসের ভুলের দণ্ড কেন আমাদের টাকা দিয়ে আর ভোগান্তি দিয়ে মেটাতে হবে?’ এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এটা আগের ভুল। যারা এ কাজটি করেছে তারা ঠিক করেনি। তবে মানুষের কিছুটা ভোগান্তি ও টাকা খরচ হলেও দলিল সংশোধন করা সবচেয়ে উত্তম। আমি নির্দেশ দিয়েছি, এ রকম বিষয়ে যারা আবেদন করবে ১৫ দিনের মধ্যে সমাধান করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছি গেজেট আকারে প্রকাশ করার জন্য। কিন্তু আলোচনা করে গেজেট বিষয়টা বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ, গেজেট করলে সমস্যার সমাধান হবে না। কেনাবেচা করতে গেলে সে সময় মানুষ গেজেট দেখবে না। তখন ভোগান্তি থেকেই যাবে। সুতরাং একটু কষ্ট হলেও সংশোধন করাই ভালো।’