আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করাই সোর্সদের মূল কাজ। কিন্তু বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সেই ‘সোর্স’ পরিচয়ধারীদের একটি অংশই এখন অভিযোগের কেন্দ্রে। পুলিশের কতিপয় অসাধু সদস্যের ছত্রছায়ায় তারা গড়ে তুলেছে শক্তিশালী অপরাধচক্র। মাদক ব্যবসা, জুয়ার আসর, মহাসড়কে চাঁদাবাজি, ফুটপাত ও গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ-বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে তাদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। আইনের রক্ষকদের নাম ভাঙিয়ে এসব চক্র এখন নগরবাসীর জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, ‘সোর্স পরিচয়ে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশ সব অপরাধীকেই একই দৃষ্টিতে দেখে। পুলিশের সোর্স পরিচয়ে যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার অধিকাংশ মাদক স্পট কথিত সোর্সদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে আসা ইয়াবা ও আইস (ক্রিস্টাল মেথ) খালাস এবং সরবরাহের ক্ষেত্রেও তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অন্য মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে ‘লাইন বজায়’ রাখার নামে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট থানা বা ফাঁড়ির কিছু অসাধু কর্মকর্তার কাছেও পৌঁছে যায়।
শুধু মাদক নয়, কথিত সোর্সদের নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত জুয়ার আসরও বসছে। ক্লাব কিংবা অস্থায়ী শেডে তাস, ক্যারম বোর্ড থেকে শুরু করে আধুনিক ক্যাসিনো ধাঁচের জুয়ার আয়োজন করা হয়। এসব আসরে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। তল্লাশির নামে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। নগরীর ফুটপাত দখল করে হকার বসানো এবং সেখান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রেও কথিত সোর্সদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি জোনে আলাদা নিয়ন্ত্রক থাকেন এবং হকারদের কাছ থেকে দৈনিক নির্ধারিত হারে টাকা আদায় করা হয়।
এ ছাড়া সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠেছে টোকেন বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের হয়রানি থেকে রক্ষা পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে এসব টোকেন সরবরাহ করা হয়। বিভিন্ন সিএনজি স্ট্যান্ড থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ চালকদের। সিএমপির মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, ‘সাধারণ তথ্যদাতাদের কেউ কেউ নিজেদের সোর্স হিসেবে পরিচয় দিয়ে অপকর্ম করার চেষ্টা করে। এমন তথ্য পাওয়া মাত্রই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন কথিত সোর্সের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।’ সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সোর্সদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। গত ১২ জুন সোনা চোরাচালানবিরোধী তল্লাশির নামে জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানকে মারধর ও হয়রানির অভিযোগ ওঠে এক কথিত সোর্স ও কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। এপ্রিল মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে বাকলিয়া থানার সোর্স পরিচয়ে দুই ব্যক্তিকে ইয়াবা বিক্রি করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
২০২৪ সালের ২১ আগস্ট মাদক পাচারের সময় তিন কথিত সোর্সকে আটক করে লোহাগাড়া থানায় সোপর্দ করে স্থানীয় জনতা। একই বছরের ১৯ মে এক প্রবাসীর কাছ থেকে ১৭ ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক কথিত সোর্স ও এক পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে এক জুয়াড়ির কাছ থেকে কোটি টাকার ক্রিপ্টোকারেন্সি আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে সোর্সসহ ছয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে।