Image description

সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগে ৩৭টি কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানিতে বোর্ড সদস্য রয়েছেন ৩০৬ জন। আর এ বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যান ও পরিচালকের ১৬৭টি পদেই রয়েছেন বিভিন্ন আমলা। তাদের মধ্যে একই ব্যক্তি রয়েছেন আবার একাধিক বোর্ডে। শুধু তাই নয়, বর্তমান আমলাদের পাশাপাশি অনেক প্রভাবশালী সাবেক আমলাও কোনো কোনো বোর্ডে জায়গা করে নিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব বোর্ডের কোনো কোনো মিটিংয়ে ৫০০ ডলার পর্যন্ত সম্মানি পাওয়া যায়। আর বোর্ড মেম্বাররা বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ির সুবিধাসহ অনেক সুবিধা পান। বিভিন্ন মহলে এখন সমালোচনা হচ্ছে, অভিজ্ঞতা না থাকার পরও একটি নির্দিষ্ট বিশেষায়িত খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন অন্য আরেকটি খাত। সেই সঙ্গে তাদের কাজ নিয়েও স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে।

এ সংক্রান্ত নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অর্ধেক শেয়ার রয়েছে এ কোম্পানিতে। এ সচিব আছেন গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির (জিটিসিএল) বোর্ডেও। তিনি এ কোম্পানির পরিচালক। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেছেন কৃষি সচিব ড. রফিকুল ইসলাম মোহামেদ। তিনি উপসচিব থাকাকালে বগুড়ার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ছিলেন। বর্তমানে অবসরকালীন ছুটি কাটানোর কথা থাকলেও সরকার ছুটি বাতিল করে তাকে কৃষি সচিব হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি আবার নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের (নেসকো) চেয়ারম্যানও এবং নেসকোর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাফেয়ার্স কমিটির আহ্বায়ক। অর্থনীতিতে পিএইচডি করা কৃষি সচিব কীভাবে নেসকোর চেয়ারম্যান হলেন কিংবা কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রধান কার্যনির্বাহীর দায়িত্ব পালনের ফাঁকে তিনি নেসকোর কর্মকাণ্ড কীভাবে পরিচালনা করেন, তা নিয়ে মিলছে না অনেক প্রশ্নের উত্তর।

শুধু কানিজ মওলা ও রফিকুল ইসলাম মোহামেদই নন, তাদের মতো বেশ কয়েকজন আমলা দখলে রেখেছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চেয়ারে দায়িত্বে থাকা নাসিমুল গণি দেশের একমাত্র তেল পরিশোধন কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির (ইআরএল) পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকও বিআর পাওয়ার জোন লি. নামের রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। আর জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের কাঁধে রয়েছে চারটি কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। নথি ঘেঁটে দেখা যায়, সাইফুল ইসলাম দেশের সবচেয়ে বড় তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সঙ্গে তিনি নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল), বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি (বিসিপিসিএল) এবং বাংলাদেশ চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানিরও (বিসিআরইসিএল) চেয়ারম্যান।

এ ছাড়াও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম পিডিবির বাইরে বেশ কয়েকটি কোম্পানির পরিচালক। তিনি শুধু বিদ্যুতের নয়, কোনো কোনো জ্বালানি কম্পানিরও বোর্ড মেম্বার। তিনি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি), আশুগঞ্জ পাওয়ার, এনডব্লিউপিজিসিএল, বিসিপিসিএল, কোল পাওয়ার জেনারেশন (সিপিজিসিএল), বাংলাদেশ ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল), তিতাস, বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানিরও পরিচালক। বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজকে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করা হলেও তিনি এখনো রয়েছেন পিজিসিবি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, এলপিজিএল, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কোম্পানির বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদে। কম যান না পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান। জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব থাকার সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন বোর্ডে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও পিডিবির চেয়ারম্যানের মতো তিনি বিদ্যুৎ কোম্পানির কোনো বোর্ডে নেই। এরপরও তিনি বাপেক্স, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি (পিজিসিএল), জিটিসিএল, বাখরাবাদ এবং কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বোর্ডে রয়েছেন।

বিদ্যুতের ১৫ কোম্পানি : বিদ্যুৎ বিভাগে মোট ১৫টি কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানির চারটি যৌথ উদ্যোগে ভারত এবং চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানির সঙ্গে গঠন করা হয়েছে। এসব কোম্পানিতে ১৩৬ জন বোর্ড সদস্যের ৫৮ জনই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। সচিব থেকে সিনিয়র সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন প্রত্যেকটি বোর্ডে। পিজিসিবিতে চারজন, আশুগঞ্জে চারজন, ইজিসিবিতে চারজন, এনডব্লিউপিজিসিএলে ছয়জন, বি-আর পাওয়ার জোনে পাঁচজন, কোল পাওয়ারে পাঁচজন, বিআইএফপিসিএলে দুজন, ওয়েস্ট জোনে চারজন, ডেসকোতে ছয়জন, ডিপিডিসিতে সাতজন, নেসকোতে ছয়জন, বিসিপিসিএলে একজন, বিসিআরইসিএলে দুজন, আরপিসিএলে একজন এবং আরএনপিএলে একজন আমলা রয়েছেন।

পেট্রোবাংলার ১৪ কোম্পানি : পেট্রোবাংলার ১৪ কোম্পানিতে ১০৮ বোর্ড সদস্যের ৭০ জনই আমলা। পেট্রোবাংলায় দুজন, তিতাসে পাঁচজন, পিজিসিএলে পাঁচজন, সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে ছয়জন, বাখরাবাদে চারজন, কর্ণফুলীতে সাতজন, বাপেক্সে পাঁচজন, বিজিএফসিএলে সাতজন, সিলেট গ্যাস ফিল্ডে চারজন, জিটিসিএলে সাতজন, জালালাবাদে ছয়জন, আরপিজিসিএলে পাঁচজন, মধ্যপাড়া কঠিন শিলায় তিনজন এবং বড়পুকুরিয়ায় চারজন।

বিপিসির আট কোম্পানি : বিপিসির আট কোম্পানির বোর্ড সদস্য ৬২ জনের ৩৯ জনই আমলা। কেউ কেউ সাবেক আমলা। ইআরএলে পাঁচজন, পদ্মা অয়েলে সাতজন, মেঘনায় পাঁচজন, যমুনাতে তিনজন, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টে পাঁচজন, এলপিজিএলে সাতজন, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিকে দুজন এবং পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানিতে পাঁচজন আমলা রয়েছেন।

বোর্ডে মধু : বিভিন্ন কোম্পানির কোনো কোনো বোর্ড মিটিংয়ে ৫০০ ডলার পর্যন্ত সম্মানি দেওয়া হয়। তবে বেশির ভাগ বোর্ডে সম্মানি ৬ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। মাসে কোনো বোর্ডে চারটি পর্যন্ত মিটিং হয়। এ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ির সুবিধাসহ বৈধভাবে বোর্ড মেম্বাররা অনেক সুবিধা পান। এ ছাড়া অনেকে কোম্পানি থেকে নানা সুবিধা নিয়ে থাকেন। কোম্পানির কেনাকাটা, প্রকল্প বাস্তবায়ন সব কাজেই বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। সঙ্গত কারণে বোর্ড মেম্বারদের ক্ষমতা দেখানো বা আয়ের অনেক সুযোগ রয়েছে।

কোম্পানি বাইরের মিটিং করতে হয় ঢাকায় : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের অনেকগুলো কোম্পানির প্রধান কার্যালয় ঢাকার বাইরে। বোর্ড মিটিং করতে ঢাকায় আসতে হয় কর্মকর্তাদের। কারণ প্রভাবশালী আমলারা বেশির ভাগ ঢাকাতেই থাকেন। ঢাকার বাইরের বোর্ড মেম্বারদেরও ঢাকায় আসতে হয়। আর তারা ঢাকায় না আসতে পারলে অনলাইনে রেখেই বৈঠক সারা হয়।

কোম্পানির কর্মকর্তারা বোর্ডে উপেক্ষিত : কোম্পানিগুলোতে যেসব কর্মকর্তা চাকরি করেন তাদের মধ্যে শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালককেই বোর্ডে রাখা হয়। যদিও একটি বা দুটি কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা গেছে। তবে কোম্পানির আর কাউকে বোর্ডে রাখা হয় না। অর্থাৎ ব্যবসা একজনের চালান অন্যরা।

কোম্পানির কর্মকর্তারা যা বলছেন : কোম্পানির বোর্ডের বিষয়ে সরাসরি কোনো কোম্পানির কর্মকর্তা কথা বলতে সম্মত হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আমলা নিয়ে বোর্ড গঠন করা হয়। এখন মন্ত্রণালয়ে এমন বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কথা বলতে গেলে বলা হয়, উনি বিদ্যুৎ-জ্বালানির কী বোঝেন! বোর্ডগুলো দ্রুত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও পারে না। পেশাজীবীর বদলে কর্মকর্তাকেন্দ্রিক হওয়ায় অনেক প্রস্তাব উত্থাপনের পর বলা হয়, ‘এটা পরে ওঠান।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘ওসির কাজ তো ডিসিকে দিয়ে হয় না। আমলাদের কাজ ব্যবসা করা নয়। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে।’ বোর্ডগুলো ভেঙে করপোরেট ধারায় গড়ে তোলা উচিত বলে তিনি মনে করেন।