Image description

দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। এক যুগের ব্যবধানে বেড়েছে ৬০টি। বাড়েনি শিক্ষার মান। পাবলিক ও প্রাইভেট মিলে ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রতি বছরই পিছিয়ে পড়ছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হচ্ছে না পর্যাপ্ত গবেষণাও। তদবির ও বাণিজ্যের মাধ্যমে নিয়োগ পাচ্ছেন বেশির ভাগ শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই প্রয়োজনীয় গবেষণা বরাদ্দও। চাকরির বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে পাঠদানের যথেষ্ট সুযোগ না থাকায় ভালো করতে পারছেন না উত্তীর্ণ গ্র্যাজুয়েটরা। বিদেশি শিক্ষার্থীরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তাদের সংখ্যা প্রতি বছরই কমছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেও মানসম্মত পাঠদানে সেগুলো কাজ করছে না। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নেওয়ার পর কোনো কোনোটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

তথ্যমতে, ২০১৪ সালে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১১৫টি (পাবলিক ৩৫ ও প্রাইভেট ৮০)। চলতি ২০২৬ সালে এ সংখ্যা ১৭৫টি (পাবলিক ৫৯ ও প্রাইভেট ১১৬)। এক যুগের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে ৬০টি। জানা গেছে, আরও নতুন প্রায় দুই ডজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন জমা পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এর মধ্যে এক ডজনের বেশি আবেদন যাচাইবাছাই করতে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি)।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে র‌্যাঙ্কিং প্রকাশ করেছে। এই র‌্যাঙ্কিংয়ে গতবারের চেয়েও পিছিয়ে গেছে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এবারের র‌্যাঙ্কিংয়ে বিভিন্ন দেশের ১ হাজার ৫০৪টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেলেও এ দেশের মাত্র ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। শীর্ষ ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান পেয়েছে মাত্র ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়। গড় ১০০ স্কোরের মধ্যে মাত্র ২৮ দশমিক ৩ স্কোর নিয়ে ৬০০তম স্থান পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের অবস্থান ৭১১ থেকে নেমে ৭২০তম। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয় এবার স্থান করে নিয়েছে শীর্ষ ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। শীর্ষ ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মালয়েশিয়ার রয়েছে ২৫টি। পাকিস্তানের ১১টি। গত বছরের র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ৫৮৪তম। স্কোর ছিল ২৮ দশমিক ৭। এবার র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৬ ধাপ পিছিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২৫ সালের কিউএস র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ৫৫৪তম। গত কয়েক বছরের চিত্রে দেখা গেছে- এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছরই পিছিয়ে গেছে। দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তেমন কোনো অবস্থান করে নিতে পারেনি। দেশে ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও শুধু নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করতে পেরেছে (অবস্থান ৯০১ থেকে ৯৫০ এর মধ্যে)। 

১০টি সূচকে ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংস ২০২৬ : টপ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিস’ এ র‌্যাঙ্কিং করে থাকে প্রতি বছর। প্রতিটি সূচকে ১০০ করে স্কোর নির্ধারিত থাকে। সূচকগুলো হলে- গবেষণা ও আবিষ্কার, শিখন অভিজ্ঞতা, কর্মসংস্থান, বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা, স্থায়িত্ব, ইন্টারন্যাশনাল ফি, স্কলারশিপ, স্টুন্ডেট মিক্স, ইংলিশ টেস্ট এবং একাডেমিক টেস্ট। অর্থাৎ এসব সূচকে আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

‘টাইমস হায়ার এডুকেশনের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং-২০২৬’ এ শীর্ষ ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিতে পেরেছে মাত্র পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গড় স্কোর ৩৫ দশমিক ৫ থেকে ৩৮ দশমিক ৯-এর মধ্যে। শুধু এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে টাইমস হায়ার এডুকেশনের ‘এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং’-এ এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শীর্ষ ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিতে পারেনি।

গত বছর প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন ও পুনর্নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ আহরণ’ বিষয়ক টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতি ১০০ জন বেকারের মধ্যে ২৮ জনই উচ্চশিক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাকরির বাজারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পড়াশোনার তেমন সুযোগ নেই। ফলে শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন পাঠ্যক্রমের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্নাতক বেকার থাকছেন। ইউজিসির সর্বশেষ (৫০তম) বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশের ৮৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে ব্যয় হয়েছে গড়ে মাত্র ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও বৈদেশিক স্কলারশিপ খাতের জন্য ইউজিসির মূল বাজেটে মাত্র ২৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার মান, গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকায় আন্তর্জাতিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে- যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন র‌্যাঙ্কিংয়ে। ইউজিসির সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে মাত্র ৬৩৩ জন। ২০১৮ সালে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল ৮০৪ জন। ২০২০ সালে ছিল ৭৬৭ জন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছে ৮২৬ জন। ২০১৬ সালে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল ১৯২৭ জন, ২০১৭ সালে ছিল ১৯৭৭ জন। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমছে আশঙ্কাজনকহারে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এক যুগের বেশি সময়ে সংখ্যার বিচারে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে। মানসম্মত পাঠদানের ক্ষেত্রে সেগুলো যথাযথভাবে কাজ করছে না। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নেওয়ার পর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা সেগুলোতে শিক্ষা ব্যবসার দিকেই নজর দিচ্ছেন বেশি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক নেই। মানসম্মত গবেষণাও নেই। গবেষণায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দও নেই। যদিও ইউজিসির সহযোগিতায় এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভালো গবেষণা হচ্ছে।

এ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হতে যারা তদবির করবেন তাদের প্রথমেই বাদ দিতে হবে। অথচ এখন অনেকেই তদবির করে উপাচার্য হয়ে যাচ্ছেন। যারা প্রকৃত অর্থে যোগ্য শিক্ষা ব্যক্তিত্ব তাদের উপাচার্য হতে অফার দিতে হবে।

ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, যিনি উপাচার্য হবেন তার রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু উপাচার্য হওয়ার পর তাকে নিরপেক্ষভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হবে।