Image description
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শুরু

চীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক সফর শুরু হয়েছে। সফরের শুরুতেই বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে নেতৃত্বের আসনে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তিনি। দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সামার দাভোস সম্মেলনে বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা, পানি নিরাপত্তা, সবুজ জ্বালানি ও পরিবেশ সুরক্ষাবিষয়ক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়, এটি দেশের সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। একই সঙ্গে দালিয়ান পর্ব শেষে বেইজিংয়ে শুরু হতে যাওয়া দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন সহযোগিতা জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনের বক্তব্যে গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু সংকটের সম্মুখসারির একটি দেশ হলেও কেবল ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হতে চায় না। বরং সহনশীলতা, উদ্ভাবন এবং বাস্তবভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চায়। ফোরামে বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন করা হবে। এর মাধ্যমে পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত হবে। একই সঙ্গে জলনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এবং উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়নের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গঠনের রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ করা হবে। ‘এক শিক্ষার্থী, এক গাছ’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে বনভূমি সমপ্রসারণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, গ্রীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাপমাত্রা হ্রাসে কাজ করবে সরকার।

তারেক রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌর ও বায়ুশক্তি, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা এবং সবুজ শিল্পায়নের ওপরও জোর দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাটশিল্প ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের মতো পরিবেশবান্ধব খাতকে উৎসাহিত করা হবে। সবুজ বিনিয়োগ ও কার্বন ক্রেডিট বাজার সমপ্রসারণে একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগও নেয়া হবে। পাশাপাশি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার এবং বৃত্তাকার অর্থনীতির মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্বেগের বিষয়টিও সামনে আনেন। তিনি ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড) দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নকে আরও সহজলভ্য, স্বল্পসুদভিত্তিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, অভিযোজন এবং প্রশমন- দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য অভিযোজন কোনো বিকল্প নয়। এটা প্রয়োজনীয়তা। এ লক্ষ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।

আনুষ্ঠানিক সফর শুরু আজ: এদিকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোসে অংশগ্রহণ শেষে আজ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক চীন সফর শুরু হচ্ছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে দালিয়ান থেকে বেইজিংয়ে গিয়ে দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা সোমবার রাতে চীনের দালিয়ানে পৌঁছান। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মধ্যদিয়ে হোটেলে নিয়ে যান চীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা।

মাহদী আমিন জানান, সামার দাভোসে অংশ নেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বৈশ্বিক ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একাধিক বৈঠক ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলোইস জুইংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। সেখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, গতকাল সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সস্ত্রীক অংশ নেন। এ নৈশভোজে দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান, মন্টিনিগ্রো ও গিনিসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানরাও উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরে এ ধরনের আয়োজনে নেতাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ও পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তিনি জানান, বুধবার সকালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এর উদ্বোধনী কার্যক্রমে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

সম্মেলনের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
মুখপাত্র জানান, বুধবার দুপুরে দালিয়ান থেকে উচ্চগতির ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। বেইজিংয়ে পৌঁছে শুরু হবে সফরের দ্বিপক্ষীয় পর্ব। সেখানে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহযোগিতা এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে এবারের সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অংশীদারিত্বের বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। মাহ?দী আমিনের ভাষ্য, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরছেন। তার এই সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে সরকার আশা করছে।