ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের জোরপূর্বক পুশইনের অপচেষ্টা রুখে দিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দেশের এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্যেও সীমান্তজুড়ে থেমে নেই ভারতীয় চোরাই মোবাইল ফোনের রমরমা কারবার।
পুরো জেলাজুড়ে থাকা প্রায় ১৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের সুরক্ষায় দিনরাত পাহারায় আছেন বিজিবির ১৬, ৫৩ এবং ৫৯ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। বিএসএফের সাম্প্রতিক নানা তৎপরতার কারণে সীমান্তে এখন কড়া পাহারা বলয় তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু চোরাকারবারিরা বিজিবির এই কড়া পাহারা ও চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে সীমান্ত দিয়ে অবাধে দেশে ঢোকাচ্ছে ভারতীয় চোরাই, ব্যবহৃত এবং রিফারবিশড হ্যান্ডসেটের চালান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার সীমান্ত এলাকাগুলোই এখন এই অবৈধ কারবারের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছে। ওপার থেকে আসা এসব চোরাই ফোন পরবর্তীতে সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন বাজারে।
মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সীমান্ত পার হয়ে আসা এসব চোরাই ফোন মূলত বিক্রি করা হচ্ছে শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট বাজার, শিবগঞ্জ পৌর বাজার, সাহাপাড়া, মনাকষা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর এবং শহরের নিউ মার্কেট এলাকায়।
এসব বাজারের কিছু অসাধু কারবারি বৈধ মোবাইল ব্যবসার আড়ালে অত্যন্ত গোপনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এরা ভারতীয় নন-রেজিস্ট্রার্ড ফোনগুলো দোকানে সরাসরি প্রদর্শন করে না, বরং বিশ্বস্ত চেনা-পরিচিত লোক ও নিজস্ব ‘ক্যারিয়ার’ চক্রের মাধ্যমে এই কেনাবেচা চালায়।
শুধু বড় বাজারই নয়, সীমান্ত এলাকার ছোট ছোট মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানগুলোও এখন এই চক্রের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এসব দোকানে ক্রেতারা পছন্দের মডেলের কথা বলে অর্ডার দিলেই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ওপার থেকে আনা চোরাই ফোন ক্রেতার হাতে এনে হাজির করা হয়। সরকারি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা এই ফোনগুলোর দাম আসল ফোনের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারাও না বুঝে এগুলো কিনছেন।
কয়েকজন ভারতীয় চোরাই মোবাইল কারবারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্ত পার করে আনা এসব চোরাই ফোনের হাতবদল ও কেনাবেচা এতই নিখুঁত নেটওয়ার্কে চলে যে, এদের ধরা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় বিজিবি বা স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন বাজারে আকস্মিক অভিযান চালাতে গেলেও চোরাকারবারিরা তাদের নিজস্ব ‘গোপন সূত্রের’ মাধ্যমে সেই খবর আগেই পেয়ে যায়।
অভিযানের আগাম বার্তা পাওয়া মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে সিন্ডিকেটের সদস্যরা দোকানে তালা লাগিয়ে চোরাই হ্যান্ডসেটগুলো নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে ফেলে বাজার থেকে চম্পট দেয়। ফলে অনেক সময়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খালি হাতে ফিরতে হয় এবং বড় কোনো সিন্ডিকেটকে হাতেনাতে ধরা সম্ভব হয় না। এই শক্তিশালী ও চতুর ইনফর্মার নেটওয়ার্কের কারণে স্থানীয় বাজারগুলোতে এই অবৈধ ব্যবসা দিন দিন আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে।
কেবল অফলাইন বা বাজারের নির্দিষ্ট দোকানেই নয়, চোরাকারবারিরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই চোরাই ফোনের কারবার চালাচ্ছে দেদারসে। ফেসবুক পেজ, বিভিন্ন বাই-সেল গ্রুপ এবং মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে অত্যন্ত সুকৌশলে ভারতীয় এসব নন রেজিস্ট্রার্ড ও চোরাই ফোনের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।
অনলাইনে কম দামে চকচকে আইফোন কিংবা নামী ব্র্যান্ডের ওয়ানপ্লাস, স্যামসাং ফোন দেখে ক্রেতারা সহজেই প্রলুব্ধ হচ্ছেন। প্রশাসনের সরাসরি নজরদারি এড়াতে এসব চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুকিং নিয়ে সরাসরি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে কিংবা শহরের কোনো নির্জন স্থানে গোপনে ক্রেতার হাতে ফোন পৌঁছে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও একটি অবাক করা তথ্য মিলেছে। এই অবৈধ ও চোরাই ফোনের বাজার কতটা শক্তিশালী তা বোঝা যায় যখন খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যকেও এসব ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়। অনেক সময় কম দামে পাওয়া ভারতীয় এসব নন-রেজিস্ট্রার্ড হ্যান্ডসেট বিভিন্ন মহলের হাতবদল হয়ে খোদ মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্যের এই চোরাই ফোন ব্যবহারের কারণে স্থানীয় সিন্ডিকেটগুলো আরও বেশি সাহস পাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা একধরনের ‘পরোক্ষ সুরক্ষা’ উপভোগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে সস্তায় এসব ভারতীয় ফোন কিনে চরম প্রতারণা ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। কানসাট বাজার থেকে কম দামে একটি ভারতীয় রিফারবিশড ফোন কিনে ঠকেছেন শিবগঞ্জের মনাকষা এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, অফিশিয়াল ফোনের দামের চেয়ে প্রায় সাত হাজার টাকা কম পেয়ে পরিচিত এক সার্ভিসিং দোকানদারের মাধ্যমে একটি ভারতীয় ফোন কিনেছিলেন। কিন্তু ব্যবহারের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ফোনটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। মেকানিক দেখানোর পর জানতে পারলেন, এর ভেতরের মাদারবোর্ড ও ব্যাটারি নকল এবং জোড়াতালি দেওয়া। কোনো অফিশিয়াল ওয়ারেন্টি না থাকায় এখন তার পুরো টাকাটাই লস।
একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানান শিবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, কম দামে ভালো কনফিগারেশনের ফোন পেয়ে শিবগঞ্জ বাজারের একটি চক্রের কাছ থেকে ওপার থেকে আনা একটি হ্যান্ডসেট কিনেছিলাম। কেনার এক মাস পর হঠাৎ করে ফোনের নেটওয়ার্ক চলে যায় এবং আইএমইআই লক হয়ে যায়। এখন জানতে পেরেছেন ফোনটি চোরাই এবং কোনো সিমই আর এতে কাজ করবে না। কম দামে কিনতে গিয়ে তিনি এখন পুরোপুরি প্রতারিত হয়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবিস ব্যাটালিয়নের সদস্যরা গত ২৩ এপ্রিল দিবাগত রাতে মাসুদপুর সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ৮৮টি ভারতীয় মোবাইল ফোন জব্দ করে। জব্দ করা এসব ফোনের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৮ লাখ টাকা, পরে যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুল্ক কার্যালয়ে জমা করা হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এই ব্যটালিয়নের সদস্যরা ১১০টি মোবাইল ফোন জব্দ করেছে। অন্যদিকে, ৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা মাত্র তিন মাসে সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৪০টি চোরাই মোবাইল ফোন জব্দ করেছে।
সর্বশেষ গত ১০ জুন রাতেও সোনামসজিদ সীমান্ত বিওপির আওতাধীন বালিয়াদিঘী গ্রামে অভিযান চালিয়ে ৯টি ভারতীয় ফোন এবং একটি মোটরসাইকেলসহ সালাউদ্দিন নামে এক চোরাকারবারিকে হাতেনাতে আটক করে বিজিবি।
তবে স্থানীয়দের মতে, সীমান্ত গলে যে পরিমাণ ফোন বাজারে ঢুকছে, সেই তুলনায় জব্দ হওয়া চালানের সংখ্যা অনেকটাই কম। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে অপরাধীদের আইনি ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে আসা। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দেওয়া এই চক্রের মূল হোতা ও অনেক মোবাইল কারবারি বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। কিন্তু আইনি দুর্বলতা বা জামিনযোগ্য ধারা হওয়ার সুযোগে তারা খুব দ্রুতই আবার কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন। কারাগার থেকে বের হয়েই আবারও পুরোনো সেই সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ছেন এবং একই চোরাই কারবার শুরু করছেন।
সীমান্তে চোরাচালান বিরোধী কঠোর অবস্থানের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধ করাসহ বাংলাদেশ সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে বিজিবি সব সময় তৎপর রয়েছে ও নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়া বর্তমানে চোরাচালান প্রতিরোধে ৫৩ বিজিবি সীমান্ত এলাকায় ও নদীপথে অতিরিক্ত বিশেষ টহল, চেকপোস্ট পরিচালনা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।
অন্যদিকে ৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিজিবি সকল প্রকার চোরাচালান ও অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষায় এ ধরনের কঠোর অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।