পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে গুমের ঘটনার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা মানবাধিকারকর্মী মাহরাং বেলুচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ২০২৪ সালের এক সমাবেশে আধাসামরিক বাহিনীর একজন সদস্য হত্যার মামলায় দেওয়া হয়েছে এ আদেশ।
বেলুচিস্তান ইউনিটি কমিটির (বিওয়াইসি) নেতা মাহরাং বেলুচ এবং তার সহকর্মী কর্মী সিবঘাতুল্লাহকে হত্যা ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে করা হয়েছে দোষী সাব্যস্ত।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, তারা এমন একটি জনতাকে উসকে দিয়েছিলেন, যারা আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য শাব্বির আহমদকে প্রাণঘাতীভাবে আক্রমণ করে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিচার বর্জন করা দুই কর্মী এবং তাদের আইনজীবীরা।
এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বন্দরনগরী গওয়াদারের ওই সমাবেশে মাহরাং বেলুচ ‘অত্যন্ত উসকানিমূলক বক্তব্য’ দিয়েছিলেন। এর ফলে ৩০ থেকে ৪০ জন বিক্ষোভকারী লাঠি ও পাথর দিয়ে তার বাহিনীর একটি গাড়িতে হামলা চালায়।
ওই কর্মকর্তার দাবি, শাব্বির আহমদ সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং পরে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তাকে।
কোয়েটার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত রায়ে বলেছে, মাহরাং বেলুচ ও সিবঘাতুল্লাহ ‘বেলুচিস্তান ইউনিটি কমিটির অবৈধ সমাবেশে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন’ এবং ফেডারেল কনস্ট্যাবুলারির ওই সদস্য হত্যার ক্ষেত্রে তাদের ‘একই উদ্দেশ্য’ ছিল।
আদালত তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি নিহত শাব্বির আহমদের উত্তরাধিকারীদের ২ লাখ পাকিস্তানি রুপি জরিমানা হিসেবে পরিশোধের নির্দেশ দেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অভিযোগে ইতোমধ্যে দুই বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন মাহরাং বেলুচ ও সিবঘাতুল্লাহ।
এদিকে রায়ের দ্রুত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন।
সংস্থাটি বলেছে, মৌলিক অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে রাষ্ট্র এমন আচরণ করছে, যেন তারা উগ্রপন্থী। এর ফলে প্রশাসনিক ও বিচারিক সিদ্ধান্তগুলো একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠেছে।
মাহরাংয়ের বোন ও আইনজীবী নাদিয়া বেলুচ এবং তাদের আইনজীবী দল দাবি করেছে, ন্যায়বিচারের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে বিচারপ্রক্রিয়ায়।
তাদের অভিযোগ, একটি ‘অদৃশ্য আদালত’ এই রায় দিয়েছে এবং ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের যথাযথভাবে জেরা করার সুযোগও পাননি প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা।
সুইডিশ জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও বিচারপ্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে একে ‘ন্যায়বিচারের প্রহসন’ বলে উল্লেখ করেন এবং অভিযোগ করেন, ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে দেখছে পাকিস্তান সরকার।
তবে বেলুচিস্তান সরকারের এক মুখপাত্র অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, প্রসিকিউশনের হাতে ‘অখণ্ডনীয় প্রমাণ’ ছিল এবং মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়।
২০০৯ সালে তার বাবাকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের পর মাহরাং বেলুচ আন্দোলনে জড়ান। দুই বছর পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যেখানে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল বলে দাবি করা হয়।
২০২৩ সালের শেষ দিকে তিনি শত শত নারীকে নিয়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করে ইসলামাবাদে যান। তাদের দাবি ছিল, নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে বিচার নিশ্চিত করা।
মাহরাংয়ের সংগঠন বিওয়াইসি বেলুচিস্তানে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে প্রচার চালায়। দীর্ঘদিন ধরে অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনের কারণে অঞ্চলটি অস্থির।
পাকিস্তান সরকার বিওয়াইসির বিরুদ্ধে বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ তুললেও তা অস্বীকার করে আসছে সংগঠনটি।