একসময় সাধারণ মানুষের জন্য পাসপোর্ট ছিল সোনার হরিণ। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে পাসপোর্ট করতে আসতে হতো রাজধানী ঢাকায়। পরবর্তীতে বিভাগীয় পর্যায়ে সেবা চালু হলেও ভোগান্তি কমেনি পুরোপুরি। তবে সরকারের পাসপোর্ট সেবা বিকেন্দ্রীকরণ উদ্যোগের ফলে দৃশ্যপট এখন অনেকটাই বদলে গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৬টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস নির্মাণের ফলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে নাগরিক সেবায়।
এখন সেবা গ্রহীতাদের ৯৮ দশমিক ২৯ শতাংশই পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে পারছেন নিজ জেলা থেকে। তাদের মধ্যে বাড়ি থেকে মাত্র ১-৪ কিলোমিটার দূরত্বেই পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছেন ৫৫ দশমিক ২৪ শতাংশ মানুষ। আর মাত্র দুবার অফিসে আসা-যাওয়ার মধ্যেই পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন ৮৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা। ফলে পাসপোর্ট তৈরিতে জনপ্রতি খরচ কমেছে প্রায় ৬০০ টাকা।
বাস্তবাবয়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনের খসড়ায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। আগামী ৩০ জুন চূড়ান্ত করা হবে এ প্রতিবেদন।
সহজে, কম খরচে এবং বিনা দুর্ভোগে পাসপোর্ট পাওয়া নাগরিকদের অধিকার। এই সেবা নিশ্চিতে সরকারের উদ্যোগটি প্রশংনীয়।
মূলত, ২০২১ সালে শেষ হওয়া ‘১৭টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট (সংশোধিত ১৬টি) অফিস নির্মাণ’ প্রকল্প থেকে মিলছে এসব সুবিধা। আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সহজে, কম খরচে এবং বিনা দুর্ভোগে পাসপোর্ট পাওয়া নাগরিকদের অধিকার। এই সেবা নিশ্চিতে সরকারের উদ্যোগটি প্রশংনীয়।’
‘সাধারণত প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা জটিলতার কারণে কাঙ্খিত সুফল নিশ্চিত হয় না। কিন্তু এ প্রকল্পে যেসব সুফলের কথা বলা হয়েছে তা প্রশংসীয়। তবে অফিসগুলোতে সেবা প্রাপ্তি আরও যাতে সহজ এবং দালাল মুক্ত ভাবে হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে’, যোগ করেন তিনি।
প্রকল্প ব্যয় ও সময়কাল
আইএমইডি সূত্র জানায়, পাসপোর্ট সেবা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণকে নিকটতম স্থান থেকে উন্নতমানের পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘১৭টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট (সংশোধিত ১৬টি) অফিস নির্মাণ’ প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। ২০১৬ সালের ৩০ জুন প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক।
এটির মূল ব্যয় ছিল ১০৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তবে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৯৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০১৬ জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। পরে অতিরিক্ত ১২ মাস সময় বৃদ্ধি করে ২০২১ সালে শেষ হয় প্রকল্পের কাজ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করে প্রকল্পটি।
প্রকল্পের অধীনে অফিস স্থাপন করা হয়— ভোলা, বরগুনা, লক্ষীপুর, নারায়নগঞ্জ, জামালপুর, নেত্রকোনা, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওঁগা ও সুনামগঞ্জ জেলায়।
৯৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ সুবিধাভোগীর যাতায়াত ব্যয় ১০০-৪০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়েছে। যেখানে আগে অধিকাংশের ব্যয় এক হাজার টাকার বেশি ছিল।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের বাজেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে দক্ষতা বজায় থাকলেও কিছু খাতে যেমন- অফিস সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ সংযোগ, বনায়ন এবং কিছু ফিনিশিং আইটেমে ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। তবুও সার্বিক বিচারে প্রকল্পটি ব্যয়-দক্ষতার দিক থেকে সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে। মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন এবং সুবিধাভোগীদের জরিপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পটি নাগরিক সেবা সহজলভ্যকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জরিপ অনুযায়ী ৯৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ সুবিধাভোগীর যাতায়াত ব্যয় ১০০-৪০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়েছে। যেখানে আগে অধিকাংশের ব্যয় এক হাজার টাকার বেশি ছিল।
এছাড়া আগে সময়ক্ষেপণ, অতিরিক্ত যাতায়াত ব্যয়, ভিড় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ছিল প্রধান সমস্যা, যা অনেকাংশে কমেছে। বর্তমান সেবার মানকে আগের তুলনায় উন্নত বলে মত দিয়েছেন ৯০ দশমিক ৮৫ শতাংশ সুবিধাভোগী। একই সঙ্গে অপেক্ষা কক্ষ ও বসার ব্যবস্থার মান আগের ১৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯১ দশমিক ৪৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ইতিবাচক প্রতিফলন। তবে দীর্ঘ অপেক্ষা, আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা, ডিজিটাল সিরিয়াল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, কাউন্টারের স্বল্পতা এবং কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সহযোগিতার ঘাটতি আছে এখনও। সার্বিকভাবে, নাগরিক সেবা সহজীকরণ, ব্যয় সাশ্রয়, সেবার মানোন্নয়ন এবং বিদেশগমনের সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে প্রকল্পটি।
সীমাবদ্ধতা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ
প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ ছিল বলে জানিয়েছে আইএমইডি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী একক পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিধান থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়ে মোট ছয়জন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হওয়ায় প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া, কিছু অফিসে অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, সীমিত আরামদায়ক অপেক্ষমাণ কক্ষ এবং ধারণক্ষমতার ঘাটতি দেখা গেছে।
নির্মাণ কাজের মান সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী ও টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার।
অন্যদিকে, অবকাঠামোগত দিক থেকে কিছু ফিনিশিং ত্রুটি, দরজা ও ফিটিংসের মানগত দুর্বলতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নির্মাণ কাজের মান সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী ও টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। এছাড়া মাঠপর্যায়ের কিছু ভবনে ব্যবহৃত উপকরণের মান ও ফিনিশিং সন্তোষজনক নয় বলে উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে।
সুপারিশ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধী, গর্ভবতী নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের সুবিধার্থে প্রতিটি অফিসে র্যাম্প, লিফট এবং বিশেষ সেবা কাউন্টার নিশ্চিত করা দরকার। এছাড়া সেবাগ্রহীতাদের জন্য পর্যাপ্ত ও আরামদায়ক অপেক্ষমাণ কক্ষ, অনলাইন সিরিয়াল ও ডিজিটাল টোকেন ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
এছাড়া, যেসব প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে পরিকল্পনাকে দুই ধাপে ভাগ করা দরকার। প্রথম ধাপে ফিজিবিলিটি স্টাডি, ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা তৈরি, সয়েল টেস্ট সম্পন্ন করা এবং দ্বিতীয় ধাপে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তৈরি হওয়া পাসপোর্ট অফিসে একটি পরামর্শ বক্স স্থাপন করা উচিত। যেখানে সুবিধাভোগীরা তাদের মতামত ও সুপারিশ দিতে পারবেন। সেই সঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা ও মনিটরিং সিস্টেম জোরদার করা প্রয়োজন।