Image description

সারা দেশে লাগামহীন অপরাধে দিশেহারা মানুষ। কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি এবং কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। আগে পুলিশ দেখে অপরাধীরা পালালেও এখন তারা প্রতিনিয়ত আক্রমণ চালাচ্ছে পুলিশের ওপর। মঙ্গলবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা দেশের সামগ্রিক অবস্থার চরম এক উদ্বেগের চিত্র সামনে এনেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন, অপরাধের লাগামহীন অবনতির শেষ কোথায়? বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, দেশের অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পেছনে পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টাও থাকতে পারে।

এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, পদোন্নতি-পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয় বাদ দিয়ে অতীত রেকর্ড, সততা ও দক্ষতাকে একমাত্র মাপকাঠি করতে হবে। আর যারা কৃত্রিমভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে ফায়দা লুটতে চায়, তাদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা শতভাগ নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করা জরুরি।

অপর একজন সাবেক আইজি যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান সরকারের এখন আর একথা বলার সুযোগ নেই যে, আমরা অতীত সরকারের বোঝা বহন করছি। কারণ, ফোকলা অর্থনীতির মতো উদ্বেগজনক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা জেনেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। যেহেতু জনগণের রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, তাই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। বতর্মান পরিস্থিতিতে জনগণ সরকারের কঠোর সমালোচনা না করলেও সব মনের খাতায় লিখে রাখছে। মনে রাখতে হবে, সরকারের হানিমুন পিরিয়ড কিন্তু শেষ। মানুষ যেন একথা বলার সুযোগ না পায় যে, ‘আমরা আগেই ভালো ছিলাম’।

মোহাম্মদপুরের স্থানীয় একজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, দিনের আলোতেই যদি অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীরা ঘুরে বেড়ায়, আর পুলিশের ওপর হামলা করতে দ্বিধা না করে, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? ঘরের বাইরে বের হওয়াই এখন আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশের সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোটা দাগে পাঁচ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না। প্রথমত, বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরেছে বলে পুলিশ মুখে বললেও প্রকৃত অর্থে এখনো চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কেউ কুতর্ক করতে পারে-তবে এটাই বাস্তবতা। দ্বিতীয়ত, ‘আমার পুলিশ’ খুঁজতে গিয়ে সবাই সুযোগ নিচ্ছেন। এটা প্রমাণিত সমস্যা। তৃতীয়ত, পুলিশের বর্তমানে প্রায় ৭০ ভাগই আওয়ামীমনা। এসব জেনেই বর্তমান নেতৃত্ব দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক পুলিশকে কীভাবে হ্যান্ডলিং করা হবে-তার কোনো রোডম্যাপ তৈরি করা হয়নি। চতুর্থত, ওপরের তিনটি সমস্যা সমাধান না হওয়ায় পুলিশে পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। আর চতুর্থ কারণ চলমান থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের একজন সাবেক কর্মকর্তা জানান, সংবেদনশীল ও শীর্ষ পদগুলোতে যোগ্যতার চেয়ে ‘পকেটের লোক’ বা অনুগতদের বসানোর যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র বা ‘অদক্ষ’ কাউকে দায়িত্বশীল পদে পদায়নের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন সৎ ও যোগ্য অনেকে। অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে সার্বিক অবস্থা এখন গোলকধাঁধায়। এছাড়া বিগত জমানার সুবিধাভোগী চক্র এবং পুলিশের একাংশ ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বলে তিনি জানান।

পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, সঠিক জায়গায় সঠিক লোক না থাকার কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিসিএস পুলিশের ২৯তম ব্যাচ থেকে শুরু করে ৪০তম ব্যাচ পর্যন্ত অনেক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার। পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বিপুলসংখ্যক। এদের মধ্যে কিছু সৎ, যোগ্য এবং পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা থাকলেও বেশির ভাগই আওয়ামী ঘরানার। স্বাভাবিকভাবেই তারা দেশের স্থিতিশীলতা চায় না। আবার দলবাজ কর্মকর্তারা পেশাদার কর্মকর্তাদের ‘ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তা’ আখ্যা দিয়ে কোণঠাসা করে রাখছেন। যে কারণে তারা কাজ করতে পারছেন না। একই ভাবে বিগত সময়ে জামায়াত-বিএনপি উল্লেখ করে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, মূল কথা হলো পুলিশের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা গুপ্ত-সুপ্ত প্রতিপক্ষদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

একজন ডিআইজি জানান, পুলিশে এখন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চরমে। অতীতে গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার কারণে যাদের চাকরি চলে যায় বা পদোন্নতি আটকে গিয়েছিল-এমন অনেকেই এখন নিজেদের বঞ্চিত উল্লেখ করে দক্ষ কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ছাত্ররা প্রভাব খাটিয়ে ওসি-এসপি বদলি করেছেন। আর এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওসি-এসপি বদলি হচ্ছে রাজনৈতিক তদবিরে। ইচ্ছা থাকলেও যোগ্যতার ভিত্তিতে ওসি-এসপিসহ মাঠপর্যায়ে জনবল পদায়ন করা যাচ্ছে না। প্রভাব খাটিয়ে পদ পাওয়ায় মাঠপর্যায়ের অনেকেই মানছেন না চেইন অব কমান্ড। তিনি আরও জানান, ‘পকেটের লোক’ হিসাবে পরিচিত কর্মকর্তারা সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার মৌলিক চরিত্র হারিয়ে অনেকটা ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আর অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল ‘বিশ্বস্ততার’ সনদের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারগুলো পূরণ করায় পুলিশি কাজে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের অদক্ষতা।

এক মাসের ভয়াবহ চিত্র : পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ বিশ্লেষণ করে সারা দেশে গত এক মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। এই সময়ে শুধু ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক বড় ধরনের ছিনতাই, কুপিয়ে জখম ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে মোহাম্মদপুরের বসিলায় রিকশাযাত্রী এক নারী পোশাক শ্রমিককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ডান হাতের কবজি প্রায় বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা ছিল চরম নৃশংসতা। চলতি মাসের শুরুতে খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়ায় পেনশনের টাকা তুলে ফেরার পথে এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে টাকাভর্তি ব্যাগ লুটে নেয় ছিনতাইকারীরা। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে গত তিন সপ্তাহে দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় গোলাগুলি ও পেট্রোলবোমা হামলার ঘটনায় উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা। উত্তর বাড্ডার সাতারকুলে কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে এক একাদশ শ্রেণির ছাত্রকে পিটিয়ে ভবন থেকে নিচে ফেলে হত্যা করার ঘটনাটি ব্যাপক অলোচিত।

গত মাসের মাঝামাঝি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বঙ্গবন্ধু টানেল সংযোগ সড়কে পোশাক কারখানার শ্রমিকবাহী বাসে ব্যারিকেড দিয়ে সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের ভুলতায় কাঁচামাল ব্যবসায়ীর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে খুঁচিয়ে ওই ব্যবসায়ীর চোখ উপড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মোটরসাইকেলে ওঠার সময় এক চাল ব্যবসায়ীকে শত শত মানুষের সামনে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে টাকা লুটে নেয় দুর্বৃত্তরা।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী জনির নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ঝুমুর নামে এক নারী নিজের শরীরে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাটি নাড়া দিয়েছে অনেকের হৃদয়। মঙ্গলবার বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি খুন এবং ধর্ষণের ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। এদিন রাতে রংপুরে এক হোটেল শ্রমিককে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সন্ধ্যায় লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গাইবান্ধায় কিশোরকে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়। যশোরে যুবককে খুন করা হয় কুপিয়ে ও পিটিয়ে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে স্বামীর হাত-পা ও মুখ বেঁধে স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করা হয়। সোমবার কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার হয় কিশোরী। এছাড়া একইদিন লালমনিরহাটের আদিতমারি উপজেলায় সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে রাখে। রাজধানীর পল্লবীতে বহুল আলোচিত শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের রেশ না কাটতেই এ ঘটনা মানুষকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে। এখানেও আসামি ছিল মাদকাসক্ত।

গেটকিপারদের ভূমিকা : সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরের একটি নির্দিষ্ট লবি এখন বদলি ও পদায়নের অলিখিত ‘গেটকিপার’ হিসাবে কাজ করছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত আইজি, ডিআইজি এবং এসপি পর্যায়ের বদলিতে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের কর্মকর্তাদের কিংবা নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালীর ‘পকেটের লোক’ হিসাবে পরিচিতদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই ‘পকেটায়নের’ ফলে বাহিনীতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। যারা সততার সঙ্গে কাজ করতে চান, তারা সাইডলাইনে চলে যাচ্ছেন। আইজিপিসহ বিভিন্ন ইউনিট প্রধানদের অনেকেই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন না।

পুলিশের বক্তব্য : পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছিল। পুলিশের নতুন নেতৃত্ব সেই পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দেশকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসে। যে কোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এখন সক্ষম উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে সব ক্ষেত্রেই জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে যেন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত আছে।

শনিবার সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনী নৈতিক ভিত্তি, সাহস ত্বরিতগতিতে ফিরে পেয়েছে। নির্বাচিত সরকার আসার পর পুলিশ সক্রিয় হয়েছে, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে। অপরাধ হলে থানায় রিপোর্ট, মামলা হচ্ছে, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেগুলো নজরে আসছে, সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ গত সাড়ে তিন মাসে পুলিশের কার্যক্রমে আনন্দিত হওয়ার অনেক বিষয় আছে বলেন তিনি।