ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানা মহলে আলোচনা ও গুঞ্জন রয়েছে। অনেকের সন্দেহ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এ দলটির পুনর্বাসনের জন্য দু-একটি বিদেশি শক্তির ‘গোপন’ তৎপরতা রয়েছে। এরই অংশ হিসাবে দলটির উদ্যোগে দু-একটি ঝটিকা মিছিল হচ্ছে। এছাড়া শেখ হাসিনা নিজেও একাধিকবার সাক্ষৎকার ও ভার্চুয়াল মিটিংয়ে তার ফেরার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা কী বলে-সত্যি কি হাসিনা দেশে ফিরতে পারবেন? তার বা আওয়ামী লীগের ফেরার মতো পরিস্থিতি দেশে আদৌ তৈরি হয়েছে কিনা এ প্রশ্নও উঠছে।
কারণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত নতুন একটি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৪ মাস পার হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সরকারের ভুল-ভ্রান্তি যেমন জনমনে ততটা স্পষ্ট হয়নি, তেমনি হাসিনাবিরোধী তথা গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো তার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ আছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দেশীয় জনমত বা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমর্থন কোনো পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত হাসিনা বা আওয়ামী লীগের পক্ষে নেই। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় তার ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। এখন শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। কারণ দেশে ফিরলেও প্রথমেই তাকে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর জন্য বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জ হবে গত দেড় দশকের শাসনামল নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। কিন্তু কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আত্মসমালোচনা বা অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান এখনো দৃশ্যমান নয়।
এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত তরুণ প্রজন্ম এখনো বেশ সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামীবিরোধী জনমতও দেশে বিদ্যমান। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের যে আলোচনা হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বাস্তবতা দেখছেন না রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। বরং এ ধরনের আলোচনা অনেকাংশেই রাজনৈতিক প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডার অংশ হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, আওয়ামী লীগ একটি বড় ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির বাইরে রাখা সহজ হবে না। তবে বর্তমানে দেশে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা নেই; ফলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নই দেশের রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত।
শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করার প্রসঙ্গ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটিকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন বলে মনে করেন না সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। যুগান্তরকে তিনি বলেন, দেশে যে অপরাধ, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। শেখ হাসিনা হোক আর যেই হোক, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে, তিনি যত বড় রাজনৈতিক নেতা বা ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লক্ষ্য কখনোই আরেক ধরনের কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে না। গণতন্ত্রের নামে নতুন কোনো স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা তৈরি হলে সেটিও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থি হবে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সংগ্রাম ও সামাজিক বাস্তবতাই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়া বা আওয়ামী লীগের আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা বর্তমানে খুবই সীমিত। যুগান্তরকে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কিছু আলোচনা থাকলেও সেটি মূলত দেশের বাইরে, বিশেষ করে সীমান্তের ওপারের কিছু মহল, মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগের অবস্থানরত নেতাকর্মীদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন একটি বড় রাজনৈতিক সংগঠন ছিল। তাদের দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী এখনো দেশেই রয়েছেন। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির মধ্যে আত্মসমালোচনা, অনুতাপ বা নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তারা অতীতের অবস্থান থেকেও সরে আসেননি, যা তাদের জনগণ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
তবে এতবড় একটি রাজনৈতিক শক্তি একেবারে হারিয়ে যাবে, এমনটা মনে করার কারণ নেই বলেও মনে করেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, দলটি যদি নিজেদের অতীতের ভুল-ত্রুটি উপলব্ধি করে তা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারত, নতুনভাবে পরিশীলিত রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে জনগণের সামনে আসতে পারত; তাহলে হয়তো মানুষ তাদের নতুন করে বিবেচনা করলেও করতে পারত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণ সে ধরনের কোনো পরিবর্তনের আভাস দেখছে না।
রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রুকন উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটিকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্ন হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিষয়টি জবাবদিহি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি বলেন, সরকারও কূটনৈতিকভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কারণ তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর আইনি নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
রুকন উদ্দিনের মতে, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সিদ্ধান্ত নেবে তিনি বা তার দল ভবিষ্যতে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তিনি দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন বা ক্ষমতায় আসবেন-এমন সম্ভাবনা দেখছেন না এই বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ প্রজন্ম এখনো সক্রিয় ও সংগঠিত রয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগবিরোধী জনমত এখনো বিদ্যমান। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের যে আলোচনা হচ্ছে, তা অনেকাংশেই রাজনৈতিক প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডার অংশ হতে পারে।
রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা নেই যে তা পূরণের জন্য নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা ব্যক্তির আবির্ভাব প্রয়োজন হবে। তবে এটাও সত্য যে আওয়ামী লীগ একটি পুরোনো ও বড় রাজনৈতিক দল। শুধু নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা করে রাখলেই দলটি স্থায়ীভাবে রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। দলটি অবশ্যই রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করবে।
তিনি আরও বলেন, তবে শেখ হাসিনা বা দল হিসাবে ফিরে আসার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বড় সমস্যা হলো, গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামল নিয়ে জবাবদিহি। জনগণের সামনে সেই সময়ের নানা ঘটনা, সিদ্ধান্ত ও বিতর্কের ব্যাখ্যা দিতে হবে। আমার মনে হয় না দলটি খুব সহজে সেই পথ বেছে নেবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনা বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের এখনই দেশে সক্রিয় রাজনীতি করার মতো পরিস্থিতি নেই। কারণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিগুলো এ প্রশ্নে এখনো শর্তহীনভাবে একমত। তবে তাই বলে তারা (আওয়ামী লীগ) সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তিনি মনে করেন, তারা নানাভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে এবং এ লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়ারও চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে দেশে থাকা তাদের নেতাকর্মীদের মাঠে নামানোর চেষ্টা করবে। তাই এসব বিষয় সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলা করতে হবে।