বিদ্যমান ঋণচুক্তি থেকে সরে আসার পর এবার আইএমএফ-এর কাছ থেকে তিন বছর মেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণের একটি নতুন প্যাকেজ পাওয়া যাবে। এ কর্মসূচির আওতায় নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব সংস্কার এবং জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেবে সরকার। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর পর এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঋণের শর্ত ও কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে ১২-১৭ জুলাই আইএমএফ-এর বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নতুন কর্মসূচিতে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ব্যাংক খাত সংস্কার ও পুনর্গঠনকে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন, উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং কিছু ব্যাংকের কার্যত দেউলিয়া অবস্থার কারণে পুরো আর্থিক খাত চাপে পড়েছে। চাহিদামতো টাকা না পেয়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ওপর অনেক আমানতকারীর আস্থা কমে গেছে। উচ্চসুদ এবং সার্ভিস চার্জের কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে ভয় পান। আবার অনেক ভালো ও তরুণ উদ্যোক্তাকে ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। পুরো ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বাজেটসংক্রান্ত একাধিক বৈঠকে বলেছেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই ব্যাংক খাতকে সুস্থ করতে হবে। এ লক্ষ্যে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, মূলধন পুনর্গঠন, ব্যাংক রেজুলেশন কাঠামো কার্যকর করা, খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ ব্যবস্থা, করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপকে নতুন কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হচ্ছে।
জানা যায়, জ্বালানি নিরাপত্তাও নতুন ঋণ কর্মসূচির আরেকটি বড় অগ্রাধিকার হিসাব উঠে এসেছে। গত কয়েক বছরে উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ও জ্বালানি আমদানির কারণে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। ফলে সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কাঠামো সংস্কারে গুরুত্ব দিচ্ছে। একইভাবে দুর্বল রাজস্ব আহরণব্যবস্থার কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না। ফলে বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে।
তবে আইএমএফ শুরু থেকেই সরকারের আর্থিক কাঠামো শক্তিশালী করতে বিভিন্ন শর্ত পরিপালন এবং সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ঋণ পেতে আইএমএফ যেসব শর্ত দিয়েছে, সেগুলো নতুন কর্মসূচিতেও ফিরে আসবে। কারণ, এগুলো আইএমএফ-এর জন্য নয়, বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্যই প্রয়োজন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এখন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুশাসন নিশ্চিত না করা গেলে নতুন ঋণের অর্থ কোনো স্থায়ী সুফল বয়ে আনবে না। একইভাবে রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও এড়ানো যাবে না।
আইএমএফ-এর মতে, বাংলাদেশের নতুন কোনো ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য শক্তিশালী নীতিগত অঙ্গীকার, বাস্তবসম্মত সংস্কার রোডম্যাপ এবং পরিশোধ সক্ষমতার যৌক্তিক ভিত্তি থাকতে হবে। সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা। ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার করা ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। সে কারণে সরকার যদি নতুন ঋণের একটি বড় অংশ ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য ব্যবহার করতে চায়, সেটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তারই অংশ। শিল্পায়ন, রপ্তানি ও বিনিয়োগ ধরে রাখতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে আইএমএফ কর্মসূচির অধীনে রাজস্ব সংস্কার, ভ্যাটব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, কর অব্যাহতি কমানো, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কারের মতো বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীরগতির ছিল বলে সম্প্রতি আইএমএফ-এর মূল্যায়নে উঠে এসেছে। ব্যাংক খাত সংস্কার এবং ব্যাংক রেজুলেশন আইন বাস্তবায়ন নিয়েও সংস্থাটির অসন্তোষ ছিল। জুলাই সফরে এসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সফর শেষে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন কর্মসূচির পরিধি, অর্থের পরিমাণ, সংস্কার শর্ত এবং বাস্তবায়ন সময়সূচি নিয়ে আরও বিস্তারিত দরকষাকষি শুরু হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই আলোচনা শুধু নতুন ঋণ পাওয়ার পথই খুলবে না, বরং আগামী কয়েক বছরের জন্য দেশের আর্থিক খাত, জ্বালানি নীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখাও নির্ধারণ করে দিতে পারে।