রেলওয়েতে গত দুই দশকে বরাদ্দ বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। ২০০৪-০৫ সালের দিকে যেখানে রেলের বার্ষিক বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫০ কোটি টাকার মতো, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকায়। কিন্তু বিপুল এই অর্থ ব্যয়ের পরও ট্রেনের গতি ও সেবার মান তলানিতেই রয়ে গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে রেলে সোয়া এক লাখ কোটি টাকার বেশি খরচ করা হলেও এর প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যয় হয়েছে কেবল অবকাঠামো বা লাইন নির্মাণে। ইঞ্জিন বা কোচ কেনার দিকে নজর না দেওয়ায় হাজার কোটি টাকার নতুন লাইনে কাঙ্ক্ষিত ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর প্রায় পৌনে তিন হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের এই তথাকথিত উন্নয়নের প্রায় ৮৫ শতাংশই বিদেশি ঋণ। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কোচ না থাকায় ঋণের টাকায় নির্মিত প্রকল্পগুলো থেকে আয় আসছে না। উলটো ঋণের সুদ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে গিয়ে রেলের লোকসানের বোঝা ভারী হচ্ছে।
তারা আরও বলছেন, বিগত সরকারের আমলে রেলের সিংহভাগ উন্নয়ন প্রকল্পই গ্রহণ করা হয়েছিল লুটপাট ও দুর্নীতির উদ্দেশ্যে। গত ১৬ বছরে দায়িত্ব পালন করা ৫ জন রেলপথমন্ত্রীর (সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, মুজিবুল হক, নূরুল ইসলাম সুজন ও জিল্লুল হাকিম) বিরুদ্ধে দুদকে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। এর মধ্যে নূরুল ইসলাম সুজন বর্তমানে কারাগারে; বাকি তিনজন (সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রয়াত) পলাতক। অভিযোগ রয়েছে, তারা রেল থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি লুটপাট করেছেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, রাজনৈতিক তুষ্টি ও লুটপাটের উদ্দেশ্যে গত ১৬ বছরে একক ইচ্ছায় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রেলের সেবার মান বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রেনের গতি বিবেচনা করলে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের তলানিতে।
জানা যায়, আওয়ামী আমলের বিশেষ দুই প্রকল্প-পদ্মা সেতু রেললিংক ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ। এ দুই প্রকল্পে খরচ করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ২৩ থেকে ৭৬ কোটি টাকা ব্যয় হলেও এই দুই প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৮০ থেকে ২৩০ কোটি টাকা। সমীক্ষা অনুযায়ী, ওই দুই রুটে শতাধিক ট্রেন চালানো সম্ভব হলেও ইঞ্জিন ও কোচ সংকটে বর্তমানে চলছে মাত্র ৬টি ট্রেন।
এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯৪৮ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ, ২৮০ কিলোমিটার মিটারগেজকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর এবং ১৩০৮ কিলোমিটার রেললাইন পুনর্বাসন করা হয়েছে। কিন্তু ইঞ্জিন ও কোচ না কেনায় এসব নতুন লাইনের সুফল পাচ্ছে না যাত্রীরা।
রেলওয়ের রোলিং স্টক দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে কাগজ-কলমে ২৮০টি যাত্রীবাহী ট্রেন থাকলেও ইঞ্জিন ও কোচ সংকটে ৭৭টি যাত্রীবাহী ট্রেন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে বছরে প্রায় ৫৪০ কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেল। নতুন তৈরি করা রেলপথে পর্যাপ্ত ট্রেন না চলায় বছরে গচ্চা যাচ্ছে আরও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন-কোচের কারণে প্রতিদিনই বিভিন্ন সেকশনে চলন্ত অবস্থায় ট্রেন বসে (ফেইলর) যাচ্ছে। এতে যাত্রা বাতিল করে যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের প্রকৌশল দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিগত সরকার রাজনৈতিক স্টান্টবাজির অংশ হিসাবে ১৪২টি নতুন ট্রেন চালু করেছিল। কিন্তু এর জন্য তারা ১১০টি পুরোনো ট্রেন বন্ধ করে দেয়। বন্ধ ট্রেনের কোচ-ইঞ্জিন দিয়েই নতুন রুটে ট্রেন চালানো হয়।
রেলওয়ে অপারেশন ও পরিবহণ দপ্তরসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে রেলওয়ে ১ টাকা আয় করতে খরচ করছে প্রায় পৌনে তিন টাকা। ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া লোকসান কমানো সম্ভব নয়। বর্তমানে যে পরিমাণ ট্রেন চলছে অবকাঠামো অনুযায়ী এতে আরও প্রায় তিনগুণ ট্রেন চালানো সম্ভব।
কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন সূত্র জানায়, প্রতিদিন রাজধানী থেকে ৫০টির বেশি ট্রেন চলাচল করছে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন ২২-২৩ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করছেন। এর বিপরীতে চাহিদা প্রায় ৩ লাখ যাত্রীর। পর্যাপ্ত ট্রেন থাকলে প্রতিদিন ৪ লাখের বেশি যাত্রী চলাচল করতে পারবেন।
বিশ্বজুড়ে রেলের আয়ের প্রধান উৎস পণ্য পরিবহণ হলেও বাংলাদেশে তা তলানিতে। বর্তমানে প্রায় পৌনে ৫ হাজার কিলোমিটার রেলপথে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ পণ্য পরিবহণ সম্ভব হচ্ছে। ২৮০টি যাত্রীবাহী ট্রেনের বিপরীতে মালবাহী ট্রেন চলছে মাত্র ১৩টি। যাত্রীবাহী ট্রেন থেকে বছরে আয় আসে ৯০০ কোটি টাকা, আর মালবাহী থেকে মাত্র ৪৫-৫০ কোটি টাকা।
রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে রেলে লুটপাটের উন্নয়ন করা হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় রেলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আমরা অবকাঠামো উন্নয়নের সমান্তরালে রোলিং স্টক সামগ্রী কিনে ট্রেনের সংখ্যা বাড়াব। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ, সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যা যা করা প্রয়োজন তা করা হবে। রেলের সঙ্গে নতুন করে আরও ১০টি জেলাকে যুক্ত করা হচ্ছে। রেলের আয় বাড়াতে এবং স্বল্প দূরত্বে ট্রেন পরিচালনাসহ খরচ কমাতে একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) প্রকৌশলী ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, রেলের ২৯০টি ইঞ্জিনের অর্ধেকের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ। ৪৫ শতাংশ ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বরাদ্দ বাড়িয়ে নতুন ইঞ্জিন-কোচ ক্রয় ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি বলেন, বর্তমান যাত্রী চাহিদা পূরণে চলমান ট্রেনের চেয়ে ২-৩ গুণ বেশি ট্রেন চালাতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে রোলিং স্টক সামগ্রী নিশ্চিত করা হলে রেলে লোকসান নয়, লাভ হবে।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন অকেজো হয়ে পড়ায় প্রায়ই ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে হয়। লোকবল ও ইঞ্জিনের অভাবে বন্ধ থাকা ট্রেনগুলো চালু করা যাচ্ছে না।
রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন জানান, বর্তমান সরকার রেলের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে রোলিং স্টক (ইঞ্জিন-কোচ) কেনার বিষয়ে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে।