মৌসুমের শুরুতেই দেশের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে ডেঙ্গুর উদ্বেগজনক বিস্তার দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বরিশাল অঞ্চলের মানুষ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন চার হাজার ৬০০ জন। এর মধ্যে এক হাজার ৯৯৮ জনই উপকূলীয় ১০ জেলার বাসিন্দা, যা মোট আক্রান্তের ৪৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের পাঁচটি জেলায়ই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। এ পর্যন্ত বরিশালে আক্রান্ত হয়েছে ৩২৮ জন, পিরোজপুরে ২৭৩ জন, পটুয়াখালীতে ২৩১ জন, ঝালকাঠিতে ২১৫ জন ও বরগুনায় ১১৪ জন। উপকূলের অন্য জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে আক্রান্ত হয়েছে ২৮৭ জন, বাগেরহাটে ১৬৪ জন, খুলনায় ১৫১ জন, কক্সবাজারে ১২১ জন ও চাঁদপুরে ১১৪ জন।
অন্যদিকে উপকূলের বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী ঢাকায়, ৯৯৫ জন।
এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সাতজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। ঢাকার বাইরে মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে একজন করে মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি মাসের প্রথম ১৮ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৪০৩ জন, যা এ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
কীটতত্ত্ববিদরা বলেছেন, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। হাতে থাকা আগামী এক মাস আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় কমিউনিটি মোবিলাইজেশন জরুরি। অর্থাৎ লার্ভা নিধনে পাড়ায় পাড়ায় জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে কার্যকরভাবে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি বাসায় গিয়ে লার্ভা আছে কি না—তা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রয়োজনীয় কীটনাশকের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
উপকূলে ডেঙ্গুর বিস্তার বেশি যে কারণে : উপকূলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ার কারণ নিয়ে এখনো বড় কোনো গবেষণা প্রকাশ না হলেও বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে পানি সংরক্ষণের প্রবণতাকে দায়ী করছেন। উপকূলীয় এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেশি থাকায় অনেক মানুষ বৃষ্টির পানি ড্রাম, ট্যাংক বা বড় পাত্রে সংরক্ষণ করে। এসব পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঘটছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা ও আয়রনের মাত্রা বেশি থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে। এই ‘ওয়াটার হোল্ডিং বিহেভিয়ার’ বা পানি জমিয়ে রাখার অভ্যাসই ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের জন্য জমিয়ে রাখা পরিষ্কার পানিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিসমশার লার্ভা জন্মায়। অনেক মানুষ এটিকে ক্ষতিকর না ভেবে ‘পানির পোকা’ মনে করে। ফলে অজান্তেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই এখনই মানুষকে সচেতন হতে হবে। পানি সংরক্ষণের পাত্র সব সময় ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে এবং নিয়মিত লার্ভা আছে কি না—তা পরীক্ষা করতে হবে। কোনো পাত্রে লার্ভা পাওয়া গেলে পানি ফেলে দিয়ে ডিটারজেন্ট দিয়ে পাত্র পরিষ্কার করে ধুয়ে পুনরায় ব্যবহার করতে হবে।
গত বছরের নভেম্বরে আইইডিসিআরের একটি জরিপে বরগুনাসহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বড় পাত্রে এডিসমশার ব্যাপক উপস্থিতি পাওয়া যায়। জরিপে অংশ নেওয়া এক গবেষক জানান, উপকূলীয় অঞ্চলে পানির সংকট এডিসের বংশবিস্তারে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল।
৬০% রোগীর বয়স ৩০ বছরের কম : বয়সভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, মোট আক্রান্তের প্রায় ৬০ শতাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী। এ পর্যন্ত ৩০ বছরের কম বয়সী আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজার ৭৩৩ জন। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩৪৯ জন, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী ৩০৩ জন, ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী ২৯৬ জন, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী ৬৩১ জন, ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৫৯৮ জন এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৫৫৬ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘ উষ্ণ সময়কাল এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে এখন ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে। সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত কমানো সম্ভব নয়। তবে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। ডেঙ্গুতে প্রাণহানি কমাতে ওয়ার্ডভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং স্থানীয় পর্যায়ে রোগী ব্যবস্থাপনা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।