Image description
অর্থ পাচার মামলায় সাদিক অ্যাগ্রোর ইমরানসহ দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র ই-টিআইএন থাকলেও আয়কর রিটার্ন দাখিল নেই ছয়টি ব্রাহমা জাতের গরু জবাই না করে ২৭ লাখ টাকা পাচার

গাড়ি নেই, জুয়েলারি নেই— তবু বিদেশ সফরের তালিকা লম্বা। ব্যবসার হিসাবের খাতায় কোটি টাকার লেনদেন, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ১৫ লাখ টাকার ছাগল। এই অদ্ভুত বৈপরীত্য ঘিরেই একসময় আলোচনায় আসেন সাদিক অ্যাগ্রোর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইমরান হোসেন। আর সেই আলোচিত নামই এখন অর্থ পাচার, প্রতারণা ও জালিয়াতির এক বিস্তৃত তদন্ত প্রতিবেদনের কেন্দ্রে।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক খামারঘেরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘সাদিক অ্যাগ্রো’। একসময় দেশের গবাদি পশু ব্যবসায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। দেশি গরুকে বিদেশি ব্রাহমা জাত বলে উপস্থাপন, লাখ টাকার ছাগল, খামারের আড়ম্বর— সব মিলিয়ে এটি ছিল আলোচনার এক চমকপ্রদ নাম; কিন্তু সেই চমকের আড়ালে যে আরেকটি জটিল আর্থিক গল্প লুকিয়ে ছিল, তা ধীরে ধীরে সামনে আসে তদন্তে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে করা মামলায় তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আদালতে এ মামলায় অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। গত বছরের ৩ মার্চ সিআইডির উপপরিদর্শক মো. জোনাঈদ হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। তদন্ত শেষে সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. ছায়েদুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এতে সাদিক অ্যাগ্রোর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইমরান হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম জেনিথ ও সাদিক অ্যাগ্রো লিমিটেডকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে জেনিথ পলাতক থাকায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সুপারিশ করা হয়েছে। পরে গত ৩০ এপ্রিল মামলাটি বিচারে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলি করা হয়েছে। আসামি ইমরান এই মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। তবে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় কারামুক্ত হতে পারেননি।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এই ব্যবসার পেছনে থাকা ইমরান হোসেন এবং তার সহযোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক চালিয়ে আসছিলেন। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তাদের যোগাযোগ ছিল বিস্তৃত। ২০১১-২৫ সালের মধ্যে তিনি চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর ও সৌদি আরবসহ অন্তত পাঁচটি দেশে মোট ৩৩ বার ভ্রমণ করেছেন; কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, তার ব্যক্তিগত সম্পদের তালিকায় কোনো গাড়ি বা জুয়েলারির উল্লেখ নেই— যা তদন্ত প্রতিবেদনে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

তদন্তের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ব্যবসায়িক মূলধন প্রায় ৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ৬ কোটি টাকার বেশি এবং অকৃষিজমির পরিমাণও কয়েক কোটি টাকার সমান। এ ছাড়া ব্যাংক ও নগদ মিলিয়ে প্রায় ৩৪ লাখ টাকার সম্পদের তথ্যও উঠে আসে। আসামি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা আয়কর পর্যালোচনায় দেখা যায়, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান সাদিক অ্যাগ্রো লি. গুলশান-২ সার্কেলের করদাতা। করদাতা কোম্পানি ২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ই-টিআইএন গ্রহণ করলেও মামলা করা পর্যন্ত কোনো আয়কর রিটার্ন দাখিল করেননি।

গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় বিদেশ থেকে গরু আমদানিকে কেন্দ্র করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০টি ব্রাহমা জাতের গর্ভবতী গরু আনার আবেদন করা হলেও তা অনুমোদন দেয়নি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। অভিযোগ অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়াই পরে ১৮টি ব্রাহমা গরু দেশে আনার চেষ্টা করা হয়। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর কাস্টমস সেগুলো জব্দ করে। পরে সেগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তদন্ত প্রতিবেদনে জালিয়াতি, অনুমোদনবিহীন আমদানি এবং নথি জাল করার অভিযোগ আনা হয়। এমনকি কিছু সরকারি স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।

পরে জব্দ করা গরুগুলোর ব্যবস্থাপনা ও বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, কিছু গরু বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে মাংস বিতরণের উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করা হলেও, সেগুলোর একটি অংশ সঠিকভাবে বিতরণ না করে আত্মসাৎ বা অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ তদন্ত শেষে আর্থিক ক্ষতির হিসাব এবং সম্ভাব্য মানি লন্ডারিংয়ের দিকও যুক্ত করা হয়। এখানেও নাম আসে সাদিক অ্যাগ্রোর।

তদন্ত সংস্থার দাবি, প্রায় ৩ কোটি টাকার মতো অর্থ বিদেশি গরু আমদানির নামে অবৈধভাবে স্থানান্তর হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সরকারি জায়গা ব্যবহার, খামার পরিচালনায় অনিয়ম এবং ভুয়া তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগও উঠে আসে।

আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, আলোচিত ১৫ লাখ টাকার ছাগল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই ছাগলটি নিয়েও তদন্তে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, সেটি বাস্তবে ডেলিভারি হয়নি এবং পরে রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যায় বলে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ব্যবসায়িক লেনদেন, বিদেশি গরু আমদানি, আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য এবং সম্পদের হিসাব মিলিয়ে একটি সংগঠিত আর্থিক অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকীর ভাষ্য, ‘সম্প্রতি অর্থ পাচার মামলায় সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। আগামী ২৩ জুন এই মামলার শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। আমরা দ্রুত সময়ে মামলাটির বিচারকাজ শেষ করব।’