আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা নানা সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নানাভাবে কটূক্তি করে তাকে হেয় এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন। বেশ কয়েকটি মামলা দিয়েও হয়রানি করা হয়েছিল। এমনকি আদালতে বিভিন্ন মামলার হাজিরা দিতে গেলে নোবেলজয়ী বিশ্ববরেণ্য এ ব্যক্তিকে লিফট বন্ধ করে হেঁটে আট তলায় ওঠার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ৮৪ বছর বয়সী এ প্রবীণ নাগরিক ৪০ বারের মতো এমন অপমান ও হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে এবং ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিলে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সব রোষ গিয়ে পড়ে তার ওপর। এরপর থেকে তাকে নিয়ে নানা অপপ্রচার চালিয়ে গেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ ও তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব। বর্তমানে তারা দেশের ভেতরে-বাইরে রাজনীতিতে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি অপপ্রচারের প্রধান নিশানায় রেখেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। এরই মধ্যে দেশের ভেতরে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবং সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ইউনূসবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে তারা।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করেন, ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পেছনে ড. ইউনূসের কূটকৌশল রয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পেছনেও রয়েছে তার মূল ভূমিকা। প্রকাশ্য রাজনীতি করা থেকে দলটিকে বিচ্যুত করেছেন তিনি। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এজন্য অনেকে দেশেও ফিরতে পারছেন না। কেউ কেউ দেশে থাকলেও তার এলাকায় যেতে পারছেন না। মিথ্যা মামলায় শীর্ষ নেতাদের বিচার, ধানমন্ডি-৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙচুর, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চেতনা তৈরি, জঙ্গিবাদ ও জামায়াত-শিবিরকে মদদ, সারা দেশে মব সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের কার্যালয়সহ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পেছনে ড. ইউনূসের হাত রয়েছে।
দলটির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি সরকার নয়। তাদের টার্গেট বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছেন তারা। বিশেষ করে নারী, শিশু হত্যা-ধর্ষণ, জামায়াতকে মদদ দেওয়া, হামের টিকার অব্যবস্থাপনাসহ জনসম্পৃক্ত কিছু ইস্যু নিয়ে সামনে এগোতে চায় আওয়ামী লীগ। এসব জনসম্পৃক্ত বিষয়সহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দুর্নীতির খতিয়ান বিশ্ব গণমাধ্যমে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। একই সঙ্গে ড. ইউনূস ও তার সরকারের বিভিন্ন বিষয়ে দেশে-বিদেশে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ারও প্রস্তুতি চলছে। বিশ্বমঞ্চে ড. ইউনূসের বিভিন্ন অপনীতি-দুর্নীতি ও তার শাসনামলের অপকর্ম তুলে ধরে ইমেজ সংকটের মাধ্যমে বৈশ্বিক চাপ তৈরি করা এখন আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাবনায়। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্রদের গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টিকেও (এনসিপি) প্রতিপক্ষ মনে করে তাদের আধিপত্যও ঠেকাতে চাইছে তারা।
এ নিয়ে কথা হয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনের সঙ্গে। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে শত্রু মনে করে। শুধু আওয়ামী লীগ কেন, সারা দেশের মানুষই তাকে শত্রু মনে করে। কারণ তিনি ছিলেন মব সৃষ্টির জনক, জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক, বিদেশিদের ক্রীড়নক এবং দেশ বিক্রির ষড়যন্ত্রকারী। তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি করে পুলিশ হত্যা করেছেন। নিজেই আন্দোলনের মদদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে হত্যা করার গভীর ষড়যন্ত্র করেছিলেন। এজন্য দেশের মানুষ ও আওয়ামী লীগ তাকে শত্রু মনে করে।’
আওয়ামী লীগের এই নেতা আরও বলেন, ‘ড. ইউনূসের সহযোগিতায় ধানমন্ডি-৩২ ভেঙে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে, মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দেওয়ার চক্রান্ত হয়েছে। প্রতিহিংসার কারণে দেশের মানুষকে সব ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত করেছেন তিনি। হামের টিকা না দিয়ে ৬০০ শিশুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে দেশেকে ধ্বংসের মুখে ঢেলে দিয়েছেন। এই লোক দেশ ও জাতির শত্রু।’
সামাজিক মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচার: ড. ইউনূসকে টার্গেট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারে নেমেছে আওয়ামী লীগ। এরই অংশ হিসেবে নিজেদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে গত ৪ জুন ‘কত বড় বাটপার হলে রোহিঙ্গাদের এমন ধোঁকা করা যায়’ ড. ইউনূসের ছবিযুক্ত একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে দলটি। ক্যাপশনে উল্লেখ্য করা হয়, ‘গত বছর ড. ইউনূস বলেছিল, এই ঈদ না হলে আগামী ঈদে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরবে। কিন্তু সেই ঈদের পর আরও ২-৩টা ঈদ চলে গেলেও প্রত্যাবাসনের কোনো লক্ষণ নেই। ক্যাম্পে কান্না আর হতাশা ছাড়া কিছু করার নেই।’
গত ২১ মে ফেসবুক পেজে ড. ইউনূসের ‘সামাজিক ব্যবসা, ব্যক্তিগত মুনাফা: যে লোক দারিদ্র্য বেঁচে ধনী হলেন’—এমন আরেকটি ফটোকার্ড শেয়ার করা হয়। ক্যাপশনে বলা হয়, ‘ইউনূসের বিরুদ্ধে যে পাহাড়সমান অভিযোগ জমে উঠেছে গত দেড় বছরে, সেগুলোর কোনো বিচার হচ্ছে না। হওয়ার লক্ষণও নেই। গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সরকারি অর্থে, গরিব মানুষের কল্যাণের কথা বলে। ১৯৮৩ সালে যখন ব্যাংকটি শুরু হয়, তখন মোট মূলধনের ৬০ শতাংশের বেশি ছিল সরকারের টাকা। বাকিটা ছিল ঋণগ্রহীতাদের। ইউনূসের নিজের একটি পয়সাও ছিল না সেখানে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবহার করেই তিনি গড়ে তুলেছেন একের পর এক কোম্পানি, ফান্ড, ট্রাস্ট। আর সেগুলোর শীর্ষে সবসময় তিনি নিজে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর তিনি যখন ক্ষমতায় বসলেন, সেই মামলা প্রত্যাহার হয়ে গেল। শুধু কর মামলা নয়; শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলা, অর্থপাচার মামলা সবকিছু একে একে খারিজ হয়ে গেল। এত দ্রুত মামলাগুলো খারিজ হওয়ার নজির আদালতের ইতিহাসে বিরল। গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের শেয়ার ২৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হলো। গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া হলো।’
এ ধরনের নানা ফটোর্কাড আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও তাদের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছে। তাদের লক্ষ্য ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় জনমত তৈরি করা। একই সঙ্গে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরাও ইউনূস সরকারের আমলে দুর্নীতি ও অপকর্ম তাদের লেখার মাধ্যমে তুলে ধরছেন।
বিক্ষোভসহ আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি : ড. ইউনূস বর্তমানে বিশ্বের যে দেশেই যাবেন সেখানে দলের নেতাকর্মীরা সমবেত হয়ে বিক্ষোভ করার পরিকল্পনা করেছে। কর্মসূচি পালন করবেন বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরা—এমন বার্তা দলের পক্ষে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া গত ২৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ও সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন কক্সবাজারের আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। চিঠিতে তারা বলেছেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল-২০২৬’-এর মাধ্যমে দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী একটি দলকে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া নিষিদ্ধ করা প্রকৃত ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির ১৭৩ জন সদস্য ওই যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। এ ছাড়া দেশে-বিদেশে অবস্থান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টকশো, পডকাস্টে অংশ নিয়ে অনেককে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি দলটিকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার দাবি তুলছেন।
আগস্ট ঘিরে সংগঠিত হওয়া চেষ্টা: আসছে আগস্ট মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে বড় ধরনের শোডাউন করার চিন্তা করছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মী। এজন্য নানা কৌশলে তারা সংঘটিত ও সক্রিয় হচ্ছে। নিষিদ্ধ থাকার পরও এরই মধ্যে জেলা-উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কমিটি দিয়েছে ছাত্রলীগ। সিরাজগঞ্জ, খাগড়াছড়ি, শেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজসহ প্রায় দুই ডজন কমিটি গঠন করেছে তারা।
এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা চাঙ্গাভাব দেখা যায়। নির্বাচনের পরপরই আত্মগোপনে থাকা মধ্যম সারির কিছু নেতা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন। বিদেশ থেকেও কিছু নেতা দেশে ফিরেছেন। তবে এসব নেতা এলাকায় চুপচাপ অবস্থান করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত: রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছে, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপপ্রচার সামনে আরও বাড়তে পারে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে বর্তমানে সরকারের কেউ প্রকাশ্যে কথা বলছে না। এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধান টার্গেট ছিল ড. ইউনূস। কারণ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পর ড. ইউনূস প্রথম ভারতের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন। ক্ষমতায় এসে তিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশকে ডিস্টার্ব করলে ভারতের সেভেন সিস্টার ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল ড. ইউনূস। এ ছাড়া বাংলাদেশে সংস্কার আনা, মার্কিন চুক্তি ও দেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থাকুক—এটা ভারত চায় না। এসব কারণে ড. ইউনূস ভারতের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। আর ভারতের টার্গেট মানেই আওয়ামী লীগের টার্গেট। মূলত এদেশে ভারতের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আওয়ামী লীগ। এ অবস্থায় ড. ইউনূসকে নিয়ে অপপ্রচার ঠেকাতে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিকে আবার একজোট হওয়া উচিত।
যা বলছেন জামায়াত ও সিপিবি নেতারা: জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম কালবেলাকে বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। তাকে হেয়প্রতিপন্ন করলে ব্যক্তির চেয়ে দেশের সুনাম বেশি নষ্ট করা হবে। আমার নেতিবাচক কোনো সমালোচনাকে সমর্থন করি না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকবে, তবে যুক্তিতর্ক দিয়ে সমালোচনা করতে হবে। গায়ের জোরে লাগামহীন সমালোচনা করা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নয়।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন কালবেলাকে বলেন, আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক কৌশলে ফেরার চেষ্টা করবে; অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দুর্নীতিসহ নানা বিষয়ে তারা রাজনীতি করার চেষ্টা করবে; দেশে ঢোকার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে যাই করতে হবে, আইনি কাঠামোর মাধ্যমে। কোনো হঠকারিতা দেশের মানুষ আর মেনে নেবে না।