Image description
চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় মানব পাচার

কম্বোডিয়ায় মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভনে টার্গেট করা হচ্ছে দেশের তরুণদের। প্রযুক্তি, কম্পিউটার, সোশ্যাল মিডিয়া জানা এসব তরুণকে দেশটিতে নিয়ে গিয়ে চাইনিজ স্ক্যামারদের কম্পাউন্ডে ২ থেকে ৫ হাজার ডলারে বিক্রি করছে বাংলাদেশেরই একাধিক দালালচক্র। মূলত চীন, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারের অন্ধকার ডিজিটাল স্ক্যামিং-জগতের মাফিয়াদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এরা। কাঠখড় পুড়িয়ে কম্বোডিয়ার এসব স্ক্যামিং কম্পাউন্ড থেকে দেশে ফেরত ভুক্তভোগীরা যুগান্তরকে জানিয়েছেন এসব কথা। জানিয়েছেন, কম্বোডিয়ার নানা শহরে চাইনিজরা বিশাল সব দালান বানিয়ে যার যার নিজস্ব স্ক্যামিংয়ের কম্পাউন্ড তৈরি করে রেখেছে। সেখানে তাদের ‘বিক্রির’ পর দালালরা সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর চাইনিজ বসরা তাদের বাধ্য করেছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং নানা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ইউরোপ, আমেরিকার ধনীদের সঙ্গে প্রতারণা (স্ক্যাম) করতে। এই কাজে অস্বীকৃতি জানালে বা পারফরম্যান্স খারাপ হলে টর্চার সেলে নিয়ে চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন।

সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডগুলো থেকে প্রায় ২৫০ জন বাংলদেশিকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে আরও প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশিকে এসব কম্পাউন্ড থেকে ফিরিয়ে আনা হবে। বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়েই তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।

ভুক্তভোগীদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা : কম্বোডিয়ার স্ক্যামিং কম্পাউন্ড থেকে নানা কূটনেতিক প্রক্রিয়া ও এনজিও তৎপরতায় বাংলাদেশের তরুণদের দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তাদের কয়েকজন যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেন। প্রথম ভুক্তভোগী তরুণের বাড়ি শরীয়তপুরে। স্থানীয় দালাল রবিন শেখ ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে কম্বোডিয়ায় ৬০-৭০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেয়। বিভিন্ন ধাপে রবিন শেখকে টাকা দেওয়ার পর কম্বোডিয়ায় যাওয়ার জন্য ভিসা, বিমানের টিকিট ইস্যু করা হয়। গত বছরের ৫ জুন ভুক্তভোগী ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়ায় ট্রানজিট নিয়ে কম্বোডিয়ায় যান। সেখানে দালাল রবিনের একজন এজেন্ট তাকে নমপেন শহরে নিয়ে যায়। সেখানে ১৫-২০ দিন অবস্থানের পর তাকে নেওয়া হয় সিয়ানোক শহরে। সেখানে ভুক্তভোগীকে চাকরির কথা বলে একজন চাইনিজ বসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী জানান, কলোনির মতো বিশাল এলাকাজুড়ে ৫০, ৬০ তলার একেকটি বিল্ডিং। এখানে তরুণ-তরুণীদের রেখেই চলত স্ক্যামিংয়ের সব কাজ। চাইনিজ বস আমাকে পরদিন কম্পিউটার দিয়ে কাজে বসিয়ে ইনস্টাগ্রামের একটি অ্যাকাউন্ট দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে চ্যাট করতে বলে। স্ক্যামিং বিষয়টা বুঝতে পেরে আমি কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় আমার ওপর শারীরির ও মানসিক নির্যাতন। আমাকে জানানো হয়, এজেন্ট আমাকে তার কাছে ২০৮৭ ডলারে বিক্রি করেছে।

দ্বিতীয় ভুক্তভোগীর বাড়ি জামালপুরে। পরিচিত একজনের মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিচয় হয় কম্বোডিয়ায় বসবাসরত শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। শরিফুল তাকে কম্বোডিয়ায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচে এনে মাসে ৮০০ ডলারের কাজের প্রস্তাব দেয়। ভিসা নিয়ে কম্বোডিয়া আসার পর শরিফুল একেকবার একেক এজেন্টের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে ভিয়েতনাম সীমান্তের কাছাকাছি চেরাইথন এলাকায় অবস্থিত স্ক্যামিং কম্পাউন্ডে নিয়ে আসে। সেখানে তাকেও এক চাইনিজ বসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের এজেন্টরা তাকে বিক্রি করেছিল তিন হাজার ডলারে। এরপর তাকেও নিযুক্ত করা হয় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে স্ক্যামিংয়ের কাজে। তার পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। ভুক্তভোগী বলেন, আমার কাজে সন্তুষ্ট ছিল না বলে একদিন নিয়ে যাওয়া হয় টর্চার সেলে। সেখানে ৬ জন চাইনিজ মিলে আমাকে দফায় দফায় মারতে থাকে। এরপর এমন একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ঠিকমতো বসা যায় না, ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। আমাকে ১১ দিন কোনো খাবার খেতে দেওয়া হয়নি। আমার শরীরে এই পুরো সময়ে পানি ঢালা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রায়ই মারধর এবং ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো। তিনি বলেন, প্রায় আধমরা অবস্থায় আমাকে আরেক স্ক্যামার বসের কাছে বিক্রি করা হয় ৫ হাজার ডলারে। সেখানেও চলে নির্যাতন। যেসব দালালের মাধ্যমে কম্বোডিয়া এসেছিলাম, তারা পরে আর ফোন ধরত না।

স্ক্যামার কম্পাউন্ডের বসরা যে চাইনিজ সে বিষয়ে নিশ্চিত কীভাবে হলেন-এমন প্রশ্নে ভুক্তভোগীরা বলেন, কম্বোডিয়ায় সবাই এ বিষয়টি জানে। তারা যে ভাষায় কথা বলত, সেটিও আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি।

কীভাবে করা হয় স্ক্যামিং : ভুক্তভোগী তরুণরা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, হাজার-হাজার তরুণ-তরুণীকে সেখানে স্ক্যামিংয়ের কাজে বাধ্য করা হয়। এসব স্ক্যামারদের টার্গেট হলো ইউরোপ, আমেরিকার ধনী মানুষরা। স্ক্যামিং কম্পাউন্ডে কম্পিউটার নিয়ে তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক দিয়ে প্রথমে শিকার খোঁজে। এসব অ্যাকাউন্টের প্রোফাইলে থাকে ধনী, বিলাসী জীবনযাপনকারী মেয়েদের ছবি। তাদের দৈনন্দিন জীবনের জমকালো ছবি, ভিডিও পোস্ট থাকে। কিন্তু এসব অ্যাকাউন্ট মূলত চালায় বাধ্য হয়ে স্ক্যামিংয়ে আসা তরুণরা। তারা ইউরোপ-আমেরিকার ধনী, বিত্তবান মানুষকে টার্গেট করে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে মেয়ে হিসাবে। ওপাশ থেকে যখন ইউরোপ-আমেরিকার পুরুষরা ভিডিও কল দেয়, তখন সেন্টারে অবস্থান করা প্রোফাইল ছবির মেয়েটি তাদের সঙ্গে কথা বলে। একপর্যায়ে বন্ধুত্ব খুবই জোরালো হয়। পুরুষটি যখন মেয়েটির এত জমকালো জীবনের রহস্য জানতে চায় তখন মেয়েটি চাইনিজ স্ক্যামারদের তৈরি করা ওয়েবসাইট ও পেইজে বিনিয়োগের মুনাফার কথা তুলে ধরে এবং সেখানে বিনিয়োগ করতে বলে। যেখান থেকে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের লাভ পাওয়া যায়। ধনী দেশগুলোর পুরুষরা বান্ধবীর কথা রেখে বিনিয়োগ করে। প্রথমে কয়েকবার মুনাফাও পায়। এভাবে যখন বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করা হয়, তখন পুরো টাকাই সরিয়ে নেওয়া হয়। কারণ, এসব ওয়েবসাইট বা পেজের সব নিয়ন্ত্রণ থাকে চাইনিজ স্ক্যামারদের হাতেই।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, সাইবার স্ক্যামের এই জগৎটি মানব পাচারের এক নতুন ধরন। বাংলাদেশের একজন তরুণকে থাইল্যান্ডে নেওয়ার কথা বলে হয়তো মিয়ানমার বা কম্বোডিয়ার সীমান্তে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে তাকে সাইবার কম্পাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চাইনিজদের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে সে অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার একজন মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। দেখা যাচ্ছে, এখানে কয়েকটি দেশ মিলিয়ে ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ ঘটছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিক এই স্ক্যামারদের ফাঁদে পড়ে বিলিয়ন ডলার খুইয়েছে। তাই এসব বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ আছে।

তিনি বলেন, যাদের বাধ্য করানো হচ্ছে স্ক্যাম করতে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকরা আছেন। টার্গেট করা হচ্ছে যারা প্রযুক্তিজ্ঞান রাখে এবং মোটামুটিভাবে ইংরেজি লিখতে-পড়তে পারে তাদের। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে পুরো বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম-এই দেশগুলোয় যারা যাচ্ছেন, তাদের অনুমোদন দেওয়ার আগে ভালোভাবে বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা উচিত। কেউ বিপদে পড়লে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ইন্টারপুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে কীভাবে দ্রুত উদ্ধার করা যাবে, দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে, সে বিষয়গুলোয়ও আরও গুরুত্ব দিতে হবে।